বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১

বিরিয়ানি ও বাঙালির খাদ্য বিবর্তন

 

 

(১)

অকপট নিয়ে যখনই কেউ কিছু বলে তার সাথে বিবিধ বিষয় জড়িয়ে থাকে। ব্যক্তি আমরা, সাহিত্য পত্রিকা, ভ্রমণ, নিজেদের মাঝের বন্ধুত্ব, আড্ডা, রাজনৈতিক খেউর ইত্যাদি; কিন্তু সব কিছুকে ছাড়িয়ে গিয়ে যেটা একান্ত পরিচয়বাহক হয়ে উঠেছে সেটার নাম রকমারি বাহারি খাদ্যসম্ভার। নির্দিষ্ট করে বললে, তা হলো বিরিয়ানি। বিরিয়ানি আর অকপট কোথাও যেন একটা সমার্থক হয়ে উঠেছে, অথচ গ্রুপের সদস্যসংখ্যার বিচারে খাদ্য গ্রুপগুলোতে, সাহিত্য গ্রুপ কিম্বা ভ্রমণ গ্রুপে বিরিয়ানি নিয়ে অনেক বেশি পোস্ট হয় অকপটের তুলনাতে, মনোজ্ঞ লেখাও আসে সেসব গ্রুপে- কিন্তু গ্রুপের সাথে বিরিয়ানির এতটা আত্মীকরণ, অকপট ছাড়া কারও সাথে এতটা ঘটেছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে

বিরিয়ানি আমাদের জীবনের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছে যে, কোনো কিছু বিশেষ দিন হোক বা না হোক বিরিয়ানির আগমনই যেন সেই দিনটিকে বিশেষ করে তোলে। প্রথমে ছিল শুধুই বিরিয়ানি, এখন তার কতইনা ঘরানা। কোলকাতা, দিল্লী, হায়দ্রাবাদি, লক্ষ্ণৌ, কাশ্মীরি, অওয়ধি, লাহোরি, বোম্বাই কত্তো কি। আবার আলু থাকা না থাকা, ডিম থাকা না থাকা, মাংসের সাইজ, চালের সুগন্ধ ও টেক্সচার, মশলার ভিন্নতা ইত্যাদি ভেদে বিরিয়ানি নানা গোত্রের হয়ে থাকে, এদের কৌলিন্য নির্ভর করে স্থানীয় ঐতিহ্যের উপরে। বিরিয়ানির হাঁড়ি আসলে স্বাদের আস্ত উৎকৃষ্ট রাসায়নিক ফলিত প্রয়োগশালা। এতে শিল্প আছে, সাহিত্য আছে, অঙ্ক আছে, বিজ্ঞান আছে, ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি- সব সব সব আছে। বিরিয়ানি নবীন প্রেমিকার মতো মাতাল করা উচ্ছল আস্বাদের, তবে যখন ওটা পুরাতন গৃহিণীর মতোই উষ্ণ থাকে তখন। বিরিয়ানির আঘ্রাণেই মুখে এত পরিমাণ লালার উদ্রেগ হয় তাতে অনায়াসে ডিঙি ভাসিয়ে দেওয়া যায়। মিঠা আতরের সুবাসে ফুসফুসের আয়ুবৃদ্ধি ঘটে। একদৃষ্টে বিরিয়ানির দিকে চেয়ে থাকলে প্রবৃত্তির নিবৃত্তি ঘটে। একপ্লেট বিরিয়ানি শুধুই খাদ্যবস্তু নয়, একটা তীর্থস্থল- যাকে চুম্বনের দ্বারা ছুঁলে পূণ্যার্জন হয়। এগুলো সবই আমার দর্শন।

বন্ধুবর ইন্দ্রর এক অমোঘ উক্তি আছে এই বিষয়ে, “বিরিয়ানি মানেই একটা অনিশ্চয়তার দোলাচল। অতি বড় বাবুর্চিও জানে না দম থেকে নামাবার পর শুকিয়ে যাওয়া আটার চাঙড় খুঁটে ভিতর থেকে কী বের হবে। প্রতিবার একই উপকরণ, একই মশলা, একই স্থান, একই পাতিল, একই ব্যক্তির রন্ধনশৈলী- তবুও প্রতিদিনের স্বাদ পৃথক হয়ে যায়, দুটো হাঁড়ির স্বাদেও ফারাক এসে যায়। এই কারণেই বিরিয়ানি এত সুস্বাদু”। বিরিয়ানি মানে অদ্ভুত সুগন্ধের মাঝে গোটা গোটা মশলায় সেজে ওঠা, সরু লম্বা শুভ্র সুগন্ধি মেদহীন ঘি মাখা ভাতে- জাফরানের সোহাগ মাখা হলুদ রঙের উপরে তুলতুলে মাংসের কুটুম্বিতাই শুধু নয়; বিরিয়ানির অর্থই হলো ধৈর্য, অধ্যাবসায়, মনোঃসংযোগ আর একরাশ অনিশ্চয়তা- এটাই বিরিয়ানির আসল স্বাদের রহস্য

জনসংখ্যাতাত্ত্বিক অঞ্চল ভেদের বাইরেও বিরিয়ানির একাধিক উপবিভাগ রয়েছে। যেমন কোলকাতার রয়্যালের স্বাদের সাথে আমিনিয়া বা আরসালানের স্বাদের অনেক ফারাক। তবে কোলকাতা বিরিয়ানি মানে শুধুই উপরের তিনটে নয়, কলেজ স্ট্রিটের সুফী, দমদম-নাগের বাজার ও বেহালার হাজী, নিউ মার্কেটের মস্তান, সল্টলেকের চাচাজান আর গলৌট, সেলিমপুরের তন্দুর, রিপন স্ট্রিটের হাণ্ডি, রাজাবাজারের তাজ, রুবির মনজিলাত কিম্বা বেনেপুকুরের জমজম- প্রতিটির স্বাদ ইউনিক। এর বাইরেও স্বাদের এমন জীবন্ত প্রতিষ্ঠান কম কিছু নেই, সে সবের তালিকা দিলে একটা গোটা উপন্যাস হয়ে যাবে

রাজ্যের বাইরে বলতে গেলে দিল্লীর করিমসের বিরিয়ানির স্বাদ ৫ বছর পরেও জিভে লেগে থাকে। হায়দ্রাবাদ গেলে সকলেই প্যারাডাইস খোঁজে, কিন্তু চারমিনারের কাছে সাদাবের বিরিয়ানির স্বাদ যে অমৃত কুম্ভের সন্ধান। বোম্বের লোখান্ডওয়ালার চাচার বিরিয়ানি হাসতে হাসতে দু'প্লেট শেষ করে দেওয়াই যায়, এতটাই সুস্বাদু। মহীশূরের আন্ধা ঘরানার নবাবি বিরিয়ানিতে পুদিনা পাতার ব্যবহার যেন জীবন্ত এক শিল্পকলা। সেবার সুব্রতদার সাথে লক্ষ্ণৌ গিয়ে আমরা সারা শহর জুড়ে তারিয়ে তারিয়ে হরেক ধরনের বিরিয়ানির স্বাদ নিয়েছিলাম সপরিবারে। প্রতিটাই অনবদ্য, স্বাদে-গন্ধে-বর্ণে।

জীবনের একটা অধ্যায়ে রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিদেশ গমনের সুযোগ ঘটেছিল। বর্তমানে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসার সাথে যুক্ত, আমাদের রেস্টুরেন্টেও বিরিয়ানি বানানো হয়। সেই সুবাদে ইরানি বিরিয়ানি, কাবুলি বিরিয়ানি, মদিনা বিরিয়ানি, বাগদাদি বিরিয়ানি, পাখতুনি বিরিয়ানি, তুর্কি বিরিয়ানি, মিশরি বিরিয়ানি, লেবাননি বিরিয়ানি, ইয়েমেনি বিরিয়ানি, নেপালি বিরিয়ানি সহ নানা স্বাদের পরখ করার সুযোগ পেয়েছি জীবনে। এগুলোতে ভাল বা মন্দের বিচার করা যায় না, কারণ প্রত্যেক দেশের নিজস্ব রন্ধনশৈলীতে নিজস্ব মশলা ও পাকপ্রণালীর বিশেষত্ব থাকে, সেটা বিদেশী জিভে ভাল না লাগতেও পারে। পশ্চিম ইরাক, কুর্দ, জর্ডন ও জেরুজালেম শহরের বিরিয়ানিতে কচি বেগুন দেয়, যেমন আমরা আলু দিই। খেতে বেশ লাগে। তবে বিদেশী বিরিয়ানির স্বাদের বিচারে ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানির তুলনা নেই

একগ্লাস বাদাম শরবতের স্টার্টার দিয়ে শুরু করে, কম তৈলাক্ত চিনিগুঁড়া চালের সাথে ছোট্ট ছোট্ট নরম ঢোলা মাংস, যা মুখে দিলেই হাড় থেকে খুলে আসে, সাথে বুরহানি আর ফিরনি- শুধু এই পদটা খেতেই বারেবারে ঢাকা যাতায়াত করা যায়। তবে সব ভালর চেয়েও ভাল আমার ঘরণী রুমির হাতের নিজস্ব ঘরানার বিরিয়ানি, সাথে পাতলা কাচুম্বর বা ঘন রায়তা। কিছুটা কোলকাত্তাইয়া, কিছুটা কাশ্মীরি, কিছুটা হায়দ্রাবাদি- বাকিটা রান্নার প্রতি অসীম প্রেম, যার দরুন যেকোনো ছুতোনাতায় “আজ না হয় বিরিয়ানিই হয়ে যাক” হরদম লেগেই আছে আমাদের সংসারে। এই জন্যই বলে, উপরওয়ালা জুড়ি মিলিয়েই পাঠায়

উইকিপিডিয়াতে পড়েছিলাম, দ্বাদশ শতকের ‘নৈষধ চরিত’, চতুর্দশ শতকের ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ এবং বৌদ্ধ সহজিয়া গান ‘চর্যাপদ’, মধ্যযুগীয় মনসামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত হয়ে খনার বচন- সর্বত্রই বাঙালির রন্ধনশৈলীর কিছু কিছু বিবরণ রয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য নিয়ে আজকের প্রজন্মই যে লিখছে তা নয়, সেকেলের একচুয়াল লেখনীচর্চা গ্রুপগুলোতেও খাদ্যচর্চা জমিয়েই হতো, নতুবা তা কখনও লেখনী শিল্পে আসত না। ধরে নেওয়া যেতেই পারে, সেযুগেও যদি বিরিয়ানি থাকত- নিশ্চিত চর্যাপদে এমন কিছু লাইন থাকতই-

রান্ধি বিরিয়ানি ব্যঞ্জন পরাণ হরষিত,

ছাগমৃগ মাংসে কাবাব অকপট সচকিত”

আধুনিক যুগে ব্যাঞ্জনসাহিত্যের ইতিহাস মাত্র দুশো বছরের কুলীন। খাদ্যপ্রনালী ও রন্ধনচর্চার উপরে আধুনিক বাঙালি সেভাবে কিন্তু লেখেনি। ‘ইতিহাস’ নামের একটা অনলাইন ব্লগ থেকে যেটা পেলাম, হুবহু তুলে দিলাম- ‘১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বেশ্বর তর্কালঙ্কার ভট্টাচার্যের ‘পাক্‌ রাজেশ্বর’, ১৮৫৮ সালে গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশের ‘ব্যঞ্জন রত্নাকর’। তবে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করছিল বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘পাক-প্রণালী’। পুরুষদের পাশাপাশি বাঙালি ‘ভদ্রমহিলা’রাও রান্নার বই লিখতে শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী তথা ‘পুণ্য’ পত্রিকার সম্পাদিকা লেখেন ‘আমিষ ও নিরামিষ’ নামে একটি বই। কিরণরেখা রায় লেখেন ‘বরেন্দ্র রন্ধন’। রেনুকাদেবী চৌধুরানী লিখেছিলেন ‘রকমারি নিরামিষ রান্না’ আর ‘আমিষ খণ্ড’

 (২)

আমাদের ছোটবেলা মানে নব্বই এর দশক বা এই নতুন শতকের প্রথম দশকটাতেও বিরিয়ানির এমন একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না বঙ্গজীবনে। বিরিয়ানি যে আগে ছিল না তা নয়, চিৎপুরের রয়্যাল কিম্বা কোলকাতা পুরসভার কাছে আমিনিয়া তো তীর্থস্থানে মতো ছিল- বছরে এক-দুবার যেতে পারলেই নিশ্চিত মোক্ষলাভ। এখন হলে-মলে তো ছাড়, যে কোনো বাহানাতেই বিরিয়ানি ঢাকে কাঠি পাহাড় থেকে সাগর। পাড়ায় মোড়েতে লাল সালুতে ঢাকা পেতলা বা ডেকচি, এলাকা ভুরভুর করে মিঠা আতরের গন্ধে। মূলত বিরিয়ানির হাত ধরেই তুর্কি, ফার্সি তথা মধ্য এশিয়ার খাদ্যশৈলীতে ছেয়ে গেছে মাছে ভাতে বাঙালির খাদ্যতালিকা। বিরিয়ানির সাথে সাথেই হেঁসেলে ঢুকেছে কিমা, কাবাব, চাপ, রেজালা, ভুনা, হালিম, ভর্তা, কোর্মা, কালিয়া, নিহারি, পায়া, পসিন্দা, রোগান জোশ, রেশমি বোটি, কোফতা, টিকিয়া, মুসল্লম, ফালুদা, বরফি, ফিরনি, শিরখুর্মা, আরও কত কী! সনাতনী বাঙালিয়ানার বাইরে- থুড়ি, এখানেই প্রশ্ন উঠবে সনাতনী বাঙালিয়ানা কী!

আমরা অনেকেই বলব, ডাল, আলুপোস্ত আর চারটি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, এই তো আমাদের বাঙালি ঐতিহ্য। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের আগে পোস্তর নামটারই অস্তিত্ব ছিল না বঙ্গজীবনে, মুঘলরা মশলা হিসাবে পোস্ত এনেছিল এদেশে। আলু এসেছিল পর্তুগীজদের সাথে আর ডাল এসেছে মধ্য ভারত থেকে মূলত বর্গিদের হাত ধরে। তাহলে হাতে রইল পেনসিল। মাছ-ভাত, বলতে গেলে এই দুটোই আদি তথা অকৃত্রিম বাঙালি খাদ্য, বাকি সবই বদলেছে সময়ের সাথে। মাছের রন্ধনশৈলীও বদলে ৩৬০ ডিগ্রী কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করেছে সময়সারণি জুড়ে। বর্ণপ্রথায় জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বঙ্গ হিন্দুসমাজে প্রাক মধ্যযুগীয় বঙ্গনারীর হেঁসেলে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। আইনের সবকিছুই উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়দের জন্য সীমাবদ্ধ ছিলতারাই মূলত অর্থবান হতো, তাই ধর্মীয় অনুশাসন তাদের সাজত। এক পেট খিদে নিয়ে ধর্মের গানে ঘুম আসে না, তাই নিম্নবর্গীয় কায়স্ত হোক বা শূদ্র তথা দরিদ্র নিম্নবিত্ত কৌম সমাজে ধর্মীয় বেড়াজালের বাইরে একাধিক খাদ্যের বিকল্প ছিল। সমস্যা ছিল আর্ত আর বিধবাদের, যা আজও কিছুটা আছে বৈকি গ্রাম্য হিন্দুসমাজে

খ্রীস্টপূর্ব ময়ূর সাম্রাজ্য থেকে, শক, হুন, কুষাণ হয়ে গুপ্তযুগ পর্যন্ত বাঙালির কী যে খাদ্যাভ্যাস ছিল সেটা বড় গোলেমেলে একটা বিষয়, গোলেমেলে এই জন্য- কারণ তখন আজকের ফর্মের এই বাঙালি জাতিটারই অস্তিত্ব ছিল কিনা কে জানে! বারেবারে হানাদারেদের আক্রমণ ঘটেছে সিন্ধু-গাঙ্গেয় অঞ্চলে, নিশ্চয় সেই সময়েও খাদ্যের পরিবর্তনও এসেছিল প্রতিবার। কিন্তু তা লিপিবদ্ধ নেই, তাই জানার সুযোগ নেই। এক্কেবারে শুরুর যুগে যা ছিল তা মূলত আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব- সেই দ্বন্দ্ব যে খাদ্যাভাসেও থাকবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। প্রথমে মুসলমান ও পরে ইউরোপীয় নানা হানাদার জাতির প্রাদুর্ভাবে বাঙালির রান্নাঘর ক্রমশ সম্পৃক্ত হয়েছে, বিকল্পের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছে- লিখিত ইতিহাসের দরুন এটা জানা যায়।

এই খাদ্য সম্প্রীতিকে আপন করতে অবশ্য দণ্ড কিছু কম দিতে হয়নি ইতিহাসের এই দীর্ঘপথকে, আজও গোমাংস ভক্ষণের শাস্তি গণপিটুনিতে মৃত্যু, কিম্বা হালাল মাংস বিনা একটা বড় জনগোষ্ঠী- মাংস ছোঁয় না অবধি। প্রাচীন বঙ্গীয় সমাজে সকালে হবিষ্যান্ন সেবন করে গঙ্গাজল দিয়ে আচমন করে তিনবার ‘তৈলাধার পাত্র কিম্বা পাত্রাধার তৈল' মন্ত্র উচ্চারণ করা সমাজপতিরা মহা অধ্যাত্মতেজে মুনি ঋষিদের মতো টেলিস্কোপিক নজর দিয়ে গোটা সমাজের খাদ্যাভ্যাসের প্রতি কড়া নজর রাখত, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের উপরে। স্মার্তরা কখনই অন্ত্যজ শ্রেণীর রোজনামচার উপরে দৃষ্টিক্ষেপ করতে ততটা উৎসাহী ছিলেন না। আজ এই অনুপরিবার কাঠামোতে অন্তর্জালময় ইথারীয় জীবনে কে যে কী খাচ্ছে তা পাশের মানুষটি অবধি জানতে পারে না- সোস্যালমিডিয়াতে ছবি পোষ্ট করে নিজে জানান না দিলে

অনার্য তথা শুদ্ধ ভারতীয় আদিবাসী খাদ্যশৈলীতে ভাতের গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক, তা গরম হোক বা গেঁজানো। এর বাইরে নানান ফলমূল, কন্দ, বাঁশ, শাকপাতা, বুনো মাশরুম, দুগ্ধজাত সামগ্রীর সাথে সাথে শিকারকৃত মাছ ও প্রাণীজ মাংসের একটা বিস্তৃত বিকল্প ছিল। গেঁড়ি, গুগলি, সাপখোপ, পাখি, বাদুড় কিছুই বাদ দিত না সস্তার আমিষে নিজেকে পুষ্টি দান করতে। স্বভাবতই নিজেদের উচ্চ জাতি ভাবা আর্যরা- অনার্যদের প্রতিটি খাবারকে বর্জন করেছিল স্মৃতিশাস্ত্রে, যা আজও বহমান। এদের চিকিৎসা ব্যবস্থাটার গোটাটাই দাঁড়িয়েছিল বা আছে ভেষজ খাদ্যাভ্যাসের উপরে। খুব ভুল না হলে যাযাবর আর্যদের আয়ুর্বেদের হাতেখড়ি অনার্যদের ভেষজ খাদ্যচর্চা থেকেই। আজও আদিবাসী সংস্কৃতিতে খাদ্যাভ্যাসের তেমন কিছুই পরিবর্তন সংগঠিত হয়নি, প্রায় আদি অকৃত্রিম রয়েছে। আমাদের ভারতীয় বাঙালি সমাজ আদিবাসীদের অবশ্য বাঙালি বলে স্বীকৃতিই দেয় না। সেই অর্থে বলতে গেলে আদিবাসীরা সংখ্যাতে সত্যিই অনেক কম, দুই পার মিলিয়ে বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানেদের সংখ্যাই ৭০% এর বেশি- অথচ পশ্চিমবঙ্গীয় হিন্দুসমাজে কমিউনিস্ট বাদে প্রায় সকলেই ‘বাঙালি মানে’ শুধুই হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই বোঝে- নতুবা শুনতে হতো না “ওহ, আপনি মুসলমান, আমি ভেবেছিলাম বাঙালি”।

 ()

আহার কয় প্রকার, এটা জানতে হবে। কারন আমরা খাদ্য গ্রহনই করি আহার তথা জঠরাগ্নি নিবৃত্তির জন্য। শাস্ত্র বলছে- গঠনগতভাবে আহার দুই প্রকারের- স্থুল আহার ও সূক্ষ্ম আহার। স্থুল আহার ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, এ থেকে মলমুত্র সহ ৩২ প্রকারের অশুচি উৎপাদিত হয়। আর সূক্ষ্ম আহার জঠরাগ্নিকে প্রজ্বলিত রাখে ও দেহ গঠিত করতে সাহায্য করে, এ থেকে তেজ বা শক্তি উৎপন্ন হয়। আহারে যে নিবৃত্তি লাভ হয় তা মূলত চার প্রকারের- প্রথম- ইন্দ্রিয় দ্বারা ভক্ষণ, যা অন্তরে সুখবেদনার সঞ্চার ঘটিয়ে মনকে উজ্জীবিত করে তোলে, চিত্ত বিশুদ্ধ হয়। দ্বিতীয়টি স্পর্শভক্ষণ, এতে হাতে করে খাদ্যদ্রব্য ছোঁয়া থেকে শুরু করে দাঁত দিয়ে চূর্ণ করে মলাশয় অবধি পৌঁছানো অবধি এই প্রক্রিয়া চলে। তৃতীয়ত- কবলীকার ভক্ষণ, তুমুল ক্ষুধাতৃষ্ণাক্রান্ত ব্যাক্তি হিতাহিত শূন্য হয়ে যখন গোগ্রাসে খাদ্য গ্রহণ করে তখন তার বৌদ্ধিক জ্ঞান লুপ্ত হয়, একেই কবলীকার আহার প্রণালী বলে। চতুর্থত হচ্ছে সুষম বা বিজ্ঞান আহার, যার মাঝে উপরোক্ত তিন ধরনের আহারের সুষম বন্টন থাকে।

যদি বলে খাদ্যের মূল বিভাগ কি! উত্তরে একটাই শব্দ আসবে- রুচি। যার যেমন রুচি সে তেমন খায়, আর এই রুচি তৈরিতে অনেকটা ভূমিকা থাকে পারিপার্শ্বিক সমাজ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের। বাঙালির মাঝে ইসলামায়নের পূর্বে ধরে নেওয়া যায় তারা সকলেই হিন্দু ছিল, সুতরাং সেই সমাজ আজ হিন্দু-মুসলমানে আড়াআড়ি ভাগ হলেও জিনগত রুচির বিলোপ ঘটেনি। শুধুমাত্র মুসলমান বলেই কেউ খুব বেশিদিন উত্তরপ্রদেশের আলিগড় কিম্বা আরবের মক্কার কোনো ঘরে দুদিনের বেশি তাদের স্থানীয় খাবার নিতে পারবেনা। সমস্ত স্বত্বা তখন ভাত ভাত করে আকুল হয়ে যাবে। বসিরহাটের হিন্দু ভাইটি ওপাড় বাংলার হানিফ শেখের বাড়িতে চাট্টি ভাত খেয়ে যতটা শান্তি পাবে, রাজস্থানের স্বজাতীয় কোনো হিন্দু বাড়িতে মোটেই সেই তৃপ্তি আসবেনা। তবে ধর্মীয় কারনে কারো রুচিতে গোমাংস পাপ, তো কারো রুচিতে গেঁড়ি গুগুলি সাপ- এভাবেই ধর্ম রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করে সংক্ষিপ্ত করে দেয়।

আজকের ট্যেকস্যাভি প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা যাদের জন্ম নতুন শতকে, ইন্টারনেটের কল্যাণে তারা বিশ্বনাগরিক। জনপ্রিয় কার্টুন আর বিজ্ঞাপনের দৌলতে তাদের নিজস্ব কোনো খাদ্যরূচিই নেই। তারা সপ্তাহে একবেলা ‘রাইস’ খায়, সকাল ১০টায় ব্রেকফার্ষ্টে কর্নফ্লেক্স কিম্বা মুসলি, দুপুরে নুডলস। বিকালের নাস্তায় পিৎজা পাস্তা, রাত্রে সুসি, ফো, হুমুস, বার্গার কিম্বা বাস্যান্ডুইচ। আউটিং বা গেটটুগেদারে ফ্রায়েড রাইস বা বিরিয়ানি- তাও সস দিয়ে। এরা কেউই ‘ফিস’ ছোঁয়না, বিষয়টাই নাকি ভীষণ ফিসি। মাংস বললে কেবল পোল্ট্রি মুরগিই বোঝে। এরা না বাঙালী না ভারতীয় না বিদেশী, এক আজব জগাখিচুড়ি। অথচ ইংরেজরা আসার আগে ভারতীয় সমাজে ছিল তিনবেলা খাবার অভ্যাস, কিন্তু তার কোনো নাম ছিলনা, না ছিল ধরাবাঁধা কোনো সময়জ্ঞান। ইংরেজ চলে গেছে, রেখে গেছে তাদের খাদ্যাভাসের বিভক্তির লেগাসি, এক্সট্রা লেজের মত। তারপরেও US টাইমধরে চলা বঙ্গপুঙ্গবেরা দুপুরে ব্রেকফার্ষ্ট করে আর ভোরে ডিনার। এখন তো আবার ‘ব্রাঞ্চ’ চলে এসেছে, উঁহু শাখাপ্রশাখা ওয়ালা ব্রাঞ্চ নয়- ব্রেকফার্ষ্ট ও লাঞ্চের ধরেমুড়ো সন্ধি- যা লাঞ্চও আবার ব্রেকফার্স্টও বটে। হয়ত এটা কোনো একটা যুগসন্ধিক্ষণ, ভেঙে গড়ে নতুন একটা রুচিধারার জন্ম হবে, তাই আমরা যারা সাবেক প্রজন্মের শেষ সলতে তাদের এগুলোতে মেনে নিতে এতোটা অসুবিধা হয়।

সনাতন বাঙালি খাবারে দুটো মুখ্য বিভাগ ছিল, যথা তামসিক ও রাজসিক। রাজসিক অবশ্যই রাজা ও তৎবর্গীয়দের জন্য, তামসিক ছিল সন্ন্যাসী ও অসহায় গরিবদের জন্য। এদেশে খ্রিস্টীয় খাবারের তেমন প্রচলন ঘটেনি যেমনটা লাতিনভূমে ঘটেছিল স্পেনীয়-পর্তুগীজ নামে। তবে ইসলাম পূর্ব যূগে ভারতভূমে হিন্দু ধর্মের চেয়েও বৌদ্ধ ধর্ম বেশি প্রচলিত ছিল, সেই বৌদ্ধ সমাজে দেব স্থানীয়দের জন্য যে খাদ্য প্রস্তুত হতো তার নাম ‘ওজ’। এই ওজ হচ্ছে অত্যন্ত পুষ্টিকর ভিটামিনযুক্ত খাবার যা সাধারণ মানুষের হজমের অনুপযুক্ত বলে প্রচারিত ছিল- বলাই বাহুল্য এই অতিরিক্ত পুষ্টি প্রাণীজ মাংস ও চর্বি থেকেই আসত। এখানে দেবতা মানে ঈশ্বর নয়, দেবতা কোনো সিদ্ধপুরুষ- যিনি নির্বাণ লাভ করেছেন। বৌদ্ধ বিশ্বাসে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই

প্রভু বুদ্ধের অন্তিম ভোজে ‘শূকরমাদ্ধব’ নামের একটি শুঁটকি মাংসের পদ ছিল, যা নাকি পচা ছিল। সেই খেয়ে বুদ্ধের আমাশয় রোগ হয় ও তাঁর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে। কেউ কেউ সেটাকে শূকরের মাংস না মানলেও অধিকাংশ বৌদ্ধ পণ্ডিত শূকরমাদ্ধবকে- শূকরের মাংসের শুঁটকি বলেই মত দিয়েছেন, কেউ কেউ মাশরুম বলে অবিহিত করেছেন। স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকরা ভীষণ চালাক ছিলেন, তারা নিজেরা প্রাণীহত্যা করতেন না। কিন্তু সাধারণ লোকে প্রাণী হত্যা করে ভিক্ষুসংঘের জন্য খাদ্য তৈরি করে স্রোতাপন্ন আর্যশ্রাবকে পরিবেশন করলে তিনি চোব্য-চোষ্য-লেহ্য করে উদরস্থ করে নিতেন। আমার বলার উদ্দেশ্য, ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলা স্বয়ং বুদ্ধদেব নিজেই মাংস খেতেন ও আজকের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা অধিকাংশই মাছ-মাংস তথা প্রাণীজ প্রোটিন খান। মাংস খাওয়ার চল থাকলে বিবিধ প্রকারের রন্ধনশৈলীও ছিল নিশ্চিত। প্রামাণ্য দলিল না থাকার কারণে সে বিষয়ে বিশদে জানার উপায় নেই

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ইসলামের প্রবর্তকেরা তথা আব্রাহামীয় ধর্মের সকল শাখাগুলিই মধ্যপ্রাচ্যের বেদুঈন-যাযাবরদের দ্বারা তৈরি ধর্মবিশ্বাস। যাদের বসবাস শুষ্ক মরু অঞ্চলে, মাংস আর দুধ ছাড়া খাদ্যের তেমন বিকল্প নেই। মশলার ভিন্নতা ও পরিমাণের তারতম্য হলেও সেখানেও মাংসের রন্ধনশৈলীর অভাব ছিল না। আজও আমাদের অধিকাংশ মাংস রন্ধনশৈলী সেই মধ্যপ্রাচ্যেরই, তবে তাতে ভারতীয় মশলা ও শিল্পী বাবুর্চিদের উদ্ভাবনী শিল্প মিশে আছে

বেদ-পুরাণে সাধারণ মানুষদের জন্য যব, তণ্ডুল ইত্যাদি শস্যের উল্লেখ রয়েছে। আর্যদের প্রধান খাদ্যই ছিল মাংস, বনজ ফলমূল, তিল, সুটিডাল আর দুধ, কারণ তারাও পশুপালক যাযাবর জাতিই ছিল। অথর্ববেদের ৪/১৪০/২ সূক্তে এটারই উল্লেখ রয়েছে।

ব্রীহী মত্তং যবমত্তোমথ তিলং

এষ বাং ভাগো নিহিতো রত্নম ধেয়ায় দন্তৌ মা হিংসিষ্টং পিতরং মাতরং চ”।

পরবর্তীতে আর্যরা বর্ষাকালে অস্থায়ী চাষাবাদ শিখলে যব ও গমজাতীয় দানা শস্য উৎপাদন করতে শিখলেও সবজি উৎপাদন শেখে অনেক পরে। ধান যেহেতু আদিবাসীদের শস্য ছিল তাই আর্যরা বহুদিন সেটা ছুঁয়েই দেখেনি। তাই বেদের এক্কেবারে শেষের দিকে ধানের কথা এসেছে। চাল সেই অর্থে বঙ্গ সমাজে আজও দেবতাদের ভোগে ভাত হিসাবে স্বীকৃতি পায়নি, তাকে প্রসাদ নামে ডাকা হয়, আজও ভোজসভার আয়োজন করা হলে সেখানে লুচি খাওয়ানোটাই সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কাজ, ভাত আসে শেষে কারণ তা নিকৃষ্ট। বৈদিক সমাজে মাংসের ব্যবহার যথেচ্ছভাবে ছিল, কিন্তু তা ব্রাহ্মণদের জন্য উপলব্ধ ছিল না প্রকাশ্যে।

ব্রাহ্মণেরা সারা বছর ফলমূল, দুধ, ঘি খেতেন, প্রাণীজ আমিষ ভক্ষণের জন্য যজ্ঞানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন বা বলা ভাল রাজাদের দ্বারা আয়োজন করাতেন ধর্মের নামে। সেই যজ্ঞের আগুনে ষাঁড়, বন্ধ্যা গাভী, মহিষ, পুরুষ ছাগল বা অজ মাংস ও বৃদ্ধ অশ্বের মাংসের রোস্ট তথা কাবাব বানান হতো বিশুদ্ধ ঘি সহযোগে। শাস্ত্রে একে ‘বলি প্রথা’ বলা হয়েছে। কোরবানি হোক বা বলি, খায় তো সেই মানুষই- সবই আসলে ধর্ম বাঁচিয়ে সস্তায় প্রাণীজ প্রোটিনের যোগাড় দেওয়ার ফিকির। তাছাড়া ঋষি-মুনি ও দেবতাদের দৈনন্দিন সান্ধ্য আসরে যে সোমলতার রস পান করা হতো- তার চাট বা চাখনা হিসাবে মাংসই থাকত। নতুবা ঋষি যাজ্ঞবাল্ক্য বলতেন না,অশ্নামি প্রবামহমংসলং চেৎভবতি”, অর্থাৎ গোমাংস যদি কোমল হয়; তবে এনে ভোজন করব। ঋগ্বেদ- ৩/২/২১

আমরা বাংলা দেশের লোক, যতই আজ দেশ ভাগ হয়ে যাক- দীর্ঘ বর্ষাকাল যুক্ত আবহাওয়ার গাঙ্গেয় অববাহিকার শতশত নদনদী, তাদের শাখানদী, উপনদীতে পুষ্ট। এই পলিপুষ্ট অঞ্চলে উর্বর জমির চেয়ে চাষের উপযুক্ত আর কিছু হয় না, স্বভাবতই এখানে বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় যে চাষযোগ্য নিরামিষ সবজি-ফসল খাওয়ার বিস্তার ঘটবে তাতে আর আশ্চর্য কী! তাছাড়া আমাদের এই স্যাঁতস্যাঁতে ঘর্মাক্ত আবহাওয়াতে পরপর দু'দিন পশুর মাংস খেলে তৃতীয় দিন আর কাজেকর্মে যেতে হবে না, টয়লেট এক প্রেম কথার নতুন পর্ব রচিত হবে। বঙ্গভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদনদী, খাল, বিল, বাঁওর, হাঁওরের মাছ আজও সহজলভ্য সাধারণ গরিব মানুষের কাছে, আর তার সাথে সমতল জমিতে সুলভে চাষের ধান- সুতরাং মাছে-ভাতে বাঙালি শব্দটাই একমাত্র যথাযথ বাঙালির জন্য। তবে সে মাছ রান্নাতে অবশ্যই পেঁয়াজ-রসুন ব্রাত্য ছিল

তা সত্ত্বেও আজকের বাঙালি হেঁসেলের জনপ্রিয় সবজি বেগুন, ঢেঁড়স, টম্যাটো, লঙ্কা, পেঁপে, আনারস, পেয়ারা, ভুট্টা, চিনেবাদাম কোনো কিছুই ছিল না অষ্টাদশ শতক অবধি, যেমন ছিল না আলু। ইউরোপীয় সাহেবরা এদেশের লাউ, ওল, কচু, মুলোর একঘেয়েমি থেকে নিস্তার পেতে ওই সবজিগুলোর আমদানি করে। এই ভাবেই মটরশুঁটি, গাজর, কুল জাতীয় ফলগুলো খাঁটি বাঙালির নিজস্ব খাবারে পরিণত হয়ে গেছে। এমনকি ছানা ও দই তৈরির কৌশলটিও বাঙালি শিখেছিল ফরাসডাঙার পর্তুগীজ সাহেবদের থেকে। সুতরাং, নিরামিষ রান্নাতে ছানা বা পনিরের ব্যবহারও কয়েকশো বছরের বেশি পুরাতন নয়। তবে হ্যাঁ, বাঙালির ইতিহাসের শুরু থেকেই তেঁতুল কিন্তু খাস বাঙালি খাবার, তাতে সে যতই এখন দক্ষিণ ভারতের খাবারের প্লেটের কোহিনুর হোক না কেন

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের আকালের সময় গম ছড়িয়ে পরে দেশব্যাপি, তার আগে অপ্রতুলতার কারনে বাঙালির কাছে গম মানে ছিলো ‘বড়লোকি’ ব্যাপার স্যাপার। বিয়ে, শ্রাদ্ধ বা যেকোনো অনুষ্ঠানে লুচি খাওয়াটাকে ঐতিহ্য ও আভিজাত্যর প্রতীক হিসাবে দেখা হতো। তাই খুব সম্পন্ন পরিবার ছাড়া বাঙালি কখনই রুটিতে অভ্যস্ত ছিল না, কারণ আমাদের যে প্রাচীন সাহিত্য সেখানে তাওয়ার উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে। সর্বত্রই হাঁড়ির উপস্থিতি, বাসনকোসনের শুরুতেই হাঁড়িকুঁড়ি অর্থাৎ হাঁড়ি ও কড়াই আসবে, তারপর থালা, বাসন, বাটি, হাতা, খুন্তি ইত্যাদি। যেখানে ভাত খাওয়া হয় সেই সমাজেই একমাত্র হাঁড়ির দেখা মেলে, যেখানে ভাত নেই সেখানে আর যা কিছু থাকুক, হাঁড়ি পাওয়া যাবে না।

বেদে মাসকলাই ডালের উল্লেখ থাকলেও মধ্যযুগীয় সাহিত্য বা প্রাথমিক পর্যায়ের ইংরেজ আমলের লেখালেখিতে ডালের উল্লেখ পাওয়া যায় না। বস্তুত ইংরেজদের হাত ধরেই ‘লেন্টিলস ও বিনস’ এর বিস্তারে ডাল এসে ঢোকে বাঙালির হেঁসেলে, পরে বর্গিদের আক্রমণ নিত্য ঘটনা হয়ে গেলে তাদের শক্তির উৎস ‘ডাল’কে আপন করে নেয় বাঙালি, তাদেরই প্রতিরোধ করার জন্য। মধ্যযুগে বাংলার চিরাচরিত খাদ্যাভাসে যখন ঠিক বদলের রঙ ধরতে শুরু করেছে, ওদিকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে মুসলমান সুলতান-নবাবেরা ক্ষমতার কেন্দ্র পত্তন করেছেন, এদিকে সেই তালে রয়েছে গৌড়- ঠিক সেই সময় শ্রী চৈতন্যের নেতৃত্বে বৈষ্ণব জীবনধারার প্রবর্তন ঘটে। এই বৈষ্ণবদের ধারাটা গোটাটাই কঠিন নিরামিষাশী হয়ে যায়।

প্রাণীজ আমিষের ঘাটতি ও একঘেঁয়ে নিরামিষ রান্নার মাঝে বৈচিত্র্যৈ আনতে বৈষ্ণব হিন্দু সমাজে এক বিপ্লব সংগঠিত হয়। ফল ও সবজির খোসা থেকে গাছ-লতা-গুল্মের ডগা, কাণ্ড, শিকড়, ফুল, পাতা সব কিছু দিয়ে বিবিধ ব্যঞ্জন বানানো শুরু করে। রন্ধনশৈলীতেও আসে আমুল পরিবর্তন। নিজেদের সনাতন পদ্ধতির সাথে বিজাতীয় যবনধারার মিশ্রণ ঘটায় প্রণালীতে। রাঁধতে শেখে- ভাজা, সিদ্ধ, পোড়া, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ভাপা, ডালনা, দোলমা, অম্বল, টক... এ দীর্ঘ অভিধান। খাদ্য সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মপরিচিতি, আজ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে জাতিতে খণ্ডিত করে দেওয়া হলেও স্বাদে আজও দুই বাংলা এক পাতেই রয়ে গেছে। ইলিশের মুড়ো দিয়ে কচুর শাক হোক বা ডুমোডুমো লাউ দিয়ে জিড়ের ফোঁড়নের সোনা মুগের ডাল- হাপুস হুপুস শব্দে দুই পাড়ের মানুষেরই তৃপ্তির ভাত পেটে ঢুকে যায়

শাসক যেহেতু মুসলমান, তাই সাধারণ অবৈষ্ণব ও অব্রাহ্মণ হিন্দুদের খাদ্যচর্চাতে মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুনের প্রচলন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। হিং ও আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, কিন্তু বৈষ্ণবরা সেটাকে গ্রহণ করে নিরামিষ হিসাবে। স্মৃতিশাস্ত্রকে উপেক্ষা করে আজও দুর্গা পুজোয় মাংস রান্না হয়, তবে পেঁয়াজ-রসুন না দিয়ে। শাস্ত্রের মান রক্ষা করা হয়। জাত একবারই যায়, দ্বিতীয়বার নয়। সেই সূত্র মেনেই বাঙালি বাবু তথা মধ্যবিত্ত সমাজ অতি সহজেই বিদেশী চপ, কাটলেট, ফ্রাই, স্টু এর সংস্কৃতিতে নিজেকে জারিত করে নেয় যখন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসকের দলেরা এদেশে আসে।

বলা যেতে পারে, মুসলমানেরা বঙ্গদেশে এসেই মাছ খাওয়া শিখেছিল বাঙালির কাছে। ব্রিটিশদেরও মাছ-মাংস রান্নাতে তেমন বেশি পদের বিকল্প ছিল না। মাছ মানেই ফ্রাই তথা ভেজে খাওয়া, আর মাংস হয় শুঁটকি করে খাওয়া বা সেঁকে কাবাব বানিয়ে খেতো। ভারতীয় মশলার কল্যাণেই তাদের কারি অতটা সুস্বাদু হয়, সাধে কি আর ভাস্ক-দ্য-গামা মশলার জন্য অজানা সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল অচেনা ভারতের সন্ধানে। রসনা তৃপ্তির চেয়ে তৃপ্তি জীবনে আর কীসেই বা আসে। কবিকঙ্কন বড় দর্শনতত্ত্ব দিয়ে লিখে গেছেন- যে মহিলা তৃপ্তিদায়ী ব্যঞ্জন রাঁধতে জানল না, সে সংসারের কিছুই জানল না

তেতো, নোনতা, ঝাল, টক, ও মিষ্টি- এই পঞ্চ স্বাদের খাদ্য সামগ্রী আমাদের বাঙালি খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একটা আম বাঙালি পরিবারে সবজি ও মাছ রান্না প্রায় সমগোত্রীয়, কেবল হিন্দুদের রান্নার ফোঁড়ন বৈচিত্র্য বেশি। সেই তুলনাতে মাংস রান্নাতে মুসলমান পরিবারগুলো বেশ কয়েক যোজন এগিয়ে থাকে মশলার ব্যবহার কৌশল ও বিবিধ বিকল্প প্রণালীর দৌলতে। আজকাল মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে দক্ষিণ ভারতীয় পোহা, উপমা, ইডলি, ধোসা সহ চাইনিস নুডলস, ইতালিয়ান পাস্তা সহ কত রকমারি খাবারেরই না সমাবেশ ঘটেছে। আসলে খাদ্যাভ্যাস একটা প্রবাহিত নদীর মতো, যত বেশি পথ চলবে তত শাখা-প্রশাখারা এসে মিলিত হবে ও মিলেমিশে নিজস্ব ধারা তৈরি হবে। যেমন ধরুন- কোলকাতার ফুটপাতের ওই অপুর্ব স্বাদওয়ালা চাউমিন- দুনিয়ার কোথাও পাবেন না। খোদ চিনা-জাপানিরাও এভাবে ভেজে ডিম-মাংস-ফুলকপি-গাজর দিয়ে নুডুলস খায় নাকোলকাতায় চাইনিস স্ট্রিট ফুডের নামে যে পদ গুলো বিক্রি হয়, আসল চিনারা জানতে পারলে নিশ্চিত মানহানির মামলা করতো।

সভ্যতার শুরুতে যখন দেশ ছিল না তখন মানুষ কাঁচা খেতো। তারপর আগুনে ব্যবহার শিখলে পুড়িয়ে খেতে শিখল, ক্রমান্বয়ে শিখল সিদ্ধ করে খেতে। সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে ভেজে খাওয়া। লিখিত সভ্যতার ১০ হাজার বছরের বিবর্তনে মূলত এই চারটেই মূল খাদ্যধারা। বাঙালি এই চারটেতেই রয়েছে। এক খঞ্চা আদর্শ বিরিয়ানিতেও এই চারটিই রয়েছে। সিদ্ধ চালের উপরে ভাজা পেঁয়াজ বেরেস্তা তার উপরে কাঁচা স্যালাড- আর একপ্লেট পোড়া মাংস অর্থাৎ কাবাব। ব্যাস আর কী চাই! এই কারণেই ইতিহাস, ভূগোল, বাঙালি সবকিছু মিশে গেছে বিরিয়ানিতে

বিরিয়ানি জন্দাবাদ

অকপট জিন্দাবাদ

 

শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ও মুসলমান- কাকে ভোট দিবি?



অমুসলিম MLA দের RSS এর মূল দল BJP তে সরাসরি যাওয়া মারাত্বক অসুবিধাজনক, কারন মুসলমান সমাজে সে গণশত্রু হয়ে যাবে। মুসলমান এমএলএ হলেই সবাই মনিরুল ইসলাম হবেনা, কারন সকলে তো আর পাড়ার স্বেচ্ছাসেবকের ঔরসজাত নয়।
সুতরাং নাগপুরের হাফ প্যাণ্টুলুন কমিটির প্রত্যক্ষ নির্দেশে তাদের দূর্গা মমতা ব্যানার্জি এক ধাক্কায় যখন ২৯৪টি কেন্দ্রে মাত্র ১৪.২৮% মুসলমানকে প্রার্থী করে তখনও তৃণমোল্লাদের "চাঁটা" অংশ সহ লিবেরাল ঝাণ্ডু দের ডায়লোগ চেঞ্জ হয়ে যায়। তারা এখন বলছে এই ঠিক আছে- তোষন হয়নি।
প্রাপ্য চাওয়াটা তোষণ?
অথচ ঝাড়গ্রামে আদিবাসী প্রার্থী, ভাটপাড়া অঞ্চলে হিন্দিভাষী প্রার্থী, উত্তরবঙ্গে উপজাতী প্রার্থী, কোথাও মতুয়া, কোথাও সিডিউলকাষ্ট সহ গায়ক নায়ক- দেড় পয়সার সিরিয়াল অভিনেত্রী বা মূলধারার সিনেমা থেকে বাতিল হয়ে যাওয়া কিছু টালীগঞ্জী জঞ্জাল। সবাই তার কোটা পেয়েছে- শুধু মুসলমান কমেছে। কেন কমেছে? নাহ, জবাব নেই। কারন RSS ঘোষীত মুসলিম বিদ্বেষী, তার শাখা দল তৃণমূল কীভাবে মুসলমানকে জাইগা দেবে, যেখানে বিজেমূলের আঁতাত আর গোপন নেই।
এরা আসলে কারা? এরা এতোদিন অতিবাম, আর কলম বিপ্লবী সেজে থাকত- হঠাৎ করে একজন ভুলভাল বাংলা উচ্চারণ করা, প্রথাগত শিক্ষায় স্বল্প শিক্ষিত টুপিওয়ালা মুসলমান যুবক- মুসলমানদের নিজশ্ব অধিকারের দাবী করতেই এদের দাঁত মুখ বেড়িয়ে এসেছে সুশীলের পোশাক মুখোস খুলে। এরাই এদ্দিন রামরেড বা রাম্বাম বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতো, এক আব্বাসে বামৈশ্লামিক বলে তুরিও সুখ নেওয়ার আগেই বামেদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা মঞ্চে সিমুল সোরেন হাজির ISF এর হয়ে। মিডিয়ার তিনু-রাম বাইনারি উড়ে গেছে পালকের মত।
মাননীয় মনমোহন সিং তাঁর শিখ ধর্মের পাগড়ী পরিহিত হয়ে ১০ বিছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, যোগী মুখ্যমন্ত্রী, বামেদের হরকিষেন সিং সুরজিৎ ছিলেন পাগড়ি পরিহিত শিখ- কারো কোনো সমস্যা ছিল। আব্বাস মুসলমানের অধিকারের দাবী জানাতে, আর বামেরা সেই দাবীকে মান্যতা দিতেই চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে গেছে মুখোশধারীদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। এরা এখন আব্বাস ও বামেদের মাঝে সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পেয়েছে। আসলে RSS এর ঔরসে জন্ম যাদের তাদের তো জিনে সাম্প্রদায়িকতা- বামেরা ভোটের আগেই তাদের চিহ্নিত করে ফেলেছে আব্বাস তাস ফেলে।
মমতা ব্যানার্জী ভবানীপুর থেকে নন্দীগ্রামে পালিয়ে এসেছে কারন সেখানে মাত্র ১৮% মুসলমান ভোট, অথচ নন্দীগ্রামে ৩৫% মুসলমানের ভোট- যা পোলিং ভোটে ৪৬% তে দাঁড়াবে। এই মুসলমান ভোটকে পুঁজি করে যে মমতা ভোট বৈতরনী পার হতে চাইছে- তার দলের প্রার্থীপদে মুসলমানের সংখ্যা নামতে নামতে লোকসভা ভোটের বাম+কংগ্রেসের মিলিত ভোটের পার্সেন্টেজে নামিয়ে দিয়েছে। যদিও অপরাধী তার অপরাধস্থলে ফিরে আসবে এটাই দস্তুর।
এরাই বামেদের ৭% বলতো, আর মমতা মুসলমানেদের সাতের কাছাকাছি এনে দিয়েছে, অথচ রাজ্যে মুসলমান ২৮%, সেই হিসাবে ৮২টা প্রার্থী প্রাপ্তি ছিল অধিকার। কিন্তু নাগপুরের নির্দেশে- যাতে বিজেপির সাথে MLA বিনিময় করতে পারে তার জন্য যত পারা যায় মুসলমান কমিয়ে দাও।
তাহলে মুসলমানের কী হবে? কেন চটি নিজেই তো হিজাব পরে মোনাজাতের ভড়ং করবে। ওতেই তৃণমোল্লাদের ধর্মীয় অর্গাজম হয়ে যায়। হজ্বের বদলে কালীঘাটে তাওয়াফ করলে আর টালিনালার পানিকে জমজম স্বরূপ পান করলেই ঘরের বৌ পোয়াতি হয়ে যায় চটিপন্থী মোল্লাদের। দুধেল গাই বললে এদের শরীরে কামোদ্রেগ হয়ে স্খলনর শিহরন হয়।
বাকি যারা বামেদের নিয়ে হ্যাজ নামাচ্ছে- তাদের শুধানঃ আপনি কী বামেদের ভোট দিয়েছিলেন শেষ দুটো নির্বাচনে? উত্তর আপনি জানেন, তাকে বলুন- "ফোট শালা, আমার খাসি আমি লেজ দিকে কাটব"। এরা কেউ সাধারন ভোটার নয়, বিজেমূলের হয়ে ভাড়ায় খাটা ২ পয়সার আঁটিসেল কর্মী।
এরা ভেবেছিল- বামেরা বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করতে থাকবে, আর বিজেমূল নিজেরাই নায়ক আর ভিলেনের ভূমিকাতে অভিনয় করে গণতন্ত্রকে নাচিয়ে গাইয়ের দল দিয়ে ভর্তি করবে। সোজা কথা- এখন ক্যালাতে এলে পালটা ক্যালান হবে। গায়ক নায়কের রাজনীতিকে গাধার ইয়েতে পাঠিয়ে সভ্যভদ্র শিক্ষিত লোকেদের রাজনীতিতে নিয়ে আসার সময় এটা। বাংলা কাজের লোক চাই, নিজের মেয়ে তো নিজের ঘরে আছে।
মুসলমানের অধিকার চাই, চটির দয়া নয়। বিজেপি RSS এর চোখ রাঙানিও নয়। তৃণমুলের আমলে রাজনৈতিক হিংসার বলি হয় মুসলমান, মারেও মুসলমানকেই গুণ্ডা বানিয়ে। ফলত- মরেও মুসলমান মারেও মুসলমান। শেষ হয় দুটো মুসলমান পরিবার। ব্রাহ্মণ্যবাদী মমতা ক্ষমতা লোটে-
বামফ্রণ্ট- কংগ্রেস মুসলমানকে অধিকার দেবার জন্য যুবক মুসলমান নেতার সাথে জোট বেঁধেছে- যে প্রকাশ্যে মুসলমানের অধিকারের দাবী জানায়। কারো হিম্মৎ বা জিগর হয়নি এই রিস্ক নেওয়ার, বামফ্রণ্ট নিয়েছে, গোঁড়া হিন্দু ভোট কমে যেতে পারে সেই আশঙ্কার পরেও বামফ্রণ্ট মুসলমান নেতাকে নিয়ে জোট করেছে।
আর এতেই জট পাকিয়ে গেছে সুশীল দের - যারা অণ্ডকোষ চুলকে এতদিন" বিকল্প আছে?" বলে উদোম হেসে প্রশ্ন ছুড়ত আজ তারাই দিশেহারা। সরাসরি মাথায় ফেজ টুপি পরিহিত একজন মুসলমান মূলধারার সেকুলার রাজনীতিতে অন্ন বস্ত্র কর্মসংস্থানের দাবীতে গলা তুলে দাবী জানাচ্ছে - এ হজম করা মুসকিলই নয়- অসম্ভবও বটে। সেটা হাড়েমজ্জায় টের পাচ্ছে বিক্রিত মিডিয়া।
আজ মুসলমানদের ভাবতে হবে, তৃণমূল প্রার্থীদের ভোট যে দেবেন- যে কাল জিতে এসে বিজেপিতে চলে যাবেনা তার গ্যারান্টি কি?
আপনি কিন্তু নজরে আছেন জনাব, কাল বিজেপির হাত থেকে তৃণমূল বাঁচাবেনা- ওরা একটাই দল। নিজের ভালো ক্ষাপাতেও বোঝে।
দাড়িওয়ালা আরবী নামধারী কেউ মমতার পক্ষে লিখছে মানেই জানুন- এরা ভাড়াটে, এদের জন্মের দোষ আছে। কারন আজকের পরিস্থিতিতে জারজ ছাড়া কেউ চটির মাঝে মুসলমানের মসিহা খোঁজে না। মমতা ব্যানার্জী কখনই দেশবেচা বিজেপির সাম্প্রদায়িক হিংসার থেকে আপনাকে বাঁচাবেনা, কারন বিজেপি ওনার 'ন্যাচেরাল এ্যালি'। তাই এই সব মুসলমান গুলো RSS এর বীর্য জাত হারামি। এদেরকে শুধু চিহ্নিত করে রাখুন, বাকিটা ক্রমশ প্রকাশ্য
এরাই আগামীতে NRC ক্যাম্পে থাকবে।
আপনি কোথায় থাকবেন? মাতৃভূমি ভারতে না ডিটেনশন ক্যাম্পে?

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

তৃণমূলের ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা



ভোটের আগে তৃণমূলের একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চাই- এই জন্য মমতা-RSS জুটির প্রচেষ্টার খামতি নেই। হতেই পারে বাম-কংগ্রেসের ব্রিগেডের দিনেই এমন কিছু করে মিডিয়াতে ব্রিগেডের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হবে, যেমন গতবার রাজীব কুমার নাটক ছিল।

এবারে গল্পটা অন্য, RSS এর ঘরোয়াপসি বা দ্বিরাগমন অব্যাহত।
তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার ঢল অব্যাহত। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা ট্রলিং সবই চলছে। তবে এই সব আলোচনাগুলোই হচ্ছে মূলত তৃণমূল থেকে যাওয়া হিন্দু নেতাদের নিয়ে। এর পাশাপাশি মুসলিম নেতাদের একাংশও বিজেপির দিকে বিভিন্ন সময় পা বাড়িয়েছেন।
মনিরুল ইসলাম থেকে অনুব্রত ঘনিষ্ঠ করম হোসেন খান বা বাবু মাস্টার... তালিকাটা কিন্তু কম নয়। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হতে পারত কবিরুল ইসলামের, যিনি তৃণমূলের সংখ্যালঘু সেলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যুবনেতা কবিরুলের দল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়া কিন্তু তৃণমুলের জন্য বড় ধাক্কা, যদিও এটা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বিশেষ আলোচনা হয়নি। কিন্তু এই ঘটনায় সংখ্যালঘু জনতার মনে তৃণমুল নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বাস গড়ে উঠছে।
আজ বিজেপি বিরোধী জনগণ যাকে নির্বাচিত করবেন তিনি যদি কাল বিজেপির কোলে উঠে বসেন তাহলে তাকে ভোট দেবার সার্থকতা কোথায়? তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার ঘটনাগুলিকে জাস্টিফাই করতে গিয়ে একটা বাইনারি ছড়ানো হয় যে তৃণমূলের হিন্দু নেতারাই বিজেপিতে যাচ্ছে এবং মুসলিম ভোট ও মুসলিম নেতৃত্ব অটুট আছে। তৃণমূলের সংখ্যালঘু সেল এর সাধারণ সম্পাদকেরই বিজেপিতে যাওয়াটা কিন্তু এই বাইনারিকে মিথ্যা প্রমান করছে।
বিধানসভা ভোটে তৃণমূল সর্মথকরা বিজেপিকে আটকাতে কোন মুসলিম নেতাকে যদি ভোট দেন এই বিশ্বাসে যে তিনি মুসলিম বলে বিজেপিতে যাবেন না, সেই বিশ্বাসও কিন্তু ভেঙ্গে যাচ্ছে কবিরুলদের বিজেপি গমনে। মাঝখানে RSS এর দূর্গা নানান জেলায় মুসলমানেদের একটা করে দোকান খুলে দিয়েছিল, আজ তারাও প্রকাশ্যে তৃণমূলের হয়েই গলা ফাটাচ্ছে - অথচ এরাই ৪ দিন আগে রাজনৈতিক নিরপেক্ষ ছিল।
আসলে দাড়ি ও টুপি কোনোটাই ইসলামে ম্যান্ডেটারি নয়, সেই দাড়ি টুপির ভেকধরে একদল সুশীল চুতিয়া সায়াতলে মাসকাবারে খেপ খাটত, এখব তাদের বাপেরা প্রকাশ্যে বিজেপিতে চলে যেতেই এদের পোঁদ উদোম হয়ে হাম্বানটোটা দেখা যাচ্ছে নিকারাগুয়া সহ। এরাও আসলে RSS এর বীর্যে জন্ম- তাতে যতই আরবি নামধারী উল্লা-উল-আলী- বা নামের আগে মুহাম্মদ থাকুকনা কেন। এই বেজম্মার বাচ্চারাই - "বিজেপি এলে সব শেষ" বলতে বলতেই দেখবে কবে গিয়ে নিজেকে গেরুয়া করে নিয়েছে।
চরম মুসলিম বিদ্ধেষী হিসেবেই বিজেপির পরিচিতি, তাদের নেতারাও প্রকাশ্যেই বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ান। বিদ্বেষ ছড়ানো সত্ত্বেও তৃণমূলের মুসলিম নেতারা বিজেপিতেই
যোগ দিচ্ছে কেন এই প্রশ্নেরও জবাব না তৃণমোল্লাদের কাছে আছে না চটিচাঁটা উন্নয়নের পাহাড়াদারদের কাছে। বাম বা কংগ্রেসের কিছু নেতা গত কয়েক বছরে দলবদল করেছেন, তাদের বেশীরভাগই তৃণমুলে গেছেন কেউ কেউ আবার বিজেপিতে গেছেন।
বামেদেরও পার্টি মেম্বার বিজেপি বা তৃণমূলে গেছে, দলবদলের এই সংস্কৃতি মমিতা ব্যানার্জীর আমদানি। ২০১১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত মুকুল রায়কে লেলিয়ে- পুশিল, মামলা, পদের লোভ দেখিয়ে ঘোষনা করেছিল- সিপিএম শেষ। কালের চক্রে আজ হাফ দশকের মধ্যেই তৃণমূল সাইনবোর্ডে পরিনত হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। শেষ পর্যন্ত সব আসনে প্রার্থী দিতে পারলেই সেটা মমতা ব্যানার্জীর কৃতিত্ব হিসাবে গন্য হবে।
যারা উটপাখির মত বালিতে মুখ গুজে দিদির থুতু চাঁটিতে ব্যাস্ত, তাদের বলি- আপনাদের পোঁদটা কিন্তু খোলা ও রমনের পজিশনে- কখিন যে বিজেপি এসে পোঁদ মেরে দিয়ে গেরুয়া বাচ্চা পয়দা করে দেবে ধরতেই পারবেননা।
তৃণমূলের নেতারা হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে বিজেপির দিকে যাচ্ছে- এর একটাই কারন- উভয় দলই RSS এর শিকড় থেকে পুষ্ট। তারা দলের সাথে মানিয়ে নিতে পারছেন না তাই দলবদল করতে চান- এটা একটা বড় চালাকি, সবটাই প্রিপ্ল্যান্ডড। নতুবা শুধুই বিজেপির দিকেই তাদের গতি হতনা। এরা সকলেই দলের "শীর্ষ" নেতৃত্বের নির্দেশেই (ত্রিপুরায় যেমন পুরো তৃণমুল দলটাই বিজেপিতে মিশে গেছে ) বিজেপির দিকে যাচ্ছে আর তৃণমূল বিজেপির মধ্যে যে খেলাটা দেখা যাচ্ছে সেটা পুরোটাই গটআপ।
মুকুল রায় এই সেতুবন্ধনে নলের ভূমিকাতে ছিল, বানরসেনারা তাতে পাথর দিয়েছে, এই পথেই দুই ফুলের মিলন ঘটেছে।
৭% , রামের ভোট বামে .. এই প্রচার গুলো নিজেদের পোঁদের গু যাতে অন্যে না দেখিতে পায় সেই উদ্দ্যেশ্যে ও নিজেদের, RSS আঁতাত ঘটনাগুলিকে চাপা দিতেই খ্যামটা নাচাচ্ছে লিবেরালের বাচ্চারা ও তৃণমোল্লারা।
বঙ্গে NRC কিন্তু মমতা ব্যানার্জীই চেয়েছিল।

শুক্রবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

ভারত বনাম ইন্ডিয়া

 


একটি টুইট
একটি টুইটেই সমস্ত আম্যিকেবলের বাচ্চাদের ইজের খুলে পায়ুপথের রন্ধ্র দেখিয়ে দিয়েছে, স্বার্থের নগ্নতায় হিরোর আসন থেকে এভাবেও সরাসরি আস্তাকুঁড়ে কেউ যেতে পারে তা রিহানার একটা টুইট প্রমান করে দিয়েছে।
স্যালুট- INDIA আর ভারতের মাঝের সর্বগ্রাসী লুঠেরা ব্যবধানটা দিনের আলোতে স্পষ্ট করার জন্য।
ফ্যাসিবাদী বিজেপি, নপুংশক RSS, আম্বানী, আদানী, কানাডা কুমারের বলিউড আর জয় শাহ এর ভারতীয় ক্রিকেট ও অমেরুদণ্ডী ক্লীব ক্রিকেটারদের INDIA ইউনাইট হয়েছে- নিজেদের কোটিটাকার স্বার্থ সুরক্ষিত করতে।
অন্যদিকে কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, কর্মহীন শিক্ষিত বেকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জাত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গরীব খেটে খাওয়া জনগণ, লকডাউনে পায়ে হেঁটে ঘরে ফেরা শ্রমিকের ভারত- তারা হ্যাসটাগ বোঝেনা, প্রভুর আনুগত্য বোঝেনা। দেশ কী সে সংজ্ঞা লেখে- তারা একত্রিত হয়েছে পেটের জ্বালায়, মানচিত্রকে স্বস্থানে টিকিয়ে রাখতে, দেশকে বেনিয়াদের হাতে ধর্ষিত হওয়া থেকে বাঁচাতে।
এ লড়াই অসম, জনগণ বনাম বিকৃত রাষ্ট্র, শিক্ষা বনাম মূর্খের লড়াই, ঐতিহ্য বনাম আরোপ, পুঁজি বনাম খিদে, বৈভব বনাম বাঁচার লড়াই, INDIA বনাম ভারত।

আপনি কোন দেশের অধিবাসী? ভারত না INDIA?

রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

সময়চর্চা- আমেরিকা 21

 

#রবিবাসরীয়

একটা হলিউডি টাইম ট্রাভেল সিনেমা দেখেছেন! ১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটির নাম ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’। সিনেমাটির প্রেক্ষাপট হচ্ছে একটি শীতকাল, যাকে ‘যুগান্তকারী শীত’ নামে উল্লেখ করা হয়েছিল কাহিনীতে। সেই সিনেমাতে দেখানো হয়েছিল এক মহা ধনকুবের ভিলেনের অনুগামীদের সশস্ত্র বাইক বাহিনীর দাপট ক্যাপিটাল বিল্ডিং এলাকায় চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। যারা সিনেমাটা দেখেছেন তারা জানেন, ভিলেনের অবয়বের সাথে ট্রাম্পের কী আশ্চর্য মিল, ট্রাম্পের মত সেই ভিলেনেরও একটা ক্যাসিনো ছিল। সিনেমাটিতে একটা বাড়ি দেখানো হয়েছিল ‘হোম অফ টুমোরো’ নামে, প্রসঙ্গত ট্রামের বাড়ির সাইনবোর্ডেও সেই বাক্যই হুবহু লেখা আছে, যা IKEA নামের আসবাবের ব্যান্ড তাদের ট্যাগলাইন হিসাবে ব্যবহার শুরু করে পরবর্তীতে। সিনেমার জনপ্রিয় সংলাপ ছিল ‘এনাফ ইজ এনাফ’, কাকতালীয়ভাবে বর্তমান আমেরিকা প্রেসিডেন্ট বাইডেন থেকে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ওবামা- সকলেই ‘এনাফ ইজ এনাফ’ মন্ত্র জপে গেছে ভোট প্রচার কাল ও তদপরবর্তী সময়ে।
আমাদের এই ‘টু ডাইমেনশনাল’ লজিকের পৃথিবীতে যেটা দেখছি বা জানছি- সেটাই একমাত্র ধ্রুব সত্য নয়; এর বাইরেই অধিকাংশটাই অজানা রয়ে যায়, জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে সেগুলোর কিছুকে যদি ছুঁয়ে আসা যায়, দেখা যাবে পাশের সামান্য জিনিসটি অসামান্য হয়ে উঠেছে। আমরা যারা ইলুমিনাতি, ফ্রি ম্যাসনারি বা গুপ্ত সংগঠনের বিষয়ে চর্চা করি, যারা ১৩ রয়্যাল ব্ল্যাডলাইন নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করেছি, যারা One world Order তত্ত্ব নিয়ে নিয়মিত খবরাখবর রাখি শখের বসে, তারা জানি ও মানি যে- কোনো কিছুই কাকতালীয় হয়না, সবটাই ‘প্রোগ্রাম’ করা আছে। যারা জানেননা তারা এই অনুচ্ছেদটি দায়িত্ব নিয়ে উপেক্ষা করুন, নতুব বহু পড়তে হবে।
গত পরশু অর্থাৎ ২০ই জানুয়ারি ২০২১ তারিখে বাইডেন মন্ত্রীসভা শপথ নিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে। সেই বাইডেন, যার প্রত্যক্ষ যাজকতায় আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই যুদ্ধবাজের ঘরেই এখন যুদ্ধ ঢুকেছে। ট্রাম্প ছিল মুখে মার পালোয়ান, মুখেই তম্বি করে গেছে, যুদ্ধ করেনি একটাও। বাইডেন কিন্তু যুদ্ধ বাঁধাবে তুরস্কে, যদি তার পূর্ণ প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদকাল উত্তীর্ণ করতে পারে- তবেই।
গত ৬ই জানুয়ারি ট্রাম্প ভক্তদের রক্তক্ষয়ী আক্রমণের দরুন এমনিতেই সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন প্রশাসনের ভিত টলিয়ে দিয়েছে। সেই কারনেই মার্কিন ইতিহাসে নজিরবীহিন ভাবে প্রথমবারের জন্য নিশ্ছিদ্র সামরিক নিরাপত্তার ঘেরাটোপে তাদের নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের অভিষেক হলো মসনদে। বিদেশী হানাদার বা জঙ্গি গোষ্ঠীর নামে নির্বিচারে মানুষ খুন করা মার্কিন রাষ্ট্রনেতারা- নিজ দেশেরই উন্মাদ ও গোঁড়া ধার্মিক গোষ্ঠীর ভয়ে সুড়ঙ্গে লুকিয়েছিল। এমনই কিছু একটা যে ঘটতে চলেছে তা গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০২০তে বেশ কয়েকটা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছিলাম এই ফেসবুকেই। এমনিতেই উস্কানিমূলক মন্তব্যের জেরে ন্যাক্কারজনকভাবে ট্রাম্পকে সাসপেন্ড করে দিয়েছিল টুইটার বা ফেসবুকের মত জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রের ‘গদিতে আসীন’ প্রেসিডেন্টকে এইভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাটা এককথায় স্বপ্নাতীত ছিল কিছুদিন আগেও, আজ সম্ভব- এটাই চুম্বকে আভ্যন্তরীণ মার্কিন রাজনৈতিক চালচিত্র।
ওয়াসিংটন ডিসিতে ২৫ হাজার ন্যাশানাল গার্ড মোতায়েন করে সম্পন্ন করা হয়েছে এই ‘ঐতিহাসিক’ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। গত ১০ দিন ধরে লাগাতার সশস্ত্র টহলদারি করছে সাঁজোয়া গাড়ি সহযোগে, যেন আমেরিকা নয়- উপদ্রুত সিরিয়ান কোনো অঞ্চল। ক্যাপিটাল বিল্ডিং এর ৬ কিলোমিটারের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থকদের ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল অলিখিত কমান্ডে, পাশাপাশি সড়কে ও বসত বাড়িগুলোতেও ছিল চিরুনি তল্লাশি- পাছে ট্রাম্প সমর্থকেরা লুকিয়ে না থাকে সেখানে। গোটা হোয়াইট হাউজের বাউন্ডারিতে ৩ ফুট দূরত্বে মেসিনগানধারী মার্কিন সেনারা রণসাজে সজ্জিত হয়ে প্রহরা দিচ্ছে- এ দৃশ্য তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি অত্যাচারিত জনগণের মুখে হাসি ফুটিয়েছে বৈকি। আজ রক্তচোষক যুদ্ধবাজের ঘরে যুদ্ধ ঢুকেছে।
‘ভার্জিনিয়া সিটিজেন ডিফেন্স লিগ’ নামের একটা রক্ষনশীল প্রোটেস্ট্যান্ট ট্রাম্পভক্ত সংগঠনের নেতৃত্বে- ওয়াসিংটন ডিসির পাশের রাজ্য ভার্জিনিয়াতে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কমপক্ষে ১৫ হাজার সদস্য জড়ো করেছিল হোয়াইট হাউস দখলের লক্ষ্যে। ওহিয়ো অঙ্গ রাজ্য থেকে ওয়াসিংটন পর্যন্ত বিপুল সমাবেশ করেছে ট্রাম্পের সমর্থকেরা, প্রতিটি ক্ষেত্রে রীতিমত অস্ত্রপ্রদর্শনীর মিছিল করেছে ন্যাশানাল গার্ডদের নিরাপত্তায়। নির্বাচন পরবর্তী এমন সশস্ত্র মহড়া আমেরিকার ইতিহাসে ইতিপূর্বে কখনও ঘটেনি। এদের উপরে রাজ্য পুলিস গুলোর সেভাবে নিয়ন্ত্রণ নেই, কারন এদের উপরে হামলা হলেই তা ‘ধর্মের উপরে হামলা’ বলে উস্কানি দিয়ে সমাজে আগুন লাগিয়ে দেবে; বস্তুত এরা এটাই চাইছে যে পুলিস প্রশাসন এদের উপরে হামলা করুক- তাহলেই অরাজকতা শুরু।
এই গোঁড়া সংগঠনগুলোর সমন্বয় মঞ্চ গত ১৮/০১/২১ তারিখ প্রকাশ্য সমাবেশের মঞ্চ থেকে অস্ত্র মহড়া সহ একগুচ্ছ কর্মসূচীর আগাম ঘোষণা দিয়েছে, যা সমমতাদর্শী ৩৭টা গণসংগঠন সমন্বয়মঞ্চের পাশে থাকার সম্মতি দিয়ে রেখেছে। অন্য আরেকটি শহর ‘রিচমণ্ড হিল’ এলাকাতেও প্রায় ২ হাজার সশস্ত্র ট্রাম্প সমর্থকেরা বিশাল বাইক মিছিল করে প্রাশসনের বুকের উপরে তান্ডব চালিয়েছে। ট্রাম্প সমর্থকদের কাবুতে রাখার জন্য ১৯টি রাজ্যে আরো ৪৭ হাজার সেনা নামিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন, বেশি কিছু শহরে আংশিক কার্ফু জারি করে রাখা হয়েছিল। ট্রাম্প নিজে তার সকল অনুগামীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছে, তার নৈতিক সমর্থন ও সহানুভূতি রআছে বিক্ষোভকারীদের প্রতি। এই ছিল সামগ্রিক পরিস্থিতি।
ট্রাম্প সেভাবে বাইডেনের উপর মন্তব্য করেনি গদি ছাড়ার আগে, কিন্তু কমলা হ্যারিসকে নিয়ে তার মন্তব্য হচ্ছে অত্যন্ত রহস্যজনক। তার ভাষ্যমতে- “এই মহিলা অত্যন্ত ধুরন্ধর, একে কখনোই আগামীতে প্রেসিডেন্ট হতে দেওয়া যাবেনা। এর উপরে কঠোরভাবে নজর রাখা আমাদের জাতীয় কর্তব্য”। বিদায়ী ভাষণে ট্রাম্প দৃশ্যত পরাজয় স্বীকার না করে দৃঢ়তার সাথে বলেছে- “আবার ফিরে আসব”; যা মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল ইতিহাসে প্রথম কেউ এমন বলেছে প্রকাশ্যে। এটা যে ভোটে জিতেই আসার কথা বলেছেন- তেমন কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞেরা, কারন ট্রাম্প মানেই আবেগ আর নিয়ম ভাঙার মিছিল, স্বভাবতই অশান্তির আশঙ্কা জিইয়ে রেখে এই আপত বিদায়ের পালা সাঙ্গ হলেও রণেভঙ্গ পড়েনি।
কিছু কন্সপিরেশি থিয়োরিস্টদের দাবী, এক শ্রেণীর ‘এ্যান্টি-ক্যাথোলিক’ গোঁড়া প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের মতে- আমেরিকার ৪০০ বছরের দাসত্বের মুক্তি ঘটেছে। ১৬১৯ সালে ২০ বন্দী নিয়ে একটি জাহাজ ভার্জিনিয়ার পয়েন্ট কমফোর্টে পৌঁছে আমেরিকার মাটিতে ‘দাসত্ব’ যুগের যাত্রা শুরু করেছিল। প্রাচীন ব্যাবিলনীয় পৌরাণিক কেচ্ছা কাহিনী মোতাবেক- ৪০০ বছরের শেষে এই দাসেরাই নাকি ‘সাদাদের’ উপরে রাজত্ব করবে- ২০১৯শে সেই ৪০০ বছর শেষ হয়েছে। প্রসঙ্গত, কমলা হ্যারিসকে সেই আফ্রিকান দাসেদেরই প্রতিভূ হিসাবে দেখছে এই প্রটেস্ট্যান্ট বাহিনী। গোঁড়া প্রটোস্ট্যান্টরা ইস্টার ডে’তে ডিমের প্রদর্শনী করে- দেবী আইসিসের উদ্দেশ্যে নৈবদ্য সাজিয়ে। ব্যাবিলনীয় পুরাণের রাজা নিমরোদ বা নমরুদের স্ত্রী আইসিসেরই অপর নাম ইস্তার, তার নামেই দিনটি নামেই পালিত হয়- যিনি উর্বরতার ও পুনরোজ্জীবনের প্রতীক ছিলেন। এ সবই ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী প্রটেস্টান্ট খ্রীষ্টীয় বিশ্বাস, ক্যাথোলিকদের মত এরা নিউ টেষ্টামেন্টকে মানেনা। এখানেই শেষ নয়, প্রটেস্ট্যান্টরা ২৫শে ডিসেম্বর ‘সান’ গডেরও উপাসনা করে, যা প্রাচীন ব্যাবিলনীয় দেবতা। মোদ্দাকথা ৪৯% প্রটেস্ট্যান্ট আমেরিকান- প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয় সভ্যতার সময়কার একটা ‘ককটেল’ ধর্মবিশ্বাসের উপরে ভিত্তি করেই ১৬% ‘সংখ্যালঘু’ ক্যাথোলিকদের ভয়ঙ্কর শত্রু হিসাবে মনে করে।
এই সব নানা হিসাব নিকেশের মাঝে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হচ্ছে ক্যাথোলিক বাইডেনও না ক্যাথোলিক কেনেডির মত ‘বিক্ষুব্ধ’ নামধারী কিম্বা ‘ট্রাম্প সমর্থকের’ ছদ্মবেশে গোঁড়া প্রোটোস্ট্যান্ট দলের হাতে পরিকল্পিত খুনের শিকার হয়ে যায়। ভঙ্গুর গণতন্ত্র, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বিভ্রান্তিমূলক পররাষ্ট্র নীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ধস, বেকারত্ব ও অভিবাসন সমস্যা ছাপিয়েও আমেরিকার সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরির নাম বর্ণবাদ সমস্যা। এই মুহূর্তে বাইডেন ৭৮, শারীরিক বা মানসিক ভাবে যদি অক্ষম হয়ে যায় কিংবা দুর্ঘটনায় বয়স জনিত অসুখের দরুনও মৃত্যু ঘটে- স্বাভাবিকভাবে প্রেসিডেন্ট হবে কমলা হ্যারিস। রুজভেল্টের মৃত্যুর পর হ্যারি ট্রুম্যানও এভাবেই ক্ষমতা পেয়েছিল। ট্রাম্প কী এই কারনেই হ্যারিসের উপরে বিশেষ নজর রাখার কথা বলেছেন?
সুতরাং আগামীর আমেরিকা ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধের দিয়ে এগোচ্ছে যার পরিণতি হিসাবে বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা, ডলারের পতন, ব্যাঙ্কিং দুরবস্থা, ইলেকট্রিক্যাল ব্ল্যাক আউট, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পরিসেবা সাময়িক স্তব্ধতা, শিল্প সঙ্কট, শেয়ার বাজার ধস, নতুন ভাইরাস মহামারী, কৃত্রিম ভূমিকম্প, সুনামি, মিশরের পিরামিড ধ্বংস থেকে কী কী যে ঘটবেনা সেটাই বলা দুস্কর। মার্চ ২০২১ পরবর্তী সময় থেকেই এই অশুভ সময়ের মূল পালাগান শুরু হবে হয়ত, যার ট্রেলার ছিল গত ৬ই জানুয়ারি। সমসাময়িক ঘটনা পরম্পরা ও ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে- এ সবই আসলে অনুমান ভিত্তিক সম্ভাবনা মাত্র; আসল সত্যটা কেবল ভবিষ্যতই বলতে পারবে।
কিন্তু, এসবে লাভ কার হবে?
একমদ্বিতীয় ইজরায়েল। ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ অশান্তি মানেই তা থেকে ইজরায়েল ভরপুর মুনাফা কামিয়েছে। সদ্যনিযুক্ত মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনেই ‘জেরুজালেম একমাত্র ইহুদিদের’ ঘোষণার পরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির পারদ উচ্চ গ্রামে চড়তে শুরু করে দিয়েছে। পিতাকে হত্যা বা গুম করে ক্ষমতা দখলের পরম্পরা তো ইতিহাসে ভুড়িভুড়ি, ইজরায়েলও তো আমেরিকারই বরপুত্র। আমি ভাবনার সুতো খুলে দিলাম মাত্র, বাকিটা জেনে নেওয়ার দায় আপনার- যদি আগ্রহ থাকে।

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২১

কলঙ্কিত RSS

 


ব্র্যাণ্ড হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা সাভারকারকে স্বীকৃতি দিতে মরিয়া কেন?

১. হিন্দুত্ববাদের তাত্ত্বিক পটভূমি রচনার কৃতিত্ব বিনায়ক দামোদর সাভারকারের উপরই বর্তায়। তার ‘হিন্দুত্ব’ নামের বইটিই আজকের হিন্দুত্ববাদীদের কাছে একমাত্র ‘ধর্মগ্রন্থ’।
২. সাভারকার ছিলেন অন্ধভাবে মুসলিম ও খ্রীষ্টান বিরোধী। ‘ভারতীয়ত্ব ও হিন্দুত্ব’ সমার্থক- এই বাক্যটিকে মন্ত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘হিন্দুত্ব’ নামের বইটির অবদানই সাভারকরকে ইতিহাসের আস্তাকুর থেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
৩. গান্ধীর অহিংসা নীতি ও নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক উদারমনস্কতার তিনি আজীবন বিরোধিতা করেছেন সাভারকর। ভারতভাগের প্রথম প্রবক্তা ‘হিন্দু মহাসভার’ মাধ্যমে নিজে যুক্ত থেকে- কৌশলে জাতীয় কংগ্রেসের ঘাড়ে দায় চাপিয়েছে দেশভাগের। একবিংশ শতকের ভারতে এই ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি রাজনৈতিকভাবে অতি প্রয়োজনীয়।
৪. কংগ্রেসের কাছে যেখানে শতশত দেশপ্রেমিক বিপ্লবী, সেখানে স্বাধীনতার সময়ে একমাত্র জেলখাটা কেউ যে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী ছিল তিনি সাভারকর, তাই তাকে নিয়ে RSS ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল’ তত্ত্ব প্রভার করে দেশপ্রেমিকের নতুন সংজ্ঞায়ন করেছে।
৫. হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্ববাদকে এক ঘটিতে ভরে- ‘মুসলিম এবং খৃষ্টানদের’ বাদ দিয়ে বৃহত্তর হিন্দুস্তানী সমাজ গড়ে তুলতে পারলেই একমাত্র ক্ষমতা দখল করা সম্ভব- এটা ছিল তার ভাবনা। অযোগ্যদের ক্ষমতায়নের সোজা পথ যে ধর্ম, সেটা সাভারকর দেখিয়েছিল। আধুনিক ভারতে ধর্মের জিগির তুলে রাজনৈতিক ক্ষমতাদখলের প্রাণভোমরা সাভারকারের তত্ত্বেই নিহিত রয়েছে।
৬. আন্দামান সেলুলার জেলে বারবার বৃটিশের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা এবং শেষে মুক্তি – তার যুক্তি হিসাবে ভক্তেরা বলে- সাভারকর ছত্রপতি শিবাজির বিপ্লবীধারার অনুসারী ছিলেন, সেই পটভূমিতেই ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করে যার প্রমাণাদি নেই- কেবলই বিশ্বাস আছে। শিবাজি ১৬৬৬ সালে আগ্রায় কৌশলে আওরঙ্গজেবের বন্দীশিবির থেকে পালিয়ে যান; তার সাযুজ্য রয়েছে ১৯১০ সালে সাভারকারের ব্রিটিশ জাহাজ এসএস মোরিয়া থেকে সমুদ্রে ঝাঁপানো এবং ফরাসী বন্দর মার্সাই-এর কাছে ধরা পড়ার সঙ্গে। সাভারকরকে যখন ভারতে আনা হয়েছিল তখনও তিনি ব্রিটিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
শিবাজী তাঁর বন্দীদশাকালে আওরঙ্গজেবের কাছে চারটি ক্ষেত্রে ক্ষমা চেয়েছিলেন। চারটি ক্ষমার ভিত্তিতে মোগল এবং শিবাজির মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। এবং ছত্রপতি শিবাজী কূটনৈতিক এবং সামরিক কৌশলের অংশ হিসাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন বলে নিজেই পরে এই চুক্তিগুলির মধ্যে তিনটি ভেঙেছিলেন।
সাভারকার হিন্দু পরিচয়, হিন্দু সংহতি এবং হিন্দু ঐক্যের উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি মৌর্য, গুপ্ত, চোল, মারাঠা প্রভৃতি হিন্দু নেতাদের প্রতিমূর্তি পুনর্নিমাণ করেছিলেন। সাভারকারের মতে, এঁরা এবং আরও অনেক রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক যেমন পুরু, পৃথ্বীরাজ চৌহান, রানা প্রতাপ, শিবাজী, মহারাণী লক্ষ্মীবাঈ প্রমুখ, যাঁরা বিদেশী হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের কাহিনীই জনগণকে অনুপ্রাণিত করবে। তাঁর মতে বৈদিক যুগ থেকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের শাসনের শেষ অবধি হিন্দু রাজাদের শাসন ছিল ভারতের হিন্দুদের স্বর্ণযুগ। ১৫৫৭ সালে দিল্লির সুলতানি আমলের সময় থেকে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত ইসলামিক বিজয়ীদের যুগ, যা ছিল হিন্দুদের অন্ধকার যুগ।
সাভারকর অনুভব করেন যে, ব্রিটিশরা হিন্দুদের পক্ষে অনেক কিছু করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। তিনি নিজেও ব্রিটিশদের কাছে হিন্দু সমাজের উন্নতি কল্পে কখনও কোনো প্রস্তাবনা বা চিঠিপত্র দেননি, বরং মাসিক ভাতা নিতেন ব্রিটিশ সরকারের থেকে। সাভারকরের বইতে হিন্দুদের উপর মুসলমান অত্যাচারের গল্প ফাঁদলেও, কীভাবে ৬০০ বছরের মুসলমান শাসনের পরেও মোট জনসংখ্যা ৮৭%ই হিন্দু রয়ে গেছিল তার কোনো ব্যাখ্যার ধারেপাশে যাননি। মুসলমানেদের বিপক্ষে এমন রগরগে কেচ্ছা গল্পের লেখক যে RSS এর নায়ক হবে সেটা বলাই বাহুল্য।
গান্ধী অহিংসার বিষয়ে কথা বলেন এবং সাভারকার হিংসার প্রচারক। এটা সত্য যে গান্ধী মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না, কিন্তু সাভারকার ছিলেন- নতুবা বারে বারে ক্ষমা ভিক্ষা চাইতনা। গান্ধী যেমন কংগ্রেসের পক্ষে অহিংস বীর সাহসী, সাভারকার তেমনি হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষের বীর হতে চেয়েছিলেন- তাই স্বঘোষীতভাবে নিজের নামের সামনে বীর জুড়ে নিয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে, গডসেকে দিয়ে এই সাভারকরেরাই গান্ধীহত্যার মত নিকৃষ্ট বর্বর ষড়যন্ত্র রচনা করেছিল, গডসে সাভারকারের শিষ্য ছিলেন। গডসে যে আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছিল, গান্ধীহত্যার জন্য প্রশিক্ষিত জঙ্গি ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল আজকের তালিবান বা IS দের মত, সেই আদর্শ সাভারকর দ্বারা পরিচালিত ছিল। সাভারকরের সেই মতাদর্শগত লড়াই আজও চালাচ্ছে সঙ্ঘপরিবার ও তাদের রাজনৈতিক দল BJP।
গান্ধী দ্বারা প্রচারিত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ দেশকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল, আর সাভারকারের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ছিল ধ্বংসাত্মক উস্কানিমূলক, বিভাজনের রাজনীতির জন্মদাতা। গান্ধীর জাতীয়তাবাদ অহিংস, ফলতঃ ‘ইনক্লুসিভ’। সাভারকারের জাতীয়তাবাদ উত্তেজক ও বিপজ্জনক, ‘এক্সক্লুসিভ’। সেই জাতীয়তাবাদে জীবনের কোনও সম্মান নেই। হেডগেওয়ার, গোলওয়ারকার মোহন ভাগবত থেকে শুরু করে, বাজপেয়ী, আদবানী অমিত শাহ পর্যন্ত এই বিভাজনের রাজনীতির প্রচারক। এই জাতীয়তাবাদের শিকড় এই দেশে নেই, এটি আমদানিকৃত। জার্মানিতে এই জাতীয়তার শিকড় রয়েছে এবং ইতালিতে মুসোলিনি দ্বারা প্রভাবিত, যা বিরোধী শক্তিকে চূর্ণ করার কথা বলে।
সাভারকার ও গান্ধীর প্রতিতুলনা সাম্প্রতিক সময় আসতে বাধ্য, নইলে বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ হয় না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মৃদু ও সাত্ত্বিক মুখভাবের পরিবর্তে আমরা দেখতে পাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রগলভ ও রাজসিক মুখ, অনন্ত মিথ্যার অধিকারী এক রাজেনেতা যার সবটাই ফাঁপানো। ‘শ্রী অনন্তমূর্তি’ যিনি সাভারকারের হিন্দুত্ব আর গান্ধীর হিন্দু স্বরাজের তুলনা করেছেন খোলাখুলিভাবে- তিনি আবার মোদীকে সাভারকরের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বর্ননা করেছেন। মোদী দ্বারা চালিত দেশ আসলে ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবদমিত লোভের বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের সময় এই মুখটি মিডিয়ার প্রিয় হয়ে ওঠে, তাই হাজার হাজার ভক্ত মোদীকে মুখোশ জেনেও উদ্বেল হন। সমগ্র মানব ইতিহাসে মানুষ বিজয়ীর বিজয়কে অনিবার্য হিসাবে গ্রহণ করেছে। এই গ্রহণযোগ্যতা আত্মতুষ্টির মধ্যে থেকেই জন্মগ্রহণ করে, একটি আরামদায়ক জীবনের নিশ্চয়তার জন্ম দেয়।

মনে রাখতে হবে গডসের পুরুষত্ব বা নিজেকে বিজয়ী প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষা ছিল না। গডসে প্রথমে তার হাত জোড় করে প্রণাম করে এবং তারপরে জাতির পিতাকে – এক উন্মুক্ত বক্ষের বৃদ্ধকে – গুলি করেছিল। গান্ধীর পুলিশ সুরক্ষাটুকুও ছিল না। চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতাকামী ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি গডসের এই পদক্ষেপ ছিল- আজকের মোদীয় রাষ্ট্র গঠনের যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত নৈবেদ্য। আর এই যজ্ঞের মন্ত্র ছিল সাভারকার আদর্শ। গণতান্ত্রিক ভারতে, আমাদের সকলের মধ্যে সুপ্ত এই শীতল নৃশংস অনুভূতিই পবিত্র গঙ্গায় আরতি উৎসর্গ করার সময় মোদী এবং ভক্তদের মধ্যে প্রকাশ পায়।

মূল লেখাঃ পার্থ প্রতিম মৈত্র।
সম্পাদনা ও সংযোজনাঃ হককথন

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

অকপট চড়ুইভাতি ২০২১



সম্পূর্ণ সিডিউল

শেষ কয়েক বছরের পরম্পরা মেনে করোনাকাল-২০২০ সালে অকপট চড়ুইভাতির আয়োজন করতে পারেনি টিম ‘অকপট’। ২০২১ এর শুরুর লগ্নে যখন প্রায় সকল কিছু আবার ছন্দে ফিরেছে, অকপটও সেই তালে পা মিলিয়ে কিছুটা মুক্তির স্বাদ পেতে মরিয়া।

অকপট চড়ুইভাতি মানে- শুধুই তো আর খাওয়াদাওয়া নয়, বরং এটা বাৎসরিক পারিবারিক মিলনোৎসব। অকপটুরা নিজ নিজ পরিবারের সাথে ৩টে দিন একসাথে থেকে, ভ্রমণ করে নিজেদের হৃদয়ের উষ্ণতা ভাগ করে নেয় এমন একটা সম্মিলনীতে। এটাকে যেমন শুধুই পিকনিক বলা যায়না তেমনই একে শুকনো ভ্রমন ও বলা চলেনা, এ আসলে অকপট চড়ুইভতি, এখানে ভ্রমণ ও চড়ুইভাতির সম্মিলনী ঘটে অন্তরের টানে।

এ বছর আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী ২৯শে জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২১। ঠেক- গিধনি।

গিধনি, এটি হল পশ্চিবঙ্গের অন্তিম রেলস্টেশন। মাইলের পর মাইল খাঁ খাঁ ঢাড় জমির ওপর দিয়ে হুমহাম শব্দে তীর ধনুক নিয়ে এখান দিয়েই শিকারে যেত আদিবাসীরা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বাজার দোকান সবই এই শেষ কয়েক দশকের দান, একটা সময় ড্যাঞ্চি বাবুদের চেঞ্জে আসার নিশ্চিন্ত আস্তানা ছিল এই গিধনি। লাল মোটা ধানের ভাত আর স্থানীয় বুনো কপির তরকারি দিয়ে হাউহাউ করে গোগ্রাসে গিলতো- পাথুরে হজমি জল পেটে পড়তেই। সপ্তাহান্তের হাট থেকে আনা মাছ কিংবা বনমুরগি দিয়ে স্বল্প মশলার আমিষান্ন- সে এক পরম সুখের দিন ছিল।

সেই গিধনি আজ জমজমাট মফঃস্বল। বেশ বড় বাজার, টোটো গাড়ির ভিড়ের সন্ধ্যা যেন জনঅরণ্য। কিন্তু লোকালয় ছেড়ে দু’পা এগিয়ে গেলেই শ্যামল গ্রাম, উঁচুনিচু মাঠ, তেপান্তরের সীমা অবধি ছড়িয়ে থাকা পাথুরে জমির বুকে সারি সারি তাল আর খেজুরের সারি; আরো দূরে মহুয়া, শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি, শিরিষ, ইউক্যালিপটাসের সবুজের সমারোহ- আর নাম না জানা ছোট্ট নদীর তিরতিরিয়ে বয়ে যাওয়া- হাজার বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়েছে- হয়ত অবিকল। মস্ত দীঘি ভরা শালুক ফুলেল জলে স্নানরত ছেলেপুলের দল।

রওনা- ২৯শে জানুয়ারি, শুক্রবার, ২০২১। সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা হওয়া “12813 - স্টিল এক্সপ্রেসে” চড়ে বসবে অকপট পরিবার- যারা উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও কলিকাতা সংলগ্ন অঞ্চল থেকে আসবেন। রাত্রি ৭টা ৫৫ মিনিট নাগাদ ট্রেনটি আমাদের নামিয়ে দেবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে, সেখানে ‘অকপটের টিম বাস’ অকপটুদের রিসিভ করে ‘গিধনি’র নৈশ আবাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবে। সেদিন রাত্রে দুটো মরশুমি সব্জির তরকারির সাথে মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল দিয়ে দুটি ভাত খেয়ে গল্পগাছা করতে করতে ঘুমের দেশের পাড়ি দেওয়া হবে ক্লান্ত শরীরে।

সকল পুরুষদের জন্য এক বা একাধিক স্থানের বন্দোবস্ত থাকবে, যেখানে পর্যাপ্ত টয়লেট ফেসিলিটির সাথে, পরিচ্ছন্ন বালিশ, বিছানা, বিছানার চাদর, কম্বল, তোষক ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণ মজুত থাকবে শীত নিবারণের প্রয়োজনে। মহিলা ও শিশুদের রাত্রিনিবাসের স্থানটি এলাকার অন্যতম সুরক্ষিত স্থানে করা হয়েছে, যেখানে উপরোক্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র, বিছানা কম্বল ও পর্যাপ্ত বাথরুম থাকবে।

৩০শে জানুয়ারি, শনিবার, ২০২১। এটি আমাদের ভ্রমণ দিবস। সকালে প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদন করে প্রস্তুত হওয়া মাত্রই, জলখাবারের ব্যবস্থা থাকবে। যেখানে, পুরী-সব্জি, ইডলি-সাম্বর, ধোসা-বড়া-সাম্বর ইত্যাদি বিকল্প ধরনের প্রাতঃরাশের ঢালাও ব্যবস্থাপনা থাকবে।

এরপর আমাদের টিমবাস বেড়িয়ে পড়বে বাংলার জঙ্গলরানী জামবনী ব্লকের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিরতির করে বয়ে চলা ড়ুলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহারাজা গোপীনাথ সিংহের তৈরি- ঐতিহাসিক ‘চুয়াড় বিদ্রোহের’ সাক্ষী বহন করে চলা ‘চিল্কিগড় রাজবাড়ী’ প্রাঙ্গণ। বৃহৎ তোরণ দ্বার পেরিয়ে গবুজ ঘাসের গালিচা বেছানো পথে উন্মুক্ত প্রান্তরের বামদিকে সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছ আপনাকে সেই ১৭৬৯ সালের গল্প শোনাবে ফিসফিসিয়ে। অদূরে মন্দির, পরিত্যাক্ত কর্মীআবাস, আউটহাউসকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদের মূল অংশ। অপুর্ব সুন্দর মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণ থিতু হয়েই আমরা রওনা দেব অদূরের কনকদুর্গা মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

মালভূমির উপর দিয়ে বয়ে চলা নামটির মত জলতরঙ্গ খেলিয়ে বয়ে চলা নদী ডুলং। কিছুটা জঙ্গলে ঢাকা কংক্রিটের পথ পেরিয়ে যেতে হবে মন্দিরে, এই জঙ্গলটির নাম ভূষণ। সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৩৩ ধরনের বিরল উদ্ভিদের দেখা মেলে এই জঙ্গলে, যার অনেকগুলিই ভেষজ হিসাবে দুষ্প্রাপ্য। নিম, বাবলা, বাঁদরলাঠি, অর্জুন, শিরীষ, গুলঞ্চ, পিপুল, সঞ্জীবনী সহ কতধরনের অজানা বনানীর যে সমাহার রয়েছে তার গণনা করা ভীষণ কঠিন। হরেক ফুল, প্রজাপতি, বাঁদর আর পাখীর ডাকের আলোআঁধারি পরিবেশটাই যেন শতাব্দী প্রাচীন মন্দির চত্বরটিকে একটা আশ্রমের মেজাজ দিয়েছে। কিছুটা এবড়োখেবড়ো পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে মিষ্টি ডুলং নদীর পাড়ঘেষা কনকদুর্গা মন্দির চত্বরের জঙ্গলটিতে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল ভ্রমণ শেষে আমরা রওনা দেব গদরাশোল গ্রামের উদ্দেশ্যে, এটি আদিম উপজাতি লোধা ও শবরদের গ্রাম, দেখে নিতে পারব আমাদের আদিম ভারতের জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি।

ততক্ষণে বেলা অনেকটাই হয়ে গেছে, কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি। গদরাশোল হাটচালাতে আমাদের মধ্যাহ্নভজন পৌঁছে যাবে অন্য গাড়িতে, ‘ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন’। ভরপেট খেয়ে দেয়ে আমরা বাসে বিশ্রাম করতে করতে রওনা দেব ২৭ কিমি দক্ষিণে সুবর্নরেখা নদীর তীরবর্তী গোপীবল্লভপুর ইকোপার্কের উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত, এই ভ্রমণে পার্কের এন্ট্রি ফি, বা কেউ যদি কোনো রাইড (নৌকা বা প্যাডেল বোট) নিতে চায় সেক্ষেত্রে খরচা অতিরিক্ত ও ব্যাক্তিগত।

চোখজোড়ানো মনভোলানো উদ্যানটি ঘুরে ফিরে দেখে নিয়ে রওনা দেব ‘ঝিল্লি পাখিরালয়’ এর উদ্দেশ্যে। ঘন প্রাকৃতিক জঙ্গলের মাঝে এক অপূর্ব মনোরম সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঝিল্লি পাখিরালয়, যা মূলত পরিযায়ী পাখীদের নিশ্চিন্ত শীতকালীন আবাসস্থল। উড়ে বেড়ানো বান্টিকের ঝাঁকের সাথে দেখা মিলবে চাঁদি ঠোঁট, বালি হাঁস, নিরল পরিনা, নীলকণ্ঠী ফিদ্দা, চুনী কন্ঠী, শিলাফিদ্দা, ছোট সারস, ছোটন ভোমরা, ভরত পাখী কিম্বা হরেক ক্যামফ্লেজে আপনাকে টুকি দেওয়া মুনিয়ার ঝাঁক। এই পাখিরা এখানে খাদ্য আহরন করে, বাসা বাঁধে এবং ছানা ফুটিয়ে বড় করে; অতঃপর শীতকাল কাটিয়ে বসন্তে আবার উত্তরে উড়ান দেয়। পর্যটকদের জন্য ঝিলের একপাড়ে বেশ সাজানো গোছানো ছোট্ট পার্ক মতন করা রয়েছে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা পাড়ি দেব আমাদের রাত্রিযাপনের স্থান গিধনির উদ্দেশ্যে, কিন্তু তার আগে আমরা একবার ঢুঁ মেরে নেব ‘হাতিবাড়ি অরণ্যের’ মাঝে।

গ্রামছাড়া রাঙামাটির পথ পেরিয়ে প্রাকৃতিক শাল-পিয়ালের অরণ্যের মাঝখান দিয়ে, পটে আঁকা ছবির মত শান্ত স্নিগ্ধ বয়ে চলা সুবর্ণরেখা নদীর সাথে লুকোচুরি খেলার স্থানটির নামই হলো 'হাতিবাড়ি অরণ্য'। লাল বালির পাড় বেয়ে নেমে শান্ত স্থির সুবর্ণরেখার বুকে, অস্তগামী সুর্যকে সাক্ষী করে পানসীতে খানিকটা ভেসে বেড়াবার সুখের মত নৈসর্গিক সুখ কমই আছে বাংলার ভূমিতে। অবশেষে সুর্য যখন গাছপালার মাঝে অস্ত যাবে- আমাদের বাসও রওনা দেবে তখন।

সন্ধ্যায় ফিরে হাতমুখ ধুয়েই গরম কফির সাথে বেগুনী বা বিউলি ডালের বড়া দিয়ে নৈশভোজের ফিতে কাটা হবে। মহুলের জঙ্গল থেকে যখন হিম পড়ার আওয়াজ আসবে টিপিটুপটাপ করে, দূর হতে রেলগাড়ির হুইসেল ছাড়া কেবল মাত্র রাতচড়া পাখী আর ঝিঁঝিঁ পোকাদের কলতান শোনা যাবে তখনই আমাদের ‘ক্যাম্পফায়ার’ শুরু হবে। স্তূপীকৃত শুকনো কাঠের আগুনের ‘ওম’ নিতে নিতে, ‘ইয়েল’ এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আড্ডা, গান, খুনশুটির ছলে নিজেদের মাঝের বন্ধনকে মজবুত করে নেওয়ার পালা। সাথে থাকবে ঢালাও চিকেন পকোড়া আর উষ্ণ কফি। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে আগামীকালের জন্য প্রাণকে সতেজ রাখার তরে ক্যাম্পফায়ারের মত নির্মল চিত্তবিনোদনের কোনো বিকল্প নেই।

রাত্রি একটু গভীর হলে ডাইনিং হল থেকে ডাক আসবে পাচকের, জামবাটি ভরে উঠবে দিশি মুরগি কিম্বা হাঁসের মাংসের ঝোলে। আপনি যদি চালের আটার রুটি বিলাসী হন, তাহলে তো কথাই নেই, এদিন সেই ব্যবস্থাই থাকবে, আর নিতান্তই যদি ভেতো বাঙালী হন তাহলে গরম ভাত আর যাচ্ছে কোথায়, হাতে বেলা আটার রুটির সাথে সেও থাকবেই পাতে- যদি আপনি তা একান্তই বলে রাখেন আগে ভাগে। এর পর আর কী, ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া…

৩১শে জানুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এই দিনটি আমাদের বাৎসরিক চড়ুইভাতির দিন। যদি কোনো বন্ধু কেবলমাত্র এই দিনেই অংশগ্রহন করে চলে যেতে চান, তেমনটাও করতে পারেন।

এদিনও সকালটাও শুরু হবে গত দিনের মতই চা/কফি বিস্কুট দিয়ে। তার পরেই আমরা তৈরি হয়ে রওনা দেব গিধনি থেকে ৩২ কিমি দূরে বেলপাহাড়ি ব্লকের জঙ্গলঘেরা ‘আমলাশোল’ গ্রামে। হ্যাঁ, ২০০৪ সালের সেই আমলাশোল, যে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল। এখানেই রয়েছে ‘খাড়ারানী সরোবর’, এবড়োখেবড়ো মেঠো আলপথ বেয়ে, এর বাড়ির উঠোন- তার বাড়ির গোয়ালের ছাঁচতলা দিয়ে পৌঁছাতে হবে এই সরবরের তীরে। তারপর?

আর কী, পরিস্কার ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ, সবুজ জঙ্গলময় টিলায় ঘেরা নীল জলের বিশাল জলাধার, যা মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। স্বচ্ছ, টলটলে সরোবরে একটি বাঁধ রয়েছে, বাঁধের লকগেট খুলে জল সরবরাহ হয় আশেপাশের গ্রামগুলিতে। বাঁধের উপরের সরু কংক্রিটের রাস্তার ওপারে যতদূর চোখ যায় শুধুই জঙ্গলে ঢাকা। নীলাকাশের নীচে সবুজ অনুচ্চ পাহাড়ে ঘেরা টলটলে কালো জলের বিশাল জলাধারের দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়।

দৃশ্য সুখের অপ্রার্থিব সুখ পুরোটা ঠিকমতো আত্মস্ত করার আগেই হালুইকর হাজির করবে গরম ফুলকো রাধাবল্লভি আর চানা মশালা, সাথে থাকবে ডিমসিদ্ধ আর সন্দেশের টুকরো। দ্রিমিদ্রিমি মাদলের তালের মত বয়ে চলা বাতাসের খেলে বেড়ানো- খঞ্জনা, শামুকখোল, দেশী বক, শ্যামসুন্দর, পানকৌড়ি, বেনে বৌ, মাছরাঙা বা কিম্ভূত ভাবে উড়তে থাকা সায়োলোরের খেলা দেখতে দেখতে বুঝে উঠার আগেই বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাবে যদি না কেউ ডেকে দেয় আপনাকে। এখানে কিছু পাখী নাচে, কিছু পাখী গায়, কেউ শান্ত তো কেউ চঞ্চল, কেউ ওৎ পেতে থাকে আবার কেউ স্বশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দেবে চড়কি কেটে।

জলখাবার খেতে খেতে, সরোবর, প্রকৃতি আর পাখীদের যুগলবন্দী দেখতে দেখতেই রওনা দেব ২ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট একটা টিলা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে- ‘গাদ্রাসিনি হিল’। যারা ট্রেকিং এর শখ রাখেন, তাদের জন্য এ যেন সব পেয়েছির দেশ। সোজা হয়ে আকাশ ছুঁতে চাওয়া লম্বা লম্বা পিয়াল-মহুলের গুঁড়ির ফাঁকে পাথুরে পথের উপরে বিছিয়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোকে মচমচ শব্দে মাড়িয়ে যাওয়া সে এক অকৃত্রিম সুখানুভুতি রয়েছে। যদি পাহাড়ের উপরে পৌঁছে যান, তাহলে তো গোটা বেলপাহাড়ি অঞ্চলটাকে দেখে নিতে পারবেন ‘ঈগলের চোখের’ মতন, নিচে নিবিড় অরণ্য, তার অপরে আপনি আর মাথার উপরে শুধুই নীল আকাশ, কেউ কোত্থাও নেই। অদূরেই রয়েছে একটি প্রাকৃতিক আদিম গুহা, চাইলে যে কেউ সেটা চাক্ষুষ করতেই পারেন, সময়ে কুলালে।

পাহাড় থেকে নেমে এসেই আমাদের গন্তব্য অদূরেই ঝাড়খন্ড লাগোয়া ‘ঢাঙিকুসুম’ গ্রাম। গ্রামটির মানুষজনের মূল জীবিকাই হল পাথরের বাসনপত্র তৈরি করা। শহুরে বা সমতলের মানুষের কাছে বেশ খানিকটা কঠিন তথা ‘মিনি’ দুর্গম চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় ‘হদহদি’ ঝর্নার সামনে। ঘন কালোছায়া বিশিষ্ট এই অরণ্যের মাঝেই ‘ছুঁচোর ডনবৈঠক’ শুরু হয়ে যাবে সকলের পেটে, অনভ্যস্ত পায়ে এতোটা হাঁটাহাঁটি করলে পেট বেচারার আর দোষ কিসের! এর মাঝে যদি পেট সাথ দেয় তাহলে ডুংরি ঝর্নাটাও একবার চোখের দেখা দেখে নেওয়া যেতেই পারে।

আবার খাড়ারানী সরোবরের তীরে যতক্ষণে ফিরে আসব, ততক্ষণে খাসির মাংসের সুগন্ধ জিভের স্বাদকোরক গুলোকে জাগ্রত করে ‘নিশির ডাকের’ মত পাতের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। সাদা ভাত, লেবু লবণ, ঝুড়ি আলুভাজা, নবরত্ন সব্জি, সোনা মুগের ডাল, আলুপোস্ত, খাসির মাংস কষা, চাটনি, পাঁপড় আর গুড়ের রসগোল্লা সহযোগে চেটেপুটে খাবারই তো দিন এটা।

গল্পগুজব করতে করতে এবার সরোবরকে টাটা বলার পালা, ফেরার পরে একবার ঢুঁ মেরে নেওয়া ‘ঘাগরা’ জলপ্রপাত। নামে জলপ্রপাত হলেও আসলে এটা একটা জলাবর্ত, হাজার হাজার বছর ধরে ছোটনাগপুরের কঠিন আগ্নেয় শিলাপাথরের উপর দিয়ে ‘তারাফেনি’ উপনদী তার পথ তৈরি করে নিয়েছে গভীরভাবে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুপাড়ে ঘিরে থাকা জঙ্গল, ঝরে পড়া পাতা, কাঠবেড়ালীর ছুটোছুটি, পাখিদের ডাকের মাঝে লুকিয়ে থাকা রহস্যময়ী ঘাগরা, যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে নদীর শিল্পকলা মাখা সৌন্দর্যের প্রতিমুর্তি।

নিস্তব্ধ চুপচাপ সুন্দর গ্রামে রাঙা মাটির পথ, সরষের ক্ষেত, আলপনা আঁকা লালমাটির ঘর, পরিশ্রমী জীবনযাযাত্রী বনবাসী, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনা কাঠুরের দল, বিনোদনের জন্য মোড়গ লড়াই, নেশার জন্য হাঁড়িয়া,মহুয়া বা তাড়ীর রস, উঠোনে ধানের ছোট্ট গোলা সমৃদ্ধ অসম্ভব সুন্দর গ্রাম্যপরিবেশের এই জঙ্গলেই টেনিদা খ্যাত “চার মূর্তি” সিনেমার শুটিং হয়েছিল। গাদ্রাসিনি, খাড়ারাণী সরোবর, ঢাঙিকুসুম, ঘাঘরাকে কেন্দ্র করেই শেঠ ঢুন্ডুরাম সহ স্বামী ঘুটঘুটানন্দের দাড়ি উপড়ে ছিল টেনিদা সমেত প্যালা, হাবুল আর ক্যাবলার চারমুর্তি।

সুতরাং, খাঁড়ার মত নাক থাকুক বা নাইবা থাকুক, গড়ের মাঠে গোরা পেটানো শরীরও না থাকলে চলবে- কিন্তু গলা ছেড়ে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” গাইতে হলে যে আসতে হবে অকপটের এই যাত্রায়, তবে না প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে পারবেন “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

সন্ধ্যায় গিধনি ফিরে, চা জলখাবারের সাথে শুধুই মজলিশি আড্ডা। রাত্রে নৈশভোজে গরম ভাতের সাথে মটরসুটি দিয়ে মুগের ডাল, আলু ফুলকপি রসা, পাবদা মাছের ঝাল আর চাটনি দিয়ে উদরপুর্তি করার বন্দোবস্ত থাকবে। যারা মাছে আসক্ত নন, তাদের জন্য রইবে ‘কবিরাজি চিকেন কষা’। জ্যোৎস্নার আলোয় মোহময়তাকে পূর্নতা দেয় বুনো ফুলের সুগন্ধ, ততক্ষণ আড্ডা চলতেই থাকবে- যতক্ষননা, জ্যোৎস্নালোকে ধুয়ে যাওয়া আলোকিত জঙ্গলময় উপত্যকা বেয়ে ঘুমপরীরা ভর করবে চোখের পাতায় পাতায়।

১লা ফেব্রুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এদিনটা একটু সকাল সকালই শুরু হবে। গত দুদিনের মতই চা বিস্কুট রুমে খেলেও, প্রাতঃরাশ সারা হবে বাসের মধ্যে- রুটি, কলা, ডিম সিদ্ধ আর সন্দেশ সহযোগে। ভাগ্যক্রমে যদি পথে লুচি আলুর দম পাওয়া যায় সেটাতেও কোনও মানা নেই।

সকালের নরম রোদে দেখে নেওয়া হবে ঝাড়গ্রামের ঐতিহ্যশালী রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ। বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত ভাস্কর্য ও শিল্পকলায় নির্মিত ৩০ একর জুড়ে সুবিন্যস্ত সুবিশাল এই রাজপ্রাসাদ পশ্চিমবাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার মান সিংহের আমলে, ‘রাজপুত চৌহান’ রাজা সর্বেশ্বর সিংহের ব্যবস্থাপনায় এই স্থাপত্য ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় মাল আদিবাসী রাজাদের পরাজিত করেছিলেন বলে এই প্রাসাদের শাসকরা “মল্লদেব” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। চুয়ার বিদ্রোহের পর ১৭৯৯ সালে প্রাসাদটি ব্রিটিশ কর্তৃত্বধর জমিদারী এস্টেটে পরিণত হয়েছিল। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে স্থানীয় মিউজিয়াম ও ডিয়ার পার্কে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বেলা ১১ টার মধ্যে মাছেভাতে/মাংসভাতে মধ্যাহ্নভোজন সাঙ্গ করা হবে ঝাড়গ্রামেরই কোনো বাঙালী ভোজনালয়ে।

এর পর আমাদের অরণ্যসুন্দরীকে বিদায় জানাবার পালা। শালের জঙ্গলের ভিতর লাল মাটির রাস্তা বেয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলবে খড়্গপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে। পড়ে থাকবে সবুজে ঘেরা বনাঞ্চল, শান্তপুস্করিনি, কুলুকুলু ঝর্ণা, পিচঢালা সরু রাস্তার দুপাশের জঙ্গলের মাঝে রয়ে যাওয়া শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ। ছোট্ট নদীগুলো তেমনই বইতে থাকবে যেমন ভাবে বয়ে চলেছে লক্ষ বছরের অভ্যাসে। স্কুল ফেরত দলবাঁধা বাচ্চার ফিরে যাবে তাদের নির্মল গ্রাম্য জীবনে। জানালার বাইরে ক্রমশই ফিকে হয়ে আসবে সবুজের সমারোহ, ফিরে আসবে নগরজীবনের দৈনন্দিনতার দোকানপাট ও বাস স্ট্যান্ড। রয়ে যাবে ঝাড়গ্রাম, জঙ্গলমহল, অরণ্যসুন্দরী- আমাদেরই মত অন্য কারোর প্রতীক্ষায়।
এই খড়গপুরেই আমাদের অকপট চড়ুইভাতি ২০২১ এর যাত্রার পরিসমাপ্তি দুপুর ২টোর মধ্যে, এখান থেকে যে যার নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেবে, বাসে ট্রেনে বা নিজ বাহনে।

গোটা এই ভ্রমণের জন্য আমাদের প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক অকপটুর জন্য খরচা রাখা হয়েছে মাথা পিছু ২০০০/- টাকা (দুই হাজার মাত্র)। ২৯শে জানুয়ারি ২০২১ সন্ধ্যায় ঝাড়গ্রাম হতে রিসিভ করা থেকে- ১লা ফেব্রুয়ারী ২০২১ খড়্গপুরে ড্রপ করে দেওয়া অবধি (থাকা, খাওয়া ও পিকনিক) সমস্ত খরচা সহ ( পার্কের এন্ট্রি ফি অ রাইড খরচা বাদে)। ৫ বছরের নীচের সকল বাচ্চাদের খরচা বিনামূল্যে, ১০ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের খরচা মাথাপিছু ১০০০/- টাকা।

যারা শুধুমাত্র চড়ুইভাতিতে অর্থাৎ ৩১/০১/২০২১ তারিখ রবিবার উপস্থিত থাকতে চান, তারা সরাসরি বেলপাহাড়ি বাজার অবধি চলে আসতে পারেন, সেখানে আমাদের গাড়ি আপনাকে খাড়ারাণী সরোবর অবধি নিয়ে আসবে। এই দিনের জন্য খরচা ধরা হয়েছে মাথাপিছু ৫০০ টাকা মাত্র। ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের জন্য ৩০০ টাকা, ৫ বছর বয়সের নীচে সম্পূর্ন বিনামূল্যে। সেই রাত্রিতে থেকে গেলে তার জন্য অতিরিক্ত ২০০/- টাকা মাথাপিছু বেশি গুনতে হবে।

যারা এই অকপট ভ্রমণ তথা চড়ুইভাতিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, তারা ২০ই জানুয়ারির মধ্যে অফেরৎযোগ্য ৫০০/- টাকা করে জমা করুন। কেন অফেরৎযোগ্য? কারন- হালুইকর, বাসভাড়া, একমডেশন সকল কিছুই আগে থেকে কনফার্ম করতে হবে পরিচালকদের, শেষ মুহুর্তে বাতিল করলে খাবার খরচা টুকুর বাইরে সকলকিছুরই পেমেন্ট করতেই হবে পরিচালকদের। যেহেতু অকপট চড়ুইভাতি কোনও ব্যবসায়িক স্বার্থে করা নয়, বরং সবচেয়ে কম খরচে উৎকৃষ্ট গুণমান দিতে অকপট দায়বদ্ধ কারন অকপটুদের নিজেদের পরিবার গুলোই থাকবে এখানে; সেহেতু কে অন্যের শেষ মুহুর্তের বাতিলের দায়ভার বহন করবে! তাই এই অফেরৎযোগ্য অগ্রিমের ব্যবস্থা।

২৬শে জানুয়ারি ২০২১ এর মধ্যে সম্পূর্ণ চাঁদা জমা করতে হবে আমাদের নির্দিষ্ট একাউন্টে, অন্যথায় সকল ব্যবস্থাপনা করা সম্ভবপর হবেনা। যারা শুধু চড়ুইভাতি বা বনভোজনের নির্দিষ্ট দিনেই আসবেন, তাকেও ২৬ তারিখের মধ্যেই ৫০০/- টাকা জমা করতে হবে। যারা হাওড়া থেকে ‘স্টিল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে যাবেন টিম অকপটের সাথে দল বেঁধে, তাদের টিকিট আমরা স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে কাটিয়ে দেব, আপনি স্টেশনে পৌঁছে সেই স্বেচ্ছাসেবকের কাছে রিজার্ভেশন বাবদ প্রদেয় অর্থ নগদে মিটিয়ে দেবেন।

টাকা পাঠাবার ঠিকানাঃ
KINGSHUK HALDER
S B I, BEHALA BRANCH
A/C NO. 11170337153
IFSC SBIN0001522
MICR 700002115
UPI: hkingshuk-1@oksbi

তাহলে, আর কী! গেলে দেখা হবে হাওড়া ঝাড়গ্রামে। একসাথে গাওয়া যাবে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” কিম্বা প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠব “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

স্বাগতম।




বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২১

তোলামুলের ঘরভাঙার খেলা



অন্যের ঘর ভাঙলে খুব মজা আর নিজের ঘর ভাঙলে খুব জ্বালা।

৯ বছর ধরে কংগ্রেস-CPM এর ঘর ভাঙিয়ে নিজের ঘর সাজিয়েছিল, সেই জারজগুলো উন্নয়নের জোয়ারের ক্রিম ছিল- বেইমান বা বিশ্বাসঘাতক নয়। আজ যখন গোটা দলটাই মিছিল করে রোজই ঘর ভেঙে কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে- তখন তারা বেইমান বিশ্বাসঘাতক হয়ে যাচ্ছে আশ্চর্য ভাবে। সেই মুকুল একুল ওকুল দুকুল নিয়ে গেছে সেই একই ছকে, মান্নীয়ার আকুল অনুপ্রেরণায়। সঙ্ঘী ধানীপোনা কালীঘাটের পালন পুকুরে বড় হয়ে এখন ডিম পারতে নাগপুরের মোহনাতে জমেছে।
ভেঁপু কুমার ফরেন বৌ নিয়ে ফেরার হওয়ার ঠিক আগের দশায় জুতোর ফিতে বাঁধছে- দেওয়াল লিখন পড়ে ফেলেছে- অগ্নিকণ্যার আগুনে তেজে বাংলাতে ধোঁয়া আর ছাই ছাড়া অবশিষ্ট কিছু নেই।
আসলে উন্নয়নের জোয়ারে ড্রেনের গু গুলোকে ক্রিমের প্যাকেটে ভরে সততার সাথে পাব্লিককে মাখিয়েছিল চপশ্রী। স্বীকৃত চোর গুলোর সাথে প্রতিটি নিস্প্রভ বিন্দুকে চারিপাশে সাজিয়ে একমাত্র স্পটলাইট নিজের উপরে রেখেছিল সারদাবালা। এখন সেই শালী(বৈ)রাই নুলো দেখাচ্ছে - রা কাটা জীবের সাথে। হেঁদু হলে পথ আছে, সাভারকর বোঝার এই জো ধরা লগনে "সিপিএম আমলই ভালো ছিল" বলে রাগমোচনের একটা সুযোগ পাচ্ছে।
কিন্তু, তৃণমোল্লা গুলোর আত্মলিঙ্গম পশ্চাদপূরম দশা- জাতে RSS কিন্তু ভরঙে সোনাগাছির সতীদের মত ঘোমটার পবিত্রতা। উটপাখির মত চটিতে মুখ গুঁজে- পরনের লুঙ্গি দিয়ে সেই ঘোমটা বানিয়েছে। ওদিকে নিকারাগুয়ায় তখন হাম্বানটোটা দোলা খাচ্ছে ৭% ৭% তসবি গুনে।
মার্চ শেষ হতে হতে উন্নয়ন সাইনবোর্ড, তৃণমোল্লা দুধেল গাইগুলো কসাইখানায় চলে গেলে তাদের 'মাদার' সাবান বিজেপি নিশ্চই গোহত্যার বিষয়ে বাঁধা দেবেনা। তাছাড়া ডিটেনশন ক্যাম্প গুলোতেও তো কিছু ভিড় চাই, তৃণমোল্লা সেকু নেড়ে গুলোর চেয়ে ভাল প্রার্থী আর কারা?

তৃণমূলের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেবেন না

⛔ সতর্কতামূলক পোষ্ট ⛔ আজ SIR এর ভোটারলিষ্ট বার হবার পর- জনরোষের দোহায় দিয়ে দিকে দিকে ‘সংগঠিত অশান্তি’ লাগাবার ‘ফুল প্ল্যান’ নিয়ে এগোচ্ছে শাা...