শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১

শহীদের শোক কদিনে ভোলে জনগন?



আজ বড় শোকের দিন, গাইঘাটা সহ গোটা রাজ্য হারালো একজন বামযোদ্ধাকে, যিনি নিজ জীবন বাজি রেখে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ স্বরূপ অসুস্থ রোগীদের সেবা দিতে দিতে, না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। কমরেড- শ্রীবাস হালদার অমর রহে।

ঝকঝকে তরুণ, শিক্ষাকর্মী ও পার্টিজান এই কমরেডের প্রাণশক্তি ছিল তারিফ যোগ্য। পার্টির মিটিং মিছিলে লাল পতাকা কাঁধে সর্বদা হাসি মুখে নিরলস শ্রম দান করে গেছেন অবিরাম, আজ পতাকাটা পড়ে রইল- করোনা এই ভরসার যোগ্য বিনয়ী কাঁধটাকেই কেড়ে নিল চিরতরের জন্য।
শহীদ কমরেড হালদারের পরিবারের কাছে এই ক্ষতি অপরিসীম, যা কোনো কিছুর দ্বারাই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। আমরা একবার আধবার, কিম্বা ১-২ দিন তাঁকে স্মরণ করব, ‘অমর রহে’ স্লোগান তুলব- তারপর?
চতুর্দিকে টুকটাক খবর পাওয়া যাচ্ছিল- রেড ভলেন্টিয়াররা আক্রান্ত, তাদের কেউ কেউ অসুস্থ, কেউ করোনা পজিটিভ, কেউ বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু ভীষণ উদ্বেগে ছিলাম- তাদের চিকিৎসার খরচ কে বা কারা যোগাচ্ছে! তবুও সুখের কথা হচ্ছে, তারা সকলেই হাসিমুখে ঘরে ফিরে এসেছিলেন সুস্থ হয়ে। কিন্তু শ্রীবাস হালদারের সম্বন্ধে কোনো তথ্যই সোশ্যাল মিডিয়াতে উপলব্ধ নয়, তাঁর লড়াই এর খবর সম্বন্ধে আমরা কেউ কিচ্ছু জানতে পারিনি, শুধুমাত্র মৃত্যুর পরই খবরটা সামনে এসেছে। আমরা সকলে আজ দীর্ঘ ৩ সপ্তাহ ধরে এমন একটা ভয়াবহ আশঙ্কাই করছিলাম, তাদের ন্যুনতম কোভিড বিধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তো? তারা PPE কিট সহ যথেষ্ট সুরক্ষা পাচ্ছে তো? আমাদের কমরেডদেরই কেউ যদি আক্রান্ত হয় তার যথাযথ চিকিৎসা হবে তো? তার উপরে বিমা করানো হয়েছে তো?
সামান্য কিছু ক্ষেত্রে খুবই অল্প পজিটিভ রেসপন্স পাওয়া গেছিল প্রশিক্ষণে, সুরক্ষা পোশাকের ব্যবহার বাড়লেও তা পর্যাপ্ত ছিল না, বিমা হয়েছে এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
এই মৃত্যু সংবাদ এবিপি দেখাবে না, ২৪ ঘন্টা জানাবে না, ‘এই সময়’ ছাপবে না, ব্রিটেনের সেই সংবাদ পত্রটিও জানবে না প্রথম শহীদ ‘রেড ভলেন্টিয়ার’ শ্রীবাস হালদারের কথা। ফেসবুকেও এক দু’দিন হা হুতাস করে ভেসে থাকার পর ফেসবুকের লক্ষ পোস্টের ভিড়ে কালের অতলে হারিয়ে যাবে- শহীদ কমরেড শ্রীবাস হালদারের নামটি। ভুলবে না শ্রীবাস বাবুর মা, যিনি জন্ম দিয়েছিলেন সন্তানকে, আজ ‘অসুরক্ষিত’ জনসেবা করতে গিয়ে তিনি সন্তানহারা হলেন।
আমরা জানিই না তাঁর স্ত্রী-সন্তান আছে কিনা বা অন্যান্য কোনো পরিজন সংক্রান্ত ন্যুনতম তথ্যটুকু নেই। তাঁর অন্তিম সংস্কারের সময় লাশের উপরে একটা লাল পতাকাটুকুও জুটেছে কিনা সে নিয়ে কেউ কোনো হ্যাশট্যাগ নামায়নি। তিনি আদৌ পার্টির কোনো গণসংগঠনের কর্মী বা সমর্থক ছিলেন- সেটুকুও জানা যাচ্ছে না।
রাজ্য সিপিএমের মুখ্য ফেসবুক পেজে রেড ভলেন্টিয়ার্স নিয়ে নানান পোস্টের ভিড়ে- শহীদ কমরেড শ্রীবাস হালদার এখনও জায়গা পাননি। আগামীকালের গণশক্তিতে জায়গা পাবে নাকি তাও জানা নেই।
কমরেড শ্রীবাস বাবুর পরিবার আজ দিশেহারা, স্বজনেরা অভিভাবক হারাল। তাঁর সুরক্ষা পোশাক পরিহিত ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ এর ছবি এখনও সোশ্যাল মিডিয়া দেখেনি। তিনি পার্টিজান ছিলেন, ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মানুষের বিপদে। আজ যদি তাঁকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, শুরু থেকেই তাঁকে উপযুক্ত পোশাক দিয়ে রাস্তায় নামানো হতো- হয়ত বা আজ এই দিন দেখতে হতো না- নিয়তির নামে দোষ চাপিয়ে।
আজ যদি তাঁর জন্য বিমা করানো থাকত, তাঁর পরিবার কিছুটা আর্থিক সুরক্ষা পেত। আজ যদি পার্টির তরফে কোনো ভলেন্টিয়ারি আইডেন্টিটি কার্ড দেওয়া থাকত, সেটা তাঁর পরিবারের কাছে শহীদের গর্ব ‘স্মৃতি চিহ্ন’ হিসাবে থাকত, অফিসিয়ালি দলীয় স্বীকৃতি থাকত।
শহীদ কমরেড শ্রীবাস হালদারের প্রাথমিক চিকিৎসা, যথাযথ চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল কি? তা হলে সেটা সরকারি ছিল না বেসরকারি ছিল তা জানি না। তাঁর চিকিৎসার আর্থিক দায়ভার কে বহন করেছিল? আজকে সোশ্যাল মিডিয়াতে বলা হচ্ছে- নিয়তির কাছে আমরা অসহায়। সত্যিই কি আমরা নিয়তির কাছে অসহায়? নাকি পরিকল্পনাহীন ভাবে পার্টির ছাত্রযুবদের মাঝে একটা অসুরক্ষিত গণ হিস্টিরিয়ার কাছে আমরা শহীদ কমরেডকে হারালাম? এর দায় কে নেবে?
আজ অবধি জানা যায়নি, রেড ভলেন্টিয়ার্স কর্মকাণ্ডের জন্য CPIM দলের কেন্দ্র বা রাজ্য পার্টির অফিসিয়ালি কোনো লিখিত অনুমোদন আছে কিনা। যদি পার্টির তরফে এটা অফিসিয়াল প্রোগ্রামই হয়, তাহলে অন্যান্য গণসংগঠনগুলোর মতো এর রেজিস্ট্রেশন আছে কিনা জানা নেই। রেড ভলেন্টিয়ারের তরফে এর রাজ্য সম্পাদক, সভাপতি ও ক্যাশিয়ার কারা জানি না। এর রাজ্যকমিটির সদস্যমণ্ডলী, জেলা কমিটির সম্পাদক ও সম্পাদকমণ্ডলীতে কারা আছেন জানা নেই। দলের তরফে এই ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ সংগঠনের দায়িত্বে কে বা কারা আছে তাও জানা নেই। সর্বোপরি, ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ হওয়ার প্রাথমিক সদস্যপদ কীভাবে পেতে হয় তাও জানা নেই।
একটা সেন্ট্রালি ওয়েবসাইটের উল্লেখ হয়েছে ‘রেড ভলেন্টিয়ার্স’ নামের ফেসবুক গ্রুপে, যাদের এন্ড্রয়েড এপসও রয়েছে। যেখানে একটা ডিসক্লেমার দেওয়া আছেঃ- “কোভিড মোকাবিলায়, দলমত নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সহায়তা করার জন্য একদল তরুণ-তরুণী অনবরত ছুটে বেড়াচ্ছে, অক্সিজেনের খোঁজে, হসপিটাল বেডের খোঁজে, ওষুধের খোঁজে...। এঁরা মূলত সিপিআই(এম), এসএফআই, ডিওয়াইএফআই ও অন্যান্য বামপন্থী দলের কর্মী, সদস্য ও সমর্থক। তবে এই মুহূর্তে তাঁদের পরিচয়- 'রেড ভলান্টিয়ার্স'!” এর সাথে মূলত বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু ব্যক্তির ফোন নং দেওয়া আছে। গোটা ওয়েবসাইটটিতে একটা কমিউনিস্ট লোগো পর্যন্ত নেই। পুরো বিষয়টাই একটা হাঁসজারু মার্কা ধোঁয়াশা।
শহীদ কমরেড হালদারের পরিবারের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, পরিবারের একজনের সরকারি চাকরি ও একটা উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণের জন্য নাগরিক সমাজের সর্বস্তর থেকে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হোক। পার্টি নেতৃত্ব আগামীকাল অসহায় পরিবারটির বাড়িতে গিয়ে তাদের এই চরম দুর্দিনের দিনে পাশে দাঁড়াক। শহিদ মইদুল আলম মিদ্যার পরিবারের পাশে যেমন দাঁড়ানো হয়েছিল, ঠিক সেইভাবে সমস্ত গণসংগঠনগুলি- শহীদ কমরেড হালদারের পরিবারের পাশে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিক।
আপনারা যারা রাস্তায় আছেন, ও রাস্তায় থাকা ছাত্র যুবদের অভিভাবক যারা ঘরে আছেন- আপনারা সুরক্ষা বিষয়ে সচেতন হোন ও সন্তানদের সচেতন করুন। কেউ একজন শহিদ কমরেড হালদারের মতো হারিয়ে গেলে, সকলে সাময়িক হা হুতাশ করলেও- চিরস্থায়ী ক্ষতিটা আপনার পরিবারেরই হবে। শহীদ কমরেড সেই শিক্ষাই দিয়ে গেলেন আমাদের।
কমরেড- শ্রীবাস হালদার লাল সেলাম।

বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

ফিলিস্তিন ২০২১- দ্বিতীয় পর্ব




এবারের ইজরায়েলি আক্রমণের শুরুতেই হামাস জানিয়ে দিয়েছিল- ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে পাথর মারার দিন শেষ, এবার বারুদের জবাব- বারুদ দিয়েই দেওয়া হবে।
গত পর্বেই বলেছি ইজরায়েলি সেনাবাহিনী পৃথিবীর অন্যতম দুর্বলতম সেনাদল। তবে এদের সেনাবাহিনীর কাছে যেসকল আধুনিক সমরাস্ত্রগুলো রয়েছে তা যথেষ্ট উন্নত ধরনের। ইজরায়েলি সেনার ‘এরিয়েল কমান্ডে’ থাকা রকেট, হেলিকপ্টার, ড্রোন, মিসাইল কিম্বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইত্যাদি সমস্ত প্রযুক্তিগত যুদ্ধাস্ত্র পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী বললেও অত্যুক্তি হবে না। স্বভাবতই, তারা আল আকসা মসজিদে ইচ্ছাকৃত অশান্তি তৈরি করে সেখানে নির্বিচারে গুলিগোলা চালিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করে- এর পরেই একতরফা যুদ্ধ শুরু করে দেয় নেতানিয়াহু। ইজরায়েল শুরুতেই তার শ্রেষ্ঠ শক্তি আকাশ পথে ‘এরিয়াল আক্রমণ’ শুরু করে দিয়েছিল নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপরে। শেষ রমজান মাসে রোজাদার ও অপ্রস্তুত ফিলিস্তিনিরা শুরুতেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে যায়। একতরফা সাফল্য জমা হয় ইজরায়েলের খাতায়। কিন্তু রমজান শেষ হতেই ওই একতরফা খেলার মোড় ঘুরতে শুরু করে।
ইজরায়েল তাদের মিশাইল প্রতিরোধী ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম টেকনোলজি’ নিয়ে মারাত্মক পর্যায়ের আত্মবিশ্বাসী ও অহংকারী ছিল। ২০২১ এর মে মাসের আগে পর্যন্ত এই প্রযুক্তিতে দারুণভাবে সফলও ছিল, ফলত দুনিয়ার নানান দেশ থেকে এই প্রযুক্তি বিক্রির জন্য অর্ডার নেওয়াও শুরু করে পাইকারি হারে। শত্রুপক্ষের থেকে কোনো রকেট বা মিশাইল হামলা হলে, তা মাটিতে ছোঁয়ার আগে আকাশেই পাল্টা অন্য একটা রকেট দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিনষ্ট করে দেওয়া হতো- আইরন ডোম সিস্টেম ব্যবহার করে। সুতরাং নিজেদের ঘর সুরক্ষিত রেখে দখলদার ইজরায়েল ‘মালিকের’ ঘরের উপরে বোমা বর্ষণ করছিল নিশ্চিন্তে।
কিন্তু ঈদ মিটতেই PIS, AAMB, PRC, DFLP, PFLP-GC, Harkat এমন কয়েক ডজন ছোট ছোট মিলিট্যান্ট গ্রুপ নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার্থে জীবনপণ লড়াইতে সামিল হয়ে যায়, যাদের সকলের উপরে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল ‘হামাস’। হামাস একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘উদ্দীপনা’। ১৯৮৭ সালে জন্ম নেওয়া ‘হামাস’ নামের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক দলটি ২০০৭ সাল থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দ্বারা অন্য দল ফাতাহ’কে পরাজিত করে এরাই বর্তমানে ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শাসনভার সামলাচ্ছে। হামাসের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার নাম ইসমাইল হানিয়া। হামাস পরিচালিত মিলিটারি গ্রুপের নাম ‘আল-কাসসাম’ ব্রিগেড, ইজরায়েলের লাগামহীন ফিলিস্তিনি ভূমি দখল কার্যত এই ব্রিগেডের প্রতিরোধের কারণেই শেষ দেড় দশকে থমকে গেছে। স্বভাবতই, ইজরায়েল সহ তাদের মিত্রগোষ্ঠী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা- হামাসকে ‘মোস্ট ওয়ান্ডেট’ জঙ্গি সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করেছে। যদিও বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ইরান, রাশিয়া, তুরস্ক বা চীন হামাসকে বন্ধু হিসাবেই দেখে।
ঈদ পরবর্তী দিনে আশ্চর্যজনকভাবে পড়শি জর্ডন, লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে বিপুল পরিমাণে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুরা ভিড় জমায়। সীমান্ত পেরিয়ে নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার উদ্বাস্তু শিবিরের আশ্রয় ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে যাবার জন্য তারা অনড় ভাবে সীমান্তের স্বদেশীয় মিলিটারির সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পরে। কিছুজন মরুভূমির বালির নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজও শুরু করে দেয়- যা ইজরাইলের জন্য বিপুল পরিমাণে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে একটা কথা পাঠকের মাথায় রাখা দরকার যে, ইজরায়েলের পদাতিক বাহিনীকে- নেপাল রাষ্ট্রের সেনা দল ‘রাজকীয় নেপালি সেনা’র থেকেও যদি অযোগ্য বলা হয়, কম বলা হবে; কারণ ইজরায়েল এমন একটা দেশ যারা সারাজীবনে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা ছাড়া অন্য কোথাও কোনো যুদ্ধ করেনি, যতই তারা মিডিয়াতে নিজেদের সেনাকে বিশাল রঙ চড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করুক। আমেরিকা কিম্বা ন্যাটো যদি তাদের সেনা সাহায্য না করে, পদাতিক বাহিনীর যুদ্ধে ইজরায়েল একটা বেলা টিকে থাকারও অযোগ্য। ফিলিস্তিনিরা লড়াই করছে নিজেদের অস্তিত্বে রক্ষার জন্য, অপরদিকে ইজরায়েলি সেনারা রাষ্ট্রের ভাড়াটে দাস। ফিলিস্তিনিরা লড়াই করছে নিজেদের বালবাচ্চার জন্য, আগামী ভবিষ্যৎকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত করার জন্য। তাদের সামনে যুদ্ধ ছাড়া পথ নেই, যুদ্ধ করে জিততে পারলে ‘জীবন’ কিছুটা সময় পাবে, নতুবা ইজরায়েলি বোমার আঘাতে মরবে অথবা আজীবন দাসত্ব করতে হবে।
দীর্ঘদিন একতরফা মার খেতে খেতে অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বিপ্লবী গেরিলা যুদ্ধে ভীষণভাবে দক্ষ হয়ে উঠেছে, আমরা যদি সাত বছর আগে ২০১৪ সালে ফিরে যায়, দেখব ঠিক একই রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছিল ইজরায়েল। সেবারও তারা পদাতিক সৈন্য নামাতে বাধ্য হয়েছিল, সেই যুদ্ধ ৫০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ফলাফল কী ঘটেছিল তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে, রীতিমতো লেজেগোবরে হয়ে খোলসের মধ্যে ঢুকে যেতে বাধ্য হয়েছিল ইজরায়েল।
গতবারে হামাস সহ বাকি মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীগুলো একজোট ছিল না, না ছিল তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র। এবারে ফিলিস্তিনের স্বার্থে তারা একজোট হয়ে ইজরায়েলের বিভিন্ন সেনা ছাউনি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে রকেট বর্ষণ করতে শুরু করে। হামাসের হাতে সামান্য কিছু আধুনিক রকেট বা মিশাইল থাকলেও, তাদের অবশিষ্ট অস্ত্রশস্ত্র সহ অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর সব রকেটই ‘বাবা আদম’ জামানার গাদা প্রযুক্তির। রকেটগুলো একবার লঞ্চার থেকে বেড়িয়ে গেলে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকত না। কোথায় গিয়ে পড়বে কেউ জানত না। এমন আনাড়ি অস্ত্র ও অস্ত্র চালনাতে প্রায় অশিক্ষিত একটা সেনাদল জীবনপণ মরিয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো বিচিত্র একটা রণকৌশল নিয়ে।
ইজরায়েলের সরকারি সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’ এ প্রকাশিত ১৫ই’মে এর একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী- গাজা থেকে নিকটবর্তী ইজরায়েলি শহরগুলোর নানান সামরিক ও রাষ্ট্রীয় স্থাপত্যগুলোকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে আসতে থাকে, যা তাদের কাছে কল্পনারও অতীত ছিল। ১৬ই মে তারিখ ভোরে, ১ মিনিটের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩৭টি মুহুর্মুহ হামলার রেকর্ড নথিবদ্ধ করে ইজরেয়ালি সেনা।
ইজরায়েলের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ টেকনোলজির ওপর নির্ভরশীল ছিল ২০০১ সাল থেকে ২০২১ ঈদের আগে পর্যন্ত, ফিলিস্তিনিরা যা টুকটাক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছিল ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে, তার সবকটাকে সাফল্যের সাথে আঁটকে দিয়েছিল ‘আইরন ডোম’। পরীক্ষাগারেও এই ‘আইরন ডোম’ সিস্টেম ছিল ৯৯% সফল। কিন্তু মিনিটে এত বিপুল পরিমাণে ‘আনগাইডেড রকেট’ হামলার জন্য ইজরায়েলিরা প্রস্তুত ছিল না। তাদের তথাকথিত বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ ঘুণাক্ষরেও অনুমান করতে পারেনি ঠিক কী পরিমাণে ক্ষেপনাস্ত্র তথা যুদ্ধাস্ত্র হামাস সহ অন্যান্য মিলিট্যান্ট গোষ্ঠীর কাছে মজুত রয়েছে। স্বভাবতই ২৫শে মে তারিখে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে চেয়ারে থাকা মোসাদের প্রধানকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে পদচ্যুত করানো হয়েছে।
মোসাদের আরও বড় ব্যর্থতা হচ্ছে- প্রায় অবরুদ্ধ করে রাখা ওইটুকু গাজা ভূ-খণ্ডে এত বারুদ, অস্ত্র পৌঁছালো কীভাবে, তারও কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এদিকে মিনিটে বিপুল পরিমাণ রকেট হামলাতে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) পরিচালিত ‘আইরন ডোম’ সিস্টেম ফেল করে দেয়- ৯০% ফিলিস্তিনি আক্রমণ সাফল্যের সাথে রুখে দিলেও বাকি ১০% আনাড়ি রকেটের দাপটেই ইজরায়েলের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে যায়। আরও লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে ‘ইয়া-মোরাই’ ও ‘শিরট’ অঞ্চলের দু’দুখানা আয়রন ডোমের উপরেই আনাড়ি রকেট পতিত হয়ে ইজরায়েলের গর্বকে মৃত সাগরে জলসমাধি ঘটিয়ে দেয়। ইজরায়েল সহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমেই এই ছবি দেখা গেছে, বিশেষ করে আলজাজিরা সেগুলোর ডাইরেক্ট ফুটেজ দেখিয়েছে। ফলস্বরূপ, ব্যর্থ ক্রোধে গাজার ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সেন্টারটাই বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় ইজরায়েলী সেনা।
…ক্রমশ

রবিবার, ১৬ মে, ২০২১

CPIM পার্টির প্রচার পলিশিঃ পর্ব- ২



কী কী হতে পারত, যা হয়নি

পর্ব- ২

বিখ্যাত দার্শনিক ও সমাজ বিজ্ঞানী ‘নোয়াম চমস্কির’ একটা উক্তি আছে। “The general population doesn't know what's happening, and it doesn't even know that it doesn't know.”
বারে বারে ব্যর্থ নেতারাও চমস্কি পড়েন তাই বাণীটা জানেন, আর এটারই সফল প্রয়োগ করে একটা কল্পিত গোলকধাঁধার মাঝে সাধারণ কর্মী সমর্থকদের ভাবনাকে বিপথে চালিত করছেন। প্রায় সকল আম সমর্থকেরা সত্যিই জানে না অন্দরে কী ঘটছে, আর এটাও জানে না যে- তারা জানে না। তাই নেতা কিছু লিখেছে বা বলেছে মানেই সেটাকে ধ্রুব সত্য ভেবে, বিবিধ বিশেষণে প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যান।
সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা করার কথা নেতারা বলেন না তা নয়, এক্ষেত্রে আত্মসমালোচনার সংজ্ঞা হচ্ছে- ‘যাবতীয় সমালোচনা আত্মার মাঝেই সংরক্ষিত রইবে, আমি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ জানবে না’। আত্মসমালোচনার মুণ্ডুচ্ছেদে, আত্ম-হারা হয়ে ‘সমালোচনা’ দিনের আলো দেখলেই- দলবেঁধে রে রে করে তেড়ে নেমে পড়ে আগের পর্বে উল্লেখিত ‘খোঁজার’ দল। অথচ এনারা ভোট প্রচারের সময় এই দলবেঁধে একাত্ববোধটা দেখাননি, বিকল্পের কথাটা শুধু মুখেই বলেন, তার ফলিত প্রয়োগ নেই- মানুষ কী দেখে কেন আকৃষ্ট হবে? ফাঁপা বজ্রগর্ভ বুলি শুনে নাকি দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক কচকচানি শুনে?
কী হবে সেই বিকল্প প্রচার কৌশল? সেটা আমি বা আমার মতো কোনো কলমচি ঠিক করে দেবে না বা দিতে পারে না, এটা কোনো একক কাজ নয়। এর জন্য আলাদা আলাদা ক্ষেত্র আছে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্দিষ্টভাবে যোগ্যতা সম্পন্ন মেধা প্রয়োজন, যারা টিম হিসাবে কাজটা এগিয়ে নিয়ে যাবে, এবং মূল পার্টিকে পুষ্ট করবে- যেমন শাখা নদী মূল নদীকে জল যোগান দেয়। পার্টিতে মেধার কোনো ঘাটতি নেই, আর যদি না থাকে তাহলে বামমনস্ক শুভানুধ্যায়ী ও সমর্থকদের মধ্য হতে মেধা ‘হায়ার’ করতে হবে। কমরেড জ্যোতি বসু কি অশোক মিত্রকে আনেননি? পার্টি মেম্বার হওয়ার আগেই কি মন্ত্রীসভার জন্য কমরেড অসীম দাসগুপ্ত মনোনীত হননি? কাজে পেশাদারিত্ব চাইলে তো পেশাদার মানুষদের নিয়োগ দিতে হবে।
মোদ্দা কথা হলো- সফল হওয়ার বাসনা থাকতে হবে, তারপর তো সফলতা। দক্ষিণপন্থী দলগুলোর দ্বারা অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষ, ধরেবেঁধে আমাদের ক্ষমতার চেয়ারে বসিয়ে দেবে এমন ‘খেয়ালি পোলাও’ মার্কা ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে গেলেও- ভাবনাতে তাজা রক্ত চাই। প্রত্যয়ী আত্মবিশ্বাসের অভাব নিয়ে যুদ্ধ লড়া যায়নি, যাবেও না- জেতা তো দূর অস্ত।
এককালে বাংলার ঘরে ঘরে ‘মায়ের দয়া’ নামে ছোঁয়াচে রোগ হতো, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় জলবসন্ত বা চিকেন পক্স বলে। ‘ভেরিসলা জোস্টার’ নামের অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস এই রোগের জন্য দায়ী। পার্টির প্রচার মাধ্যম ‘বাপের দয়া’ নামের এক মারাত্মক সংক্রামক ভাইরাল রোগে আক্রান্ত, ভাইরাসের নাম প্রায় সকলেই জানে তাই উল্লেখ করা বাহুল্যতা। আর এই ভাইরাসেরা, রোগ নির্মূলকারী ওষুধ প্রয়োগের আগেই- শুধু প্রেসক্রিপশন দেখেই ভয় খাবে না তো কারা খাবে? এখনও তো ভ্যাক্সিন আসেনি, আসলে এরা তুড়ুক নাচ নাচবে ছটপটিয়ে। অতএব, যতক্ষণ না এই ভাইরাসগুলোকে স্যানিটাইজেশন দ্বারা নিকেশ করে সেটিংপন্থী নেতাদের ভ্যাক্সিন দেওয়া যাবে, তদ্দিন পার্টির রোগ মুক্তি নেই।
অথচ আধুনিক প্রচার কোনো কোয়ান্টাম ফিজিক্স নয়, সিম্পল সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মেধার মিথষ্ক্রিয়া ঘটিয়ে, মানুষের চাহিদা বুঝে- তা সংবেদনশীলতার সাথে গোপনে সমাজে প্রয়োগ করার নাম সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এটা কোনো একক ব্যক্তির সর্বজ্ঞ সেজে আঁতলামো মারার বিষয় নয়। কেরালা সফল প্রয়োগ করেছে, ফলও পেয়েছে। গত লোকসভায় ১টা আসন জেতা দল, বিধানসভায় স্বমহিমায় ফিরেছে। এটা একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার নাম, যেখানে মেধা, পড়াশোনা, তথ্য-নমুনা সংগ্রহ, সমীক্ষা, অনুশীলন, পর্যালোচনা ইত্যাদি গুলোর সমন্বয় ঘটাতে পারলে তবেই সিদ্ধান্তে আসা যায়, যেটা শ্রেণী সমাজের মনস্তাত্ত্বিক স্তরে ভীষণ ক্রিয়াশীল হয়।
এর জন্য বিশেষ কোনো খরচারও প্রয়োজন নেই, কারণ পার্টিতে দক্ষ কর্মীর অভাব নেই যারা বিনামূল্যে শ্রম দেবে, দরকার শুধু সিস্টেম্যাটিক পরিকল্পনা আর তার বিশ্বাসঘাতকতাহীন রূপায়ন। ২০২১ নির্বাচনের প্রচার কৌশলে কী কী ছিল না সেটা সংশ্লিষ্ট প্রার্থী আর নেতৃত্বেরা জানেন, কিন্তু কী কী দরকার ছিল সেটা পাঠিয়ে দিয়েছি জায়গা মতো, যাদের পাঠানো দরকার।
যারা আইনসভায় নীতি নির্ধারণ করবে দলের পক্ষে, সেখানে একদল প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী থাকাটা বাধ্যতামূলক, আইন না জানলে সবই তো ফক্কা। দলের একমাত্র সাংসদ, বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য রয়েছেন, কিন্তু ২০২১ বিধানসভায় দলের স্টার ক্যাম্পেনার তালিকাতে তার নাম ছিল না, সেভাবে মিটিং মিছিলেও দেখা যায়নি রিয়ালিটি বা ভার্চুয়াল জগতে। ওনার মতো অভিজ্ঞ সুবক্তাকে দল পেল না, এটা অনভিপ্রেত।
দুটো প্রজন্ম আগের নেতাদের সকলেই টেকনোলোজিতে দুরস্ত আপডেট হবেন এটা ভাবাটা বোকামি, তারা রাজনীতিটা বুঝলেই হবে। দলের নেতারা দল চালাবেন, দলীয় নীতি-নিয়ম ঠিক করবেন, তারা রাজনীতি করবেন, সরকারের বিরোধিতা করবেন যুক্তি দিয়ে, ক্ষমতায় গেলে প্রশাসক হবেন। এই তো কাজ।
প্রচারের দল ব্যাক অফিসে কাজ করবে, নেতাকে মুহুর্মুহ অ্যাসিস্ট করবে, নিতান্ত প্রয়োজনে প্রকাশ্যে আসবে। ব্যাক অফিসের মূল কাজ- বিভিন্ন ডেটা সংশ্লেষ-বিশ্লেষণ করে নেতাদের কাছে নিয়মিত পরিপূর্ণ সত্য তথ্যের যোগান দিয়ে আপডেট রাখবে। নেতাদের বক্তব্য, দলের নীতি মানুষের কাছে সহজে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেবে। সুতরাং এইগুলো মাথায় রেখেই প্রচার দলের ব্যাক অফিস সাজাবার দরকার ছিল।
আমরা ২০১৩ থেকে জানি বিজেপির IT Cell রয়েছে, ২০১৯ এ রাজ্যে PK এর i-pac রাজ্যে এসেছিল ঢাকঢোল পিটিয়ে, তৃণমূলের পক্ষে। এরা তো কোনো ব্যক্তি নয়, এরা তো বিশাল একটা সংগঠিত টিম। পার্টি তো জানত- প্রচার দলকে লড়তে হবে এই দুই অসম পুঁজিবাদী ভাড়াটে কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে। রাজ্য তথা দেশজুড়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্যা পার্টিকর্মী ও সমর্থকদের উন্নততর মেধাগুলির সমন্বয়ের মাধ্যমে বিকল্প কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরা বা বিকল্প কোনো পরিকল্পনা নিয়ে PK ও অমিত মালব্যের টিমকে প্রতিহত করার কোনো সদিচ্ছা ছিল না রাজ্য সিপিএম ডিজিটালের। অথচ এটা কেরল ডিজিটাল করে দেখিয়ে বিজেপিকে শূন্য করে ছেড়েছে। আমাদের রাজ্যের ডিজিটালের এই অনিচ্ছাটাকেই পার্টি দরদী মানুষ সন্দেহের চোখে দেখছে৷
PK মাত্র ২ বছর আগে দায়িত্ব পেয়ে তার সাফল্য দেখিয়ে গেল, যে এর আগে বাংলার নাড়ি-নক্ষত্রের কিছুই জানত না। সে অবশ্যই বিপুল টাকা নিয়ে তার কায়দায়ে খেলে গেল, আর আমাদের নারায়ণী সেনা শুধু লবিবাজি করে, কাঠি করে, নজরদারি করে, দাদাগিরি করে- যোগ্য লোকেদের তাড়িয়ে একটা ক্ষুদ্র বৃত্তের মাঝে নিজেদের ঢুকিয়ে, একে অন্যের পিঠ চুলকে তুরীয় সুখলাভ করল- এটাও প্রতিভা বৈকি।
PK আমাদের দলের বহু তৎকালীন MLA, অভিজ্ঞ সংগঠকের কাছে ঘুষের ঝোলা নিয়ে গেছিল দল পরিবর্তন করার জন্য। কিন্তু সেই আদর্শবাদী কমরেডরা সব নামধাম ফাঁস করে দিয়েছিল। এগুলো আনন্দবাজার ও তাদের এবিপি সহ সকল প্রথম শ্রেণীর মিডিয়াতে, সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ পেলেও- কিন্তু রাজ্য ডিজিটালের পক্ষ থেকে এই MLA বা সংগঠক কমরেডদের কারও সাক্ষাৎকার নিয়ে বাকিদের সাবধান করেনি। PK এর modus operandi কাউকে অবহিত করেনি রাজ্য ডিজিটাল টিম। কেন? কাকে সুবিধা দিতে? কী লুকাতে?
রাজ্য ডিজিটালের কর্তাব্যক্তিরা এই ভোটে ‘হিন্দু-মুসলমান’ বাইনারির গল্প ফেঁদে ব্যর্থতা লুকাবার চেষ্টা করছেন, অথচ আমাদের রাজ্যে যদি ২৭% মুসলমানের বাস হয়, কেরলেও ২৬.৫৬% মুসলমানের বাস ২০১১ জনগণনা অনুসারে। সেই রাজ্যেও বিজেপি কোটি কোটি টাকা ঢেলেছিল প্রচারে, অন্য দল কংগ্রেসও তাই। মাত্র ২ বছর আগেই কংগ্রেস ১৫টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু ২ তারিখের ফলাফলে দেখা গেল- কেরলে বিজেপি খাতা খুলতে পারেনি আর পশ্চিমবঙ্গে আমরা খাতা খুলতে পারিনি। দল তো একটা, পলিটব্যুরোও একটা, কেন্দ্রীয় ডিজিটালের পলিসিও একটাই, তাহলে তারা সেম ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে সফল হলো, আর আমাদের বঙ্গীয় রিংটালের দল- কেউ প্রশ্ন যাতে তুলতে না পারে তার জন্য দল, উপদল, তস্য দল পাকিয়ে গাব জ্বাল দিচ্ছে।
বিপক্ষের কী কী ছিল তা আমরা সব জানতাম, তাহলে আমাদের যা যা নেই সেগুলো নিয়ে ডিজিটালের কে কী পরিকল্পনা করেছিল? কোন অত্যাধুনিক মিডিয়া দল তৈরি করেছিল? আর সেটা তৈরি করে থাকলে তারা কী কী কাজ করেছিল? কোন কোন সেক্টারে করেছিল? কী তাদের পদ্ধতি ছিল? তারা যারা কর্মকর্তারা ছিল, তারা কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে চেয়ারে বসেছিল?
বিধানসভা ভোটের নিরিখে যে প্রশ্নগুলো আগামী পার্টি সম্মেলনে উঠবেই-
১) নবীন বা প্রবীন কোনো প্রার্থীদের নিয়ে কোনো কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপ হয়নি কেন?
২) পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে থাকা নেতাদের প্রায় সকলেই, তার দায়িত্বপ্রাপ্ত গুটিকয়েক কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও যায়নি, কার স্বার্থে যাননি?
৩) আমরা জানতাম আমাদের অর্থ নেই, অথচ প্রথম দফার ৩০ প্রার্থীর এক জনের জন্যও ক্রাউড ফান্ডিং এর আবেদন করা হয়নি। এটা শুরু হয় দ্বিতীয় দফায়- ১৭ই মার্চ গভীর রাত্রে রাজ্য সম্পাদকের পেজ থেকে জানা যায়। মাত্র ১২ দিন সময় পেয়েছিল দ্বিতীয় দফার প্রার্থীরা। শুধু তাই নয় সব প্রার্থীরা এই সুযোগ পায়নি, কারণ তারা কেউ আবেদনও করেনি। কেন এই বেসিক ব্যাপারে দু’মাস আগে থেকে এসবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি? কার স্বার্থে?
৪) বহু প্রার্থীর ‘ভোট একাউন্ট’ খোলা হয়েছিল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কে, যার IFS কোডের মাথামুণ্ডু নেই, বহু মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরে ঘুরেও টাকাই দিতে পারেনি। কারও কোনো গুগুল পে বা ভার্চুয়াল পেমেন্ট সিস্টেম ছিল না ২৪শে মার্চ অবধি। কোথায় দলের তরফে ‘ডিজিটাল’ এগুলো রেডি করে পাঠিয়ে দেবে, তার বদলে, এ বিষয়ে দলের অনুমতি সংগ্রহ করতেই কালঘাম ছুটেছিল প্রার্থী বা তার এজেন্টদের। ডিজিটাল কি চারটে পোস্টার বানিয়ে ফেসবুকে ‘গ্রুপ গ্রুপ’ খেলার জন্য ছিল? কেন এগুলো করা হয়নি?
৫) বহু কেন্দ্র ছিল সন্ত্রাসকবলিত ভয়ানক উত্তেজনাপ্রবণ। নির্দিষ্ট বিধানসভার প্রতিটা বুথই উত্তেজনাপ্রবণ হয় না, কিন্তু কোন বুথ উত্তেজনাপ্রবণ, কোন বুথ অধিক উত্তেজনাপ্রবণ- তার তথ্য সহ বুথের চরিত্রের তালিকা নতুন প্রার্থীদের কাছে ছিল না। খুব অভিজ্ঞ প্রার্থী ছাড়া অধিকাংশ এরিয়া কমিটি বা প্রার্থী নিজে, ভোটের ৪ দিন আগে এ সংক্রান্ত তথ্য জানত না। অথচ রাজ্য ডিজিটাল এই তথ্য শুরু থেকেই পাঠিয়ে দিতে পারত, সেই মতো স্থানীয় স্তরে বুথ ধরে ধরে প্রচার কৌশল সাজানো যেত, যা করা যায়নি।
৬) কীভাবে ‘সুবিধা অ্যাপ’ থেকে পার্মিশন নিতে হয়, ভোটের ১০ দিন আগেও অনেক এরিয়া কমিটির প্রবীন সদস্যেরা জানতেন না। তাদের পক্ষে আধুনিক প্রযুক্তি জানাও সম্ভব নয়। নতুন প্রার্থীদের অনেকেই জানত না আদৌ এভাবে পার্মিশন নিতে হয় নির্বাচন কমিশন থেকে। কোনো তরুণ কম্পিউটার জানা ছেলেকেও দায়িত্ব দিয়ে পাঠায়নি ডিজিটাল, এমনকি তাদের কোনো লিখিত নির্দেশিকা বা গাইডলাইন পর্যন্ত ছিল না যে, সুবিধা অ্যাপ কী ও কীভাবে এর ব্যবহার করতে হয়! ফলত বহু ক্ষেত্রে সময়ে সভা-মিছিলের পার্মিশন পাওয়া যায়নি। যে বিধানসভা ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, বিশেষ করে গ্রাম বাংলার বিধানসভার কেন্দ্রগুলোতে প্রার্থীরা নিজের প্রচেষ্টাতে উপযুক্ত লোকজন যোগাড় করে ঠেকা দেওয়া কাজ চালিয়েছে, ঠকে শিখে।
৭) প্রচারের প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে কমিশনের এক্সপেন্ডিচার অবজার্ভারের যে সম্পর্ক আছে সেটাই জানত না অধিকাংশ জন নতুন প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্ট। কারণ প্রচারের দায়িত্বে থাকা ডিজিটালই রিংটাল হয়ে বসেছিল।
৮) কীভাবে নির্বাচন কমিশনে কমপ্লেন করতে হয় সেটা অতি অভিজ্ঞ প্রার্থী ছাড়া অধিকাংশই জানত না। গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া জুড়ে যে ভুরি ভুরি অভিযোগ ছিল, তার অধিকাংশ সঠিকভাবে জমাই হয়নি কমিশনে- নিষ্পত্তি তো দূরস্থান। কতগুলো কমপ্লেন সিপিএম পার্টির তরফে আদতে হয়েছিল সে তো কমিশনের সাইটে গেলে এখনই খুঁজে পাওয়া যাবে। রাজ্য ডিজিটাল কোনো ধরনের সহযোগিতা পাঠায়নি বিধানসভাগুলোতে, সবই স্থানীয় লেভেলে দায়ে পড়ে শিখে ম্যানেজ করেছিল।
৯) কীভাবে মাইক ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে গাড়ির পার্মিশন করাতে হয়, কোথায় হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করা যায়, নির্বাচনী কেন্দ্রের সবচেয়ে এফেক্টিভ ইম্পর্টেন্ট পয়েন্ট, যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষকে ছোঁয়া যায়- তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না ডিজিটালের। কোথায় হেঁটে মিছিল, কোথায় বাইক মিছিল, কোথায় সাইকেল মিছিল, কোথায় বড় রোড শো, কোথায় পথসভা কোথায় জনসভা- এসব নিয়ে বিধানসভা ধরে ধরে সংগঠকদের সাথে কোনো মিটিং করেনি ডিজিটাল। এরা বিধানসভাগুলোর ম্যাপটুকুই জানত কিনা সন্দেহ।
১০) প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের চরিত্র আলাদা, সেইমতো প্রচারও আলাদা হবে। ৮ দফার ম্যারাথন নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছিল, ক্রমাগত ইস্যু বদলেছে। বিরোধীদের কৌশল বদলেছে। আমাদেরকেও সেইভাবে বদলাতে হতো। ব্রাঞ্চ কমিটি, এরিয়া কমিটি বা জেলা কমিটিকে এই বিষয়ে ডিজিটাল কোনো অফিশিয়ালি ডেটা দেয়নি। এমনকি প্রার্থীদের বক্তব্যের জন্য এক লাইনও নোটস পাঠায়নি ডিজিটাল। পরিকল্পনা করে সময় নষ্ট করেছিল রাজ্য ডিজিটাল।
১১) এই ভোটে দুটো ইস্যু ছিল, এক দল ভোটারের মনোভাব ছিল- তৃণমূলকে বামেরা ঠেকাতে পারবে না, তাই বিজেপিকে চাই। অন্য দলটার মনোভাব ছিল- বিজেপি চলে এলে রাজ্যের সর্বনাশ, বামেরা পারবে না, তাই তৃণমূলকেই রাখতে হবে। এই ইস্যুকে প্রকট করার জন্য PK দায়িত্বে এসেই- বিরোধী দলের ব্রাঞ্চ কমিটি অবধি পৌঁছে যাওয়ার অপচেষ্টা করেছিল।
এই ঘোষিত বাইনারি ভাঙতে রাজ্য নেতৃত্বের হাতে কী কী বিকল্প পরিকল্পনা তুলে দিয়েছিল রাজ্য ডিজিটাল? কী কী প্রচার কৌশল নেওয়া হয়েছিল তাদের তরফে? তার কোথায় কতটা রূপায়ন হয়েছিল? এটাই তো ছিল প্রচার দলের মূল কাজ। প্যারালাল উপদল তৈরি করে কিছু চাটুকার জন্ম দেওয়া ছাড়া, ডিজিটাল কিচ্ছু করেনি।
১২) যে বুথে এজেন্ট এর অভাব সেখানে বুথ ও অক্সিলিয়ারি বুথ দুটোকে কেমন ভাবে সামাল দেওয়া যায় সেই ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
১৩) ভোট প্রক্রিয়া চলাকালীন পোলিং এজেন্ট নিয়ে নতুন নিয়ম আসে কমিশনের তরফে। একই বিধানসভার যেকোনো অংশের ভোটার যেকোনো বুথে বসতে পারত। অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় এই নিয়ম সম্বন্ধে কোনো আপডেট দেয়নি প্রচারের দায়িত্বে থাকা ডিজিটাল। হাতে লড়াকু কর্মী থাকা স্বত্ত্বেও বহু বুথ ফাঁকা রয়ে গেছিল।
১৪) উপদ্রুত অঞ্চলের প্রার্থী অতিরিক্ত সিকিউরিটি কীভাবে পাবে, নির্বাচনের ২ দিন আগে কেউ কোথাও সহায়তা পায়নি ডিজিটাল পক্ষ থেকে।
১৫) বুথে বুথে কত জন বয়স্ক মানুষ, যারা ঘরে বসে ভোট দেবে কোন প্রার্থী জানত? এটা তো অফিসে বসে কমিশনের সাইট থেকেই জেনে নিয়ে প্রার্থীকে বলে দেওয়া যেত। কেন করেনি?
১৬) কেউ কি ভোটার লিস্ট নিয়ে- সেন্ট্রালি কন্ট্রোলাইজড অ্যানালিসিস করেছিল বিধানসভা ধরে ধরে? আমি তো ঘরে বসে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ২৫১ নং তালডাংড়া বিধানসভার ৯৮ নং বুথে বিজেপি ৩৬৭টা ভোট পেয়ে লিড করছে। ১৮৪ ডোমজুড় বিধানসভার ১৭৮ নং বুথে সিপিএম ৯৫টা ভোট পেয়েছে, ১৪৯ কসবা বিধানসভার ১২৩ নং বুথে সিপিএম ১১০টা ভোট পেয়েছে, ৭২ বহরমপুর বিধানসভার ২২ নং বুথে বিজেপি ৩১০ ভোটে লিড করছে, ১৯৫ জাঙ্গিপাড়া বিধানসভার ৯২ নং বুথে বিজেপি ১৬০টা ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ চাইলেই করা যায়। তাহলে গত বিধানসভার বুথ ধরে ধরে প্রার্থীদের কাছে ‘ছাত্রবন্ধু’ সাপ্লাই দেয়নি কেন ডিজিটাল?
১৭) নির্বাচনের আগের দিন রাতে থেকে ভয় দেখানো, টাকা-মদ-মাংস বিলানো চলবে এটা জানা কথা ছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা করবে সেটাও জানা কথা। এসবের বিরুদ্ধে লড়ে জয় আনতে কীভাবে- কুইক রেসপন্স টিমকে কেমন করে ব্যবহার করতে হয় তা নিয়ে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত অধিকাংশ জনকে জানায়নি রাজ্য ডিজিটাল। না কোনও প্রশিক্ষিত কর্মীকে বিধানসভা ধরে ধরে স্থানীয় এরিয়া কমিটির কাউকে প্রশিক্ষণ দিতে পাঠিয়েছিল। ভোটের দিন বুথ জ্যাম, ভয় দেখানো ইত্যাদি দেখলে কীভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কেমন করে ব্যবহার করতে হয় সে ব্যাপারে কোনো গাইডলাইন ছিল না। সিংহভাগ বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচনী ওয়ার রুমটুকু ছিল না, যাদের ছিল সেটা প্রার্থীর নিজের বা এরিয়া কমিটির ক্যারিস্মাতে। ডিজিটালের কিছু ছিল না। আসলে দু’কান কাটাদের লজ্জা নেই তারা গাঁয়ের মাঝখান দিয়ে যায়। স্বভাবতই, এরা আজও FM, হোর্ডিং, ইতিহাস আর পার্টির শৃঙ্খলার নামে গালগল্প শোনাচ্ছে বুক ফুলিয়ে।
১৮) লড়াই এর ময়দানে কোন অস্ত্রগুলো ছিল যা রাজ্য ডিজিটালের তরফে প্রার্থীরা পেয়েছিল?
১৯) একটা প্রার্থীরও পেজ বানিয়ে সেটাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হয়নি। মহঃ সেলিম, সুজন চক্রবর্তীর মতো বড় নেতাদের নিজেদেরই পেজ আছে যেগুলো ডিজিটাল মেনটেন করে না। শতরূপ ঘোষের মতো তরুণ নেতারা নিজের প্রচার নিজেরাই করে। বাকি মীনাক্ষী বা দীপ্সিতার নামে যে পেজগুলো জনপ্রিয় সেগুলোর একটার পিছনেও ডিজিটালের ন্যুনতম অবদান নেই। অথচ ডিজিটাল হাঁসজারু নাম দিয়ে যে ফেসবুক পেজগুলো বানিয়েছিল, সেগুলোর দুরাবস্থা নিজেরাই দেখে নিন- পেজগুলো সব আছে।
নতুবা কান্তি গাঙ্গুলীর মতো প্রবীন নেতাকে নির্বাচন চলাকালীন নিজের ফেসবুক আইডি থেকে- তার ও দলের হয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচারের জন্য আবেদন করতে হয় জনগণের উদ্দেশ্যে? বুঝে দেখুন এই অপদার্থরা ডিজিটাল না রিংটাল ছিল! কান্তি বাবু আপনি সম্মেলনে শুধাবেন না?
২০) প্রার্থী ও প্রার্থীর এজেন্ট সারাদিন মাটিতে চষে বেড়ায়, আধুনিক প্রচারে প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটা কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভোট ম্যানেজার থাকে, যারা ভোটটা করান অফিসে বসে- কারা ছিল ডিজিটালের তরফে?
২১) স্ক্রুটিনি রিপোর্টে পার্টির কাছে কী তথ্য ছিল? এর অনেকগুলো ধাপ ছিল, ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড ইত্যাদি। একসময় নেতারা এই রিপোর্টের উপরে ভিত্তি করেই তো পলিসি ও প্রচার কৌশল ঠিক করতেন। স্ক্রুটিনি সিস্টেম আছে নাকি উঠে গেছে? থাকলেও যারা স্ক্রুটিনি করেছিল তারা ভুলভাল মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছিল কেন, তারা কি এই ডিজিটালের অংশ?
২২) যেসব তরুণ-তরুণী কমরেডরা বুথে এজেন্ট হিসেবে বসেছিলেন তারা অনেকেই অনভিজ্ঞ। অনেকেই প্রথমবার বুথ এজেন্ট হয়েছিল। ভোটের নিয়মকানুন সম্পর্কে রাজ্য থেকে কোনো নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল কাগজে বা হোয়াটসএ্যাপে? চ্যালেঞ্জ ভোট কি জানত? কখন চ্যালেঞ্জ করতে হয়? কখন টেন্ডার ভোট করাতে বলতে হয় এসব বুঝিয়েছিলেন কেউ? বহু বুথে তৃণমূলের ফলস ভোটার বুঝতে পেরেও তারা নিয়মগুলি না জানার জন্য এলোমেলো প্রতিবাদ করেও লাভ তুলতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি আমাদের বর্ধমান শহরের বহু বুথে শাসক দলের বহু ‘হুব্বা’ আঙুলে ‘বোরোলিন’ লাগিয়ে তার উপরে লাগানো ভোটের কালি মুছে একাধিক বার ভোট দিয়েছে।
এমন অনেক অনেক জ্বলন্ত সমস্যা ছিল। যেগুলো চাইলেই মিটিয়ে একটা কমপ্যক্ট লড়াই দেওয়া যেত, হারজিতের ব্যাপার তো লেগেই থাকত।
উপরের ২২ দফা অতীব প্রয়োজনীয় কাজের জন্য কোন ইউটিউব লাগত? কোন FM লাগত? কোন হোর্ডিং লাগত? কোন চাটার্ড ফ্লাইট লাগত? কোন টিভি মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়া লাগত? লাগত ইলেক্টোরাল বণ্ড বা গরু পাচারের অবৈধ টাকা? উপরোক্ত ২২ দফাতে কোথায় লক্ষ কোটি খরচের স্কোপ আছে? তৃণমূল বিজেপি টাকা খরচা করেছে সত্য, সাথে সাথে এগুলও যে তারা করেছিল সেই খবরটা জনগণের থেকে চেপে গেছে সাবালকত্বের ডিগ্রীধারীরা। যারা ‘অ্যাপোলোজেটিক, শুষ্ক সিম্প্যাথি’শব্দবন্ধ দিয়ে নিজেদের ইচ্ছাকৃত ব্যার্থতাকে ধামাচাপা দিতে চাইছে, তারা অযোগ্যতম, কারন তারা নিকৃষ্ট স্বজনপোষণের ফসল।
যতই সিপিএম-এর দুর্বলতা থাকুক, সাংগঠনিক ত্রুটি থাকুক- এগুলো করার জন্য যা আছে সেটাই যথেষ্ট ছিল। এগুলোর জন্য ইতিহাস নয়, যোগ্যতা লাগত। পরিকল্পনা লাগত। লাগত বিশ্বাসঘাতাহীন রূপায়ন।
আসলে প্রতিপক্ষ আমাদেরকে প্রচার পরিকল্পনাতেই নক আউট করে দিয়েছিল, ২রা মে’র রেজাল্টে নতুন কীই বা হতে পারত। রাজ্য ডিজিটাল একদম পরিকল্পনা করে দলকে ডুবিয়েছে, তাদের পরিকল্পনাহীনতার জন্য। অনভিজ্ঞ প্রার্থীরা জানলই না কীভাবে নির্বাচন লড়তে হয়।
অথচ, আমাদের পূর্বতন শ্রদ্ধেয় নেতা কমরেড কাকাবাবু ১৯৬৭ বিকল্প মিডিয়ার কথা ভেবেছিলেন, গণশক্তি নামের পাক্ষিক সংবাদপত্রের সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে কমরেড সরোজ মুখার্জীর নেতৃত্বে গণশক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে একে দৈনিক সংবাদপত্রে রুপান্তরিত করা হয়েছিল যেটা তৎকালীন দেশে আর কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের ছিল না, কমরেড অনিল বিশ্বাস তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন। তখন পাড়ার মোড়ে মোড়ে বিনামূল্যে বোর্ডে টাঙিয়ে গণশক্তি পড়াবার ব্যবস্থা করেছিল তৎকালীন নেতৃত্ব।
চল্লিশের দশক থেকে IPTA ছিল, এদের শাখা হিসাবে গণনাট্য সঙ্ঘ, গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘ, গণসঙ্গীত দল ইত্যাদি সামাজিক সাংস্কৃতিক শাখাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো গেছিল। গত ১০ বছরে পলিসিগতভাবে নতুন কী তৈরি করেছি আমরা? রাজ্য ডিজিটালই বা কোন নতুন ভাবনা এনেছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে, যার দ্বারা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারি হরেক আঙ্গিকে !
সমকালীন সময়ে প্রচারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল আমাদের দল, নেতৃত্ব যুবফ্রন্ট খুলে ফেলেছিলো সেই কালেই, তবে না তারা ক্ষমতায় এসেছিল ও ৩৪ বছর টিকে ছিল।
ফেসপ্যাক মুখের কলঙ্ক ঢেকে দেয়, i-pac কলঙ্ক কীসে ঢাকবে?
সুতরাং, পার্টির আজকের এই লাগাতার দুর্দশার মূল কারণ শুধুই নেতৃত্বের ব্যর্থতা নয়, না অর্থাভাব। মূল অভাব ছিল মেধার সমন্বয় ঘটিয়ে পরিকল্পনামাফিক বিকল্প প্রচার কৌশলের অভাব। কেরালা বা ত্রিপুরা যা পারে আমরা তার সিকিভাগ পারিনি।
যে কর্মীরা মিছিলে হেঁটেছে, যে কর্মীরা বিরোধীদের অত্যাচারে লড়াই করে টিকে আছে, যে কর্মীরা সকল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সারাবছর সংগঠন করে, যে কর্মীটি মার খেয়ে দীর্ঘদিন পর হাসপাতালে ছাড়া পেয়েই লাল ঝান্ডাটা নিয়ে পাড়ার ভিতর দিয়ে বাড়ি ফেরে, যে কর্মীটি মুছে দেওয়া দেওয়াল পুনরুদ্ধার করে, যে কর্মীটি ছিঁড়ে দেওয়া ফ্ল্যাগ ফেস্টুন পরম মমতায় তুলে আবার লাগিয়ে দেয়, যে কর্মীরা পার্টির অফিস পুনরুদ্ধার করেছে, যে কর্মীরা জানপ্রাণ দিয়ে বুথ রক্ষা করেছে, যে কর্মীরা শত চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেও কাউন্টিং হলে শেষ অবধি টিকে ছিল, এ পরাজয়ের দায় তাদের নয়।
যে সমর্থকদের দল কিছু পাব না জেনেও শুধু লাল ঝান্ডাকে ভালোবেসে, আদর্শের টানে মিছিলে হাঁটে, ব্রিগেডে আসে, ফেসবুকে সগর্বে নিজেকে বামপন্থী বলে পরিচয় দেয়, বিরোধীদের সাথে নীতির প্রশ্নে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমানে সমানে টক্কর দেয়, এ পরাজয়ের দায় তাদের নয়।
এ দায় প্রচারের দায়িত্বে থাকা রাজ্য ডিজিটালের রিংটাল হত্তাকর্তাদের।
…ক্রমশ

বুধবার, ১২ মে, ২০২১

CPIM পার্টির প্রচার পলিশিঃ পর্ব- ১



কী কী হতে পারত, যা হয়নি


গুরুদেবের গল্পে, কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করেছিল, সে জীবিত ছিল।
গত ১১ই মে রাত্রে পার্টির রাজ্য সম্পাদক ফেসবুকে একটা পোস্ট শেয়ার করে অনেকগুলো বিষয় প্রমাণ করলেন, বিধানসভায় শূন্য হবার পর।
প্রথমত, পর্যালোচনা করে পার্টির অফিশিয়াল বিবৃতি আসার আগেই, ওপেন ফোরামে আলোচনা করা যায়- যা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির স্টাইলের সাথে হুবহু মিলে যায়, বলে দেওয়া যায় ওটা ‘ছোট্ট ঘটনা’।
দ্বিতীয়ত- সমালোচনা বরদাস্ত হবে না, এটাও মমতা ব্যানার্জি স্টাইলে কপিপেস্ট।
তৃতীয়ত হারের জন্য কেবলমাত্র অজুহাত দায়ী - নেতৃত্ব নয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই নিয়েই এই নিবন্ধ।
যেহেতু খোদ রাজ্য সম্পাদক সহ দিল্লী নিবাসী এক পলিটব্যুরো সদস্য একই লেখা শেয়ার করেছেন, তাহলে এটাকেই আমরা সাধারণ সমর্থকেরা ‘পার্টির প্রাথমিক পর্যালোচনা’বলে পার্টির বক্তব্য হিসাবে ধরে নিতেই পারি।
কতগুলো হিসাবে চোখ বুলিয়ে নিন, তারপর বাকি হিসাবগুলোর বিস্তারিত যাব পরবর্তী পর্বগুলোতে। এটা ফেসবুক, তাই পথম দফাতে শুধু ফেসবুকের হিসাব টুকু দিলাম, গুগুল, ইউটিউব, FM, হোর্ডিং, ইতিহাস, ভূগোল, স্ট্রাটেজি, বিজ্ঞান, AI, এ্যাপ্লিকেশন সহ প্রতিটি গল্পে ঢুকে- ভাঁড়ামিটা চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টাতে ত্রুটি থাকবেনা, ধৈর্য রাখুন। গল্পের গরুকে গাছ থেকে নামিয়ে গোয়ালের গোঁজে বাঁধার মন্ত্রও সমাজে রয়েছে।
দলের একজন পলিটব্যুরো সদস্যের তত্ত্বাবধানে CPIM Digital নামে শাখা সংগঠন কাজ করে রাজ্যে রাজ্যে। মূলত সিপিএম ৩টে রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল বা আছে, কেরালা, ত্রিপুরা ও আমাদের পশ্চিমবঙ্গ। চলুন এই ফেসবুকে পার্টির নামে রাজ্যের পেজগুলোর দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিই।
বাংলা সিপিএম ফেসবুক পেজের লাইক ৩১৩ হাজার, আমাদের ৪২টা লোকসভা আসন।
কেরালা সিপিএম পেজ ৬০৮ হাজার লাইক, তাদের মাত্র ২০টা লোকসভা আসন।
কেরালার Digital এর কাজের হিসাবে আমাদের রাজ্য পেজের লাইক হওয়া উচিত ছিল ১২৭৬ হাজার, সে তুলনাতে মাত্র ২৪% কাজ হয়েছে। আচ্ছা ছেড়ে দিন, সেখানে না হয় পার্টি রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল। ত্রিপুরাতে তো বিরোধী দল আমাদের পার্টি। ত্রিপুরাতে মাত্র ২টো লোকসভা আসন, তাদের রাজ্য পেজে লাইক ১৯০ হাজার, ওই অনুপাতে আমাদের রাজ্য পেজের লাইক হওয়া উচিত ছিল ৩৯৯০ হাজার। ত্রিপুরার ডিজিটালের কর্মদক্ষতার তুলনাতে আমাদের রাজ্যের কর্মদক্ষতা মাত্র ৭.৮৪ শতাংশ।
আগামীতে ত্রিপুরাতে দল ক্ষমতাতে আসবে না তো বাংলাতে আসবে?
চলুন গণসংগঠনের দিকে তাকাই-
DYFI পশ্চিমবঙ্গ যেখানে মাত্র ৪২ হাজার লাইক, সেখানে DYFI কেরালার লাইক ২৫১ হাজার।
SFI কেরালা যেখানে ১৫২ হাজার লাইক, সেখানে SFI পশ্চিমবাংলা মাত্র ৬০ হাজার লাইক।
CITU কেরালা ৩১৬০০ লাইক যেখানে, সেখানে CITU পশ্চিমবঙ্গ মাত্র ২১ হাজার লাইক নিয়ে টিমটিম করছে। মহিলা সমিতি, কৃষকসভা সহ বাকিগুলোর পশ্চিমবঙ্গ পেজ ফেসবুকে আদৌ আছে কিনা জানি না, থাকলেও গোরস্থানের সলতের মতো টিমটিম করে বেঁচে আছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, পলিটব্যুরো থেকে যা সিদ্ধান্ত হয় তা তো সকল রাজ্যের জন্যই প্রযোজ্য, রাজ্য সেটাকে রূপায়ন করে। তাহলে বাকি দুটো রাজ্যের তুলনাতে বাংলার এই দশা কেন? ৩টে রাজ্যেই তো CPIM Digital নামধারীরা কাজ করছে।
বাকি দুই রাজ্য এই ফেসবুক মাধ্যমে এত এগিয়ে যেতে পারলে আমাদের রাজ্যের ডিজিটাল রিংটাল হয়ে পড়ে আছে কেন? দুটো কারণ হতে পারে, এক- স্বজনপোষনের দ্বারা অপদার্থ অযোগ্য লোক বসিয়ে রেখেছে, দুই- পিকে অন্য দুটো রাজ্যে বিশ্বাসঘাতকদের নিয়োগ করতে সফল হয়নি- অথবা দুটোই। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সিপিএম ডিজিটাল সিপিএমের পক্ষে কতটা কাজ করেছে তথ্যে যেমন পরিষ্কার, অন্য দলের হয়ে কতটা কাজ করেছে সেটা ভোটের ফলে পরিষ্কার। মাননীয় রাজ্য সম্পাদক ও মাননীয় পলিটব্যুরো সদস্য শুনতে পাচ্ছেন? উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে রইলে প্রতিপক্ষেরা অন্ধ হয়ে যায় না।
কতগুলো এলোমেলো গোঁজামিল দক্ষিণপন্থী বুর্জোয়া যুক্তিজাল বুনে নিজেদের আড়াল করতে চাওয়ার চেষ্টার ত্রুটি নেই। শুরুতেই ভারী ভারী তথ্য দিয়ে মানুষের ভাবনাকে ডাইভার্ট করে দেওয়ার অনবদ্য প্রয়াসও করা হয়েছে, যাতে কেউ প্রশ্ন না তোলার সুযোগ পায়। তৃণমূল যেমন মেলা-খেলা দিয়ে মাতিয়ে রেখে- আসল সমস্যা থেকে মানুষকে দূরে ও ভুলিয়ে রাখে, বিজেপি সেটাই করে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও গরু রাজনীতির নামে। এরা দুই দলই মানুষকে প্রশ্ন করতে দেয় না।
আধুনা এ রাজ্যের বাম রাজনীতিতেও নিজেদের গদি বাঁচাবার তাগিদে এলোমেলো অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক যুক্তি সাজিয়ে- পার্টিকর্মী ও সমর্থকদের মূল সমস্যা ও আলোচনার জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে ‘অর্থাভাব আর সন্ত্রাসের’ বাইনারি দেখিয়ে। সমস্ত রকমের ত্রুটি-বিচ্যুতি, সেটিং, বিশ্বাসঘাতকতা আর অপদার্থতা ভুলে- সমর্থক আর পার্টিকর্মীরা সারাক্ষণ মেতে থাকবে বাইনারির মধ্যে অজুহাত দিতে, টাকা নেই আর ওখানে সন্ত্রাস। অর্থাৎ ‘আমরা কেউ দায় নেব না’স্পষ্ট করে এই বার্তা দেওয়া, এবং পদও ছাড়ব না তাতে আজকের শূন্য আগামীতে মাইনাস হয়ে গেলে যাক, কুছ পরোয়া নেহি।
এই ধরনের কুযুক্তি যারা সাজায়, তারা মূলত অন্তঃপুরের বাসিন্দা, মাটির সাথে যোগ নাই। আগেকার দিনে রাজা বাদশাদের হারেম পাহারাতে ‘খোঁজা’ নামের একধরণের স্বাস্থ্যবান ক্লীব থাকত, যারা অন্তঃপুরবাসিনীদের সুরক্ষা দিত। এই খোঁজারা আদতে পুরুষের মতো দেখতে হলেও পুরুষত্বহীন নির্বীজ প্রজাতির- গ্রাম্য চলিত ভাষায় অনেকে হিজড়েও বলে এদের। শিশুবয়সেই এদের শুক্রাশয় কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হতো। আজকে রাজ্য পার্টির অন্তঃপুরবাসীরা ওই ধরনেরই মুষ্টিমেয় কিছু খোঁজা পুষে রেখেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে, যাদের শুক্রাশয় কাটার সাথে সাথে মগজটাও বন্ধক রাখা হয়েছে। ভাবনা ও চেতনাতে নির্বীজ এই প্রোটোটাইপ নির্বোধ খোঁজারাই মূলত সোশ্যাল মিডিয়াতে ওই অন্তঃপুরবাসীদের পক্ষে সমানে লড়ে যায়- যুক্তিহীন বিপ্লবী যোদ্ধা সেজে।
হতাশ কর্মী সমর্থকেরা যখন হারের কারন বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে নিজের মত করে, একটা ধান্দাবাজ শ্রেনী তখন জোর করে ঘাড় ধরে চোখে আঙুল দিয়ে বলছে- একমাত্র ‘রেড ভলেন্টিয়ার’ এর উপরেই কনসেন্ট্রেশন করো, দেখছোনা আনন্দবাবুরা ২৪ঘন্টা দেখাচ্ছে। ভোট পরীক্ষা আমারাই দিয়েছিলাম, শূন্য পাওয়ার ব্যার্থতা দোষের স্ক্রুটিনি বিচার আমরাই বিচার করব, তোমরা কর্মী-সমর্থকেরা কলুর বলদ, খাটার সময় খাটবে, প্রশ্ন কিসের? সম্মেলন আসলে দেখে নেব, ইত্যাদি।
আজ সব বাঁধা উপেক্ষা করে রেড ভলেন্টিয়ার মানুষের সেবা করছে, এটাই সত্য; অথচ এই অজেয় ছাত্রযুবরা গত বছরেও রাস্তাতেই ছিল, লকডাউন, আম্পানের সময় বিবিধ জনকল্যাণমুখী কাজ করে ছিল। সে সকলেরও ছবি ভিডিও সব রয়েছে ফোনের গ্যালারিতে। তাহলে মাত্র ১ মাস আগে ভোটের সময় সেসকলের এমন মরিয়া প্রচার করতে কে মানা করেছিল? যেমনটা আজকে অল আউটে রেড ভলেন্টিয়ার নিয়ে প্রচার হচ্ছে!।
যারা মাটিতে দৌড়াচ্ছে, তারা রাস্তাতেই আছে মানুষের পাশে। কিন্তু রাস্তাহীন অন্তঃপুরবাসী উদ্দেশ্যই হচ্ছে- মাতিয়ে রাখো, যেন প্রশ্ন না তোলার সুযোগ না পায়। তার পরেও কেউ বেফাঁস বলে দিলে শৃঙখলার নামে ভয় দেখিয়ে মুখে সেলোটেপ মেরে দাও। যাতে অপদার্থতা, ব্যার্থতা ও অন্তর্ঘাত নিয়ে প্রশ্ন না উঠে।
আচ্ছা পার্টি কি কারও বাপের সম্পত্তি? উত্তরটা খুব সহজ, সকলের জন্য না হলেও কারও কারও জন্য তো বটেই। যারা নিজের রাজনৈতিক সাবালকত্বের বিষয়ে বিজ্ঞাপন দেন, বাপের পরিচয় ছাড়া তাদের নিজস্ব যোগ্যতা কী? বাপের ব্যাটা একসময় প্রশংসা অর্থে ব্যবহৃত হতো, এখন গালি হিসাবে চলে। স্বজনপোষণ যেখানে প্রকাশ্য সত্য, অন্তর্ঘাতের সন্দেহ সেখানেই শুরু।
আজ আমরা ৩৪ বছরের সুফল প্রচারণা করি গর্বের সাথে। তাহলে ‘আমরা ভোটের রাজনীতি করি না’ বলে যারা গর্ব অনুভব করি, তারা কি ভোটের রাজনীতি করে ক্ষমতায় থাকা ৩৪ বছরকে অস্বীকার করে? যেদিন থেকে পার্টির হাত থেকে রাজ্যের সংসদীয় ক্ষমতা খোয়া গেছে, সেদিন থেকেই সংগঠন রুগ্ন হতে শুরু হয়েছে। যত বড় সংগঠন, তত বেশি মানুষের পাশে থাকা। মূল লক্ষ্য তো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে শোষনহীন সমাজে গরিব শ্রেণীবন্ধুকে সুরক্ষা দেওয়া- তা বিপ্লবের মাধ্যমে হোক বা সংসদীয় গণতন্ত্র মেনে ভোটের মাধ্যমে। সুতরাং, যারা সংসদীয় গণতন্ত্রে ভোটে হেরে ‘মানুষের পাশে আছি’ বলে ছেঁদো গল্প ফাঁদছে, তারা আসলে সত্য গোপন করার প্রচেষ্টায় পার্টির ও গরিবের সাথে গাদ্দারি করছে। মানুষ আমাদের পাশে রাখার যোগ্য মনে করেনি, এটাই গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত- কারণ ফল ঘোষণার ১০ দিন পর পর্যন্ত ভোটে নারকীয় সন্ত্রাস, বুথ দখল বা ইভিএমের কারচুপির নামে তেমন কোনো শব্দ নেই পর্যালোচনাতে।
তাহলে কি আমরা বিজেপি-তৃণমূলের চেয়েও অযোগ্য? না তা নয়। আমাদের নীতি অজেয় বিজ্ঞান- কিন্তু তার প্রয়োগ পদ্ধতিটা সেকেলে তাই অযোগ্য। এই কারণেই আমরা হেরে গেলাম, শূন্য হয়ে গেলাম বিধানসভাতে।
হাতের মোবাইলের এ্যপসগুলোও তো নির্দিষ্ট সময়ে আপডেট চায়। মোবাইলে নতুন কোনো নীতি আছে? সেই ফোনে কথা বলা, ক্যালকুলেটর, হ্যাণ্ডি কম্পিউটার, এলার্ম ঘড়ি, ক্যামেরা, টর্চ, বই লাইব্রেরি, এনসাইক্লপিডিয়া, গান শোনা মেশিন, সিনেমা দেখা মেশিন ইত্যাদি। মোবাইল একটা চলমান অত্যাধুনিক সিস্টেম মাত্র, মোবাইলে যে বিষয়গুলো আমরা করি বা দেখি সেটা সবই প্রায় পুরাতন নীতি, নতুন আঙ্গিকে। তাহলে রাজনৈতিক দলের নীতি অক্ষুণ্ণ রেখে সিস্টেমকে আপগ্রেড করব না কেন?
তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম বারের জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রে সর্বোচ্চ সফলতা লাভ করেছিল ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে। ঠিক এর ১ বছর আগে চিটফান্ডের টাকায় পুষ্ট Channel-10 নামের একটা প্রোপ্যাগান্ডা মেশিন বাজারে নামিয়ে দিয়েছিল তারা, যার লাভ পরের বছরই হাতেগরম পেয়ে যায় দল তৃণমূল, কাজ মিটতেই তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, আজ তার অস্তিত্বটুকুও নেই। আজকে যারা ‘বাজারি মিডিয়া আমাদের দেখায় না’ বলে মড়াকান্না কাঁদছে, তাদের কাছে প্রশ্ন- তারা তো নিজের পয়সাতে লাভের জন্য ব্যবসা করতে এসেছে, কেন আমাকে দেখাবে? যদ্দিন আমাকে দেখালে তাদের লাভ ছিল তদ্দিন ‘২৪ ঘন্টা’ আমাদের ২৪ ঘন্টাই দেখাত।
২০২১শে প্রচারে কথা তো ছিল আমরাই বিকল্প, যেখানে লেভির টাকায় দল চলে- সেখানে গত ১ যুগ ধরে বিকল্প নিজস্ব মিডিয়া তৈরি না করে পুঁজিবাদী বুর্জোয়া মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন দিতে যাবার গল্প কেন? এটাই তো বুর্জোয়াতান্ত্রিক দক্ষিণপন্থী মানসিকতা। বামপন্থী রাজনীতি মানে সম্বৎসর মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ, তারা কেন পুঁজিবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নিজেদের তুলনা করবে? বামেদের প্রচার কৌশল বামেদের মতো করে হবে, যা ইউনিক তথা স্বতন্ত্র, যা অন্যেরা চুরি করবে। পুঁজিবাদ যখন বিপদে পড়ে, তখন আজও সে দাস ক্যাপিটালের পাতাই উল্টায়।
শূন্য একটি পূর্ণসংখ্যা, যা ধনাত্মকও নয়, ঋণাত্মকও নয়। শূণ্যের সামনে অন্য কোনো সংখ্যা বসলে তবে তা মান পায়। শূন্যের সাথে যতকিছুই গুণ করুন, তার ফল শূন্যই হবে। কারণ শূন্যের কোনও মান নেই।
ভেবে দেখুন, যারা শূন্য নিয়ে ভীষণ গর্ব অনুভব করছেন- আপনাদের ন্যুনতম মান আছে কি? যদি আত্মবিশ্বাস থাকে- হ্যাঁ আমার মান আছে, তাহলে শূন্যের সামনে অন্য মৌলিক সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়ে যান, দেখবেন পার্টি, সংগঠন সব দাঁড়িয়ে গেছে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, সমাজ বদলে যাবে। একমাত্র বামপন্থীরাই পারে সমাজ বদলাতে।
…ক্রমশ

সোমবার, ১০ মে, ২০২১

সুভাষ বাউরি আক্রান্ত



পাণ্ডবেশ্বরে আমাদের প্রার্থী সুভাষ বাউরি আক্রান্ত, এ বিষয়ে গত কাল রাত্রেই পশ্চিম বর্ধমানের আমাদের জেলা সেক্রেটারি গৌরাঙ্গ দা পোস্ট দিয়েছেন। কিন্তু আনন্দের ব্যাপার এইটা হল যে- না কোন দ্বিতীয় নেতা এ বিষয়ে কোনো রা কেটেছে, না কোন ডিজিটাল এর 'বাপের দয়া' ভাইরাস গুলো কোথাও কোনো ফুট কেটেছে। তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ চামচা আর খোঁজাগুলো কেউ কোথাও এক লাইনও লেখেনি।

তারা তৃণমূলের সাথে সেটিং করে সারাক্ষণ সরকারকে বাঁচাতে ব্যাস্ত। কোনমতে যেন সরকার বিব্রত না হয়, সরকারের উপর যেন মানুষের ক্ষোভ আছড়ে না পরে তার জন্য 'খয়রাতি শ্রম' নিয়েই মাতিয়ে রেখেছে কিছু ছেলেপুলেকে। আর সেই নিয়েই যত নাচাকোঁদা। আজ তো আবার টুইটারের কোনো এক 'মমতা সাপোর্টারদ' গ্রুপের এডমিনকে অক্সিজেন পৌছে দিয়ে এমন গর্বিত হয়েছে, যেন- বাপের বিয়েতে বরযাত্রী যেতে পারার মত উল্লাসে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে। দলের কর্মী, প্রার্থী আক্রান্ত- সে নিয়ে এদের টাইমলাইনেও কোনো পোষ্ট নেই ১৬-১৭ ঘন্টা পরেও। জানিনা গণশক্তি ছেপেছে কিনা।
অথচ ৩ দিন আগে খনি ধস হয়েছে, শ্রমিকের হাতে কাজ নেই, আমাদের প্রার্থী আক্রান্ত- সবাই শহরের ২০-২৫টা আসনের মধ্যেই ব্যাস্ত। পান্ডবেশ্বরে কোথায় রেড ভলেন্টিয়ার? কে নিয়ে যাবে সেই শ্রমিকদের কাছে খাদ্য, অন্যান্য সামগ্রী? কোথায় সেই ছবি তুলে মানুষে কাছে তুলে ধরার প্রয়াস?
দায়িত্বে থাকা সিপিএমের প্রচার মাধ্যম 'ডিজিটাল' কোথাও ১ লাইনও লিখেছে এই পোষ্ট হওয়া অবধি। পিকে রাজ্য থেকে চলে গেলেও, তাদের বাধ্য পোষ্যের মত সম্পূর্ণভাবে প্রাণ সঁপে দিয়ে- তৃণমূল সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে ত্রুটি রাখছেনা। পাশাপাশি এই সব আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাগুলোকে আড়াল করারও নিকৃষ্ট প্রয়াস চলছে, যাতে তৃণমূল বেড়ে খেলতে পায়। পিকে-রাজ্য ডিজিটালের অসামান্য ডাবলস জুটি মাইরি, কিম্বা অসামান্য প্রভুভক্তির নিদর্শন।
সেখানে কোথায় কে মার খেলো কি আসে যায় তাতে!
তৃণমূলী লুম্পেনগুলোকে একটা কথাই বলব- ছিঃ......
সেই লুম্পেন পান্ডবেশ্বরের খনিতে সুভাসকে মারা দুষ্কৃতি হোক বা আলিমুদ্দিনে প্রচারের দায়িত্বে বসেথাকা নির্লজ্জ তৃণমূলী লুম্পেন-
এই লুম্পেনগিরি তথা বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে রোজগার করা অর্থে পালিত সন্তান কিন্তু আপনার ঘরেই বড় হচ্ছে- শোধ তুলে নেবে সে-

শনিবার, ৮ মে, ২০২১

স্বরচিত দাস ক্যাপিটাল


 

শৃঙখলা বজায় রাখতে "স্বরচিত দাস ক্যাপিটাল" ইভেন্ট আয়োজন করুক Digital

মহামতি মার্ক্সের খেলার সাথী, পড়শী, সহপাঠি ও মেন্টরেরা যারা ফেসবুকের আনাচে-কানাচে কিলবিল করছেন, দয়াকরে আপনারা সকলে গর্জে উঠুন।
১) আমরা শূণ্য হলেও বাম, এতেই সর্বোচ্চ তুড়িও তৃপ্তি।
২) মূলত কোলকাতা, তৎসংলগ্ন ও কিছু জেলা শহরে ভলেন্টিয়ার বিপ্লবের নামে সস্তার শ্রম ফেরি, (গ্রামে যদিও এসবের বালাই নেই)
৩) রান্নাঘর রান্নাঘর খেলা
৪) আমরা ভোটের রাজনীতি করিনা, আমাদের রয়েছে "ফুটো পাত্র"।
৫) যত বারই ব্যার্থ হও, শুধু মাত্র সৎ বলে নেতৃত্বের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতেই হবে আত্মসমীক্ষা ও হারের কারন অনুসন্ধানের জন্য।
৬) চামড়াকে ভিয়েতনামের বাঙ্কারের মতো এতো মোটা করা হোক, যেখানে বিপ্লবের আঁচ না পৌছায় ভিতরে
৭) বহিষ্কারের ১০১টি সহজ উপায়।
৮) শুধুমাত্র রাস্তায় তরুনদের রাখা, ওরা দৌড়াবে, মার খাবে। ক্ষীর খাবেন ইয়েরা...
এগুলোকে চরমভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে এমন ব্যাখ্যামূলক আপডেট ভার্সনই একমাত্র গৃহীত হবে।
নতুন তত্ত্বের নামকরনও করতে পারেন, উদাহরণ স্বরূপ- "ধান্দামূলক বরবাদ" কিম্বা "শূণ্যমূলক খাস্তাবাদ" ইত্যাদি।
আজ মার্ক্সের জন্মদিনে জাতি কী-
এটুকু আশা করতে পারেনা?
পারেনা করতে আশা?

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...