শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০

ইসলামে পদবীর ইতিহাস সন্ধানে


ইসলামে পদবীর ইতিহাস সন্ধানে

 

পদবীর ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসে খুব পুরাতন নয়, সাকুল্যে হাজার খানেক বছর হবে। মধ্য যুগে রাজা মহারাজের থেকে প্রাপ্ত নানান উপাধি ও পেশাগত পরিচয়ই পদবী বা ‘ফ্যামিলি নেম’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল দশম শতাব্দী ও তার সমসাময়িক সময়ে। তবে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে নাম, গোত্র, স্থান বা পিতার নাম নয় এমন পৃথক শব্দ অনেকে নামের সাথে ব্যবহার করত- অনেক ঐতিহাসিক একে ‘পদবী’ ব্যবহারের আদি সুত্র হিসাবে উল্লেখ করেন। কিছু প্রাচীন চীনা নথিতেও খ্রিস্টপুর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে পদবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে জার্মানী সহ পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশ ও মধ্য এশিয়ার পারস্যে আধুনিক পদবীর প্রচলন শুরু হয়। তার আগে বাইজ্যান্টাইন সভ্যতা ও আনাতোলিয়া অঞ্চলের ‘তাতার’ জাতিরা সামাজিক সম্মানের সাথে যুক্ত কিছু পদবী ব্যবহার করত, কিন্তু তা খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে ও স্বল্প পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল

সনাতন ধর্মেও কোনও পদবী ছিলনা, শ্রীকৃষ্ণ, পান্ডব, কৌরব বা শ্রী রামচন্দ্রও পদবীহীন; স্বর্গের দেবতা বা দানবেরাও পদবীহীন। কালিদাস, বরাহমিহির, শঙ্কু, বেতালভট্ট, ধন্বন্তরি প্রমুখদেরও কোনো পদবী নেই। বৌদ্ধদেরও সেভাবে কোনো পদবীর ইতিহাস নেই। খ্রিষ্টানদেরও মধ্যযুগের আগে পদবী নেই, একক-দ্বিতীয়-তৃতীয় বা ততোধিক শব্দদ্বারা নামই বোঝানো হত। প্রাচীন ইহুদী জাতিদের মাঝেও পদবীর চল ছিলনা, ছিলনা মেসোপটেমিয়া বা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাতে

পদবীর উদ্ভব ঘটে মূলত প্রায় ৮০০ বছর আগে, সেন রাজবংশের অধীনে। তখনই বাংলায় জাত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উচ্ছেদ করে ব্রাহ্মণবাদ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়  প্রাচীনকালে শুধু নাম ও বাবার নাম ছিলো বল্লাল সেনের সময়কালে বাংলায় ধর্মান্তরকরণ ও জাতের গুরুত্ব বাড়ানো হয় এবং এর সঙ্গে সমাজে বিভিন্ন পেশাগত ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পদবীর প্রচলন শুরু হয় 

 

ইসলামেও পদবীর কোনও চল ছিলনা। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর যুগেও পিতার পরিচয়ে বা স্থানের পরিচয় দিয়ে মানুষকে নির্দিষ্ট করা হত। ইসলামের প্রবক্তা খোদ নবীজির নাম হচ্ছে- ‘আবু আল-কাসিম মুহাম্মদ ইবনে ʿআবদুল্লাহ ইবনে ʿআবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম’; এখানে আবু আল কাশিম মুহাম্মদ হচ্ছে ওনার পুরো নাম, আবদুল্লাহ হচ্ছে ওনার পিতার নাম, আব্দুল মুত্তালিব হচ্ছেন ওনার দাদুর নাম ও দাদুর পিতার নাম হাশিম। এই হচ্ছে তৎকালীন নামের সিস্টেম

ইসলামিক নামে পিতার পুত্র বোঝাতে বিন শব্দটা ব্যবহৃত হয়, তেমনই ‘ইবনে’ দ্বারাও পুত্র বোঝানো হয়। বাংলাদেশী ক্রিকেটার ‘মাশরাফি বিন মুর্তাজা’ মানে মুর্তাজার পুত্র মাশরাফি। অনেক দেশে ‘ইবনে’ দ্বারা মায়ের পুত্রও বোঝানো হলেও, ‘বিন’ দ্বারা শুধুমাত্র পিতার পুত্রই বোঝানো হয়। যীশু খ্রিষ্টকে ইসলামে ‘ঈশা ইবনে মরিয়ম’ অর্থাৎ মরিয়মের পুত্র ‘ঈশা’ নামে ডাকা হয়। তেমনই ‘বিনতে’ দ্বারা পিতার মেয়েকে বোঝানো হয়, যেমন ‘ইবনুল’ দ্বারা মায়ের মেয়েকে বোঝানো হয়

যেমন, আমার নাম তন্ময়, পিতার নাম সামসুল হক ও আমার বড় মেয়ের নাম মিঠি। এক্ষেত্রে আমার নাম লেখা হবে ‘তন্ময় বিন সামসুল হক’ কিম্বা ‘তন্ময় ইবনে সামসুল হক’। আমার মেয়ের নাম সেই হিসাবে হওয়া উচিৎ ‘মিঠি বিনতে তন্ময় বিন সামসুল হক’। মিঠির মায়ের নাম রুমি, সেক্ষেত্রে মিঠি মায়ের পরিচয় দিতে গেলে লিখবে – ‘মিঠি ইবনুল রুমি’

ইসলামে ধর্মীয় শব্দ বা প্রতিশব্দ নামের সাথে জুড়ে পদবী হিসাবে ব্যবহারের চল ভীষণ জনপ্রিয়, তারসাথে রয়েছে নবী (সাঃ) এর নাম-উপনাম সহ তাঁর অনুচর ও বংশধরেদের নাম যুক্ত করা। বিভিন্ন খলিফা, সুলতান, সম্রাটদের- নিজেদের জন্য ব্যবহৃত ‘রাজকীয়’ উপাধির ব্যবহার রয়েছে পদবী হিসাবে। এছাড়া রাজা-নবাব-সুলতানদের দ্বারা দেওয়া বিভিন্ন উপাধির পরম্পরার সাথে জুড়ে গেছিল পেশাগত পরিচয়, যা কালক্রমে পদবীতে পরিণত হয়েছে। তেমনই কিছু উপাধি বিষয়ে জেনে নেওয়া যাক-

· মুহাম্মদ বা মহম্মদ বা মোহাম্মদ- এটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে নবীর (সাঃ) নাম নিজের নামের সাথে জুড়ে নেওয়া। মহঃ যার short form.

· আহমেদ, আহম্মদ বা আহমদঃ নবীর (সাঃ) এর অপর একটি নাম ছিল আহমদ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘প্রশংসিত’। অনেকেই নবী (সাঃ) এর সাথে সম্পৃক্ততার স্বার্থে নামের শেষে এটা জুড়ে পদবী বানিয়ে নিয়েছেন

ইসলাম- ইসলাম ধর্মালম্বী বোঝাতে নামের শেষে ইসলাম লেখাটাও পদবী হিসাবে ভীষণ জনপ্রিয়

· আলী- নবীর (সাঃ) জামাতা, আলী (রাঃ) এর নামকে নিজের নামের সাথে জুড়ে নেয় অনেক মুসলমান, বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা। শিয়া শব্দের গোটাটা হচ্ছে ‘শিয়াতুল আলী’ অর্থাৎ আলীর অনুগামী

· হাসান- আলী (রাঃ) এর পুত্র ও নবী (সাঃ) এর দৌহিত্র হাসান (রাঃ) এর নাম নিজের নামের সাথে জুড়ে নেওয়ার চল অতি পরিচিত

· হোসেন বা হুশেন বা হুশাইন- হাসানের অনুরূপ

· উল্লাহঃ এটি একটি আরবি বিশেষণ পদ, যা বিভিন্ন নামের শেষে জুড়ে আলাদা আলাদা অর্থ সৃষ্টি করে। বিশেষত আল্লাহর অনুগ্রহের অধিকারী বোঝাতে এই শব্দ পদবীতে ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে

· আবদুল্লাহ- অনেকেই নামের আগে পিছনে এই শব্দ ব্যবহার করেন। আবদ ও আল্লাহ দুটি আলাদা শব্দ, ‘আবদ’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘দাস বা ভৃত্য’; একত্রে যার অর্থ ‘আল্লার ভৃত্য’

· আবুল- আবুল শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ পিতা, কারো নাম ‘আবুল বাসার’, মানে তিনি বাসারের পিতা

· উল, উর, উজ, উদ ও উস- এগুলিও আরবি অব্যয়সূচক শব্দ, যা নামের মূল ধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে একটি আলাদা শব্দ তৈরি করে

· আল- অনেকের নামের মধ্যম শব্দ বা পদবীতে আল শব্দ দেখা যায়, এটি একটি আরবি প্রত্যয় মূলক শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সুনির্দিষ্ট বা একমাত্র’, যা আল্লাহকে বোঝায়

· রহমান- এই শব্দের আক্ষরিক বাংলা প্রতিশব্দ ‘ভাগ্যবান’, ‘আল্লাহর করুণাপ্রাপ্ত’ বোঝাতে রহমান শব্দ নামের সাথে জুড়ে দেন অনেকে

· সৈয়দ- নবী (সাঃ) এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) এর বংশধরেদের সৈয়দ বলা হয়। তাদের বংশের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে সৈয়দ পদবী ব্যবহৃত হয়ে থাকে

· শেখ- এটা নিয়ে নিচে বিশদে রয়েছে, যেহেতু আমাদের পদবী সেখ, উচ্চারণ ভেদে শেখ বা শাইখ

· উদ্দিন- আরবি শব্দ ‘আদ-দ্বীন’ থেকে উদ্দিনের আবির্ভাব; যার বাংলা প্রতিশব্দ- ‘সত্য ধর্মের অনুসারী’

· মীর- আরবি শব্দ আমীর এর অপভ্রংশ থেকে মীর শব্দের উৎপত্তি। হায়দ্রাবাদের নিজামদের পদবী ছিল মীর, যা রাজকীয় উপাধি ‘পরিচালক’ বোঝাতে ব্যবহৃত হত। অনেক পণ্ডিতের মতে ফার্সি শব্দ পীরের অপভ্রংশ থেকে মীরের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। যার বাংলা প্রতিশব্দ- শ্রেষ্ঠ

· আনসারী- আনসারের বাংলা প্রতিশব্দ ‘বন্ধু ও সাহায্যকারী’। মক্কায় নতুন ধর্ম ‘ইসলাম’ প্রচারের সময় সেখানকার মানুষদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) মদীনাতে আশ্রয় গ্রহণ করেন, যাকে হিজরত বলা হয়। সেই সময় যে সকল মদীনাবাসিরা নবী (সাঃ) ও তাঁর অনুচরবর্গদের সহযোগিতা করেছিলেন, তাদের ‘আনসারী’ বলা হয়। তাদের ওই পবিত্র কাজের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে অনেকে নিজের নামের সাথে আনসারী শব্দ জুড়ে নিয়েছেন

· গাজী- আরবিতে ‘গজওয়া’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে যুদ্ধ, যুদ্ধে জয়ী বীরকে বলা হয় ‘গাজী’

· শাহীদ- যিদি যুদ্ধে বীরত্বের সাথে মৃত্যু বরণ করেন তাদের শাহীদ বলায় হয়

· চিশতী- এটি একটি ফার্সি শব্দ, যা সুফি ঘরনার। এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘প্রেম ও সহনশীলতা’

· ফকির- এটিও একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সর্বস্ব ত্যাগী সন্ন্যাসী’। নিজেকে রিপুর উর্ধ্বে বোঝাতে অনেকে এই পদবী ব্যবহার করতেন, যে পরম্পরা আজও চলে আসছে

· মোল্লা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘পরিপূর্ণ জ্ঞান বিশিষ্ট মহাপন্ডিত’

· মিয়াজী- মূল ফার্সি শব্দ ‘মিঞা’ যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘মহাশয়’, আর জী হচ্ছে আমাদের উপমহাদেশে উর্দু ও হিন্দিতে মানুষকে ডাকার একটা পদ্ধতি, এই দুই মিলে মিয়াজী

শরীফ- শরীফ আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘ভদ্র’ ও ‘পবিত্র’। নিজেকে ভদ্র হিসাবে জাহির করতেই এই পদবীর উদ্ভব

 

· শাহ্‌- বেদের সমসাময়িক গ্রন্থ, পারসিক ‘জিন্দা-আবেস্তা’ গ্রন্থে আবেস্তীয় ভাষায় রাজাকে বলা হয় ‘Xšâyathiya’ যা সংস্কৃতের ‘ক্ষত্র’ শব্দের সাথে ভীষণ রকমের মিল; ক্ষত্র মানে সমরশক্তি। পার্শিয়ান ‘Xšâya’ শব্দটিকে পারশ্যের রাজারা নিজেদের নামের সাথে জুড়ে দিতেন নিজেকে রাজা বোঝাতে। সেখান থেকেই শাহ্‌ পদবীর উদ্ভব। পরবর্তীতে এটা একটা জনপ্রিয় পদবীতে রুপান্তরিত হয়ে যায়

· খাজা- খোয়াজা বা খাজা শব্দটিও ফার্সি শব্দ। যার বাংলা প্রতিশব্দ বহুল ভাবে ব্যবহৃত আছে ফারসি সাহিত্যে, ‘সম্মানী, ধনী, গুরু, জ্ঞানী, শক্তিশালী, স্বামী অথবা দুঃখহরণকারী’ ইত্যাদি বোঝাতে ‘খাজা’ উপাধি প্রদান করা হত শাসকদের দ্বারা, আর সেখান থেকেই পদবীতে স্থান করে নিয়েছে শব্দটি

· ফরাজি- এই শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘হুবহু’ বা ‘অবিকল’। ইসলামের শুরুর দিকে প্রারস্য প্রদেশে যারা অবিকল আরবের মত করে বা কোরানের কপিবুক স্টাইলে অনুসরণ করত তাদের ‘ফরাজি’ বা ‘ফরাজী’ বলা হত। যা পরর্তীতে পদবীতে রুপান্তরিত হয়

· সিদ্দিকী- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সত্যবাদী’। নবী করিমের (সাঃ) ঘনিষ্ট বন্ধু তথা অনুসারী সাহাবী, শ্বশুর তথা আয়েষা (রাঃ) এর পিতা ‘আবু বকর সিদ্দিকি’ এর নামের সাথে জুড়ে থাকার জন্য অনেকে এই শব্দকে নামের সাথে পদবী হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন

· পাশা- প্রাচীন তুরস্কের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের ‘পাশা’ উপাধি দেওয়া হত

· বেগ- এটি মূলত একটি মঙ্গোল শব্দ, যা মঙ্গোল সেনাপ্রধানদের উপাধি ছিল। পরবর্তীতে পারস্যের সেলজুক সাম্রাজ্যে মঙ্গোল আক্রমণ হলে তাদের আধিপত্য বিস্তার লাভ করে; এরও পরে অটোমান সাম্রাজ্যে সময়কালে তৎকালীন সুলতানেরা বিভিন্ন স্থানীয় যাযাবর গোত্রপ্রধান, সেনা অধ্যক্ষ, ও শাসনকর্তাদের ‘বেগ’ উপাধি প্রদান করতেন। বেগের স্ত্রী লিঙ্গ হল বেগম

· মির্জা- আরবি শব্দ আমীর এর বাংলা প্রতিশব্দ হল নেতা, আমিরের যে পুত্র তাকে মির্জা উপাধি দ্বারা সম্মানিত করা হয়। মূলত মঙ্গোল শাসক তৈমূল লং- তার পুত্র ও বংশধর দের জন্য মির্জা পদবীর ব্যবহার ব্যপক হারে শুরু করেন, যার বাংলা প্রতিশব্দ রাজপুত্র। যার জন্য আরবিতে আমীর শব্দ দেখা গেলেও মির্জা শব্দ নেই

· রেজা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘তৃপ্তি’। আল্লাহর প্রেমে পরিতৃপ্ত বোঝাতে রেজা শব্দ পদবীতে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে

· সুলতান- তুরস্কে রাজা বোঝাতে সুলতান শব্দ ব্যবহৃত হয়, যেমন রাজার ইংরাজি প্রতিশব্দ King, তেমনই রাজার তুর্কি প্রতিশব্দ ‘সুলতান’

· খাতুন- মঙ্গোল শব্দ ‘খাং’ এর স্ত্রীবাচক ‘খাওয়াতিং’ শব্দ যখন সেলজুক সাম্রাজ্য হয়ে তাতার যাযাবরদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় তখন তা তাতারদের উচ্চারণে ‘খাতুন’ শব্দে রুপান্তরিত হয়ে তুর্কি শব্দমালায় জাইগা করে নিয়েছিল। খানম ও খাতুন একই শব্দের ভিন্ন রূপ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘রাজরানী’

· বিবি- এটি একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘আরামবিলাসি সুন্দরী নারী’

· নাহার- এটি একটি আরবি শব্দ যার প্রতিশব্দ ‘দিবস’ বা ‘উজ্জ্বল’। নিজেকে দিনের মত উজ্জ্বল বোঝাতে এই শব্দ নামের শেষে পদবী হিসাবে ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়

· বেগম- বেগের স্ত্রী লিঙ্গ বেগম

· আরা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার প্রতিশব্দ ‘সৌন্দর্য’

· বেওয়া- মুসলমান বিধবাদের ‘বেওয়া’ বলা হয়ে থাকে, যা একটি ফার্সি শব্দ। এর আভিধানিক বাংলা প্রতিশব্দ – ‘অসহায়’

· হাজী- যারা হজ্ব করেছে এসেছে, অর্থাৎ আরবের মক্কা শহরে গিয়ে বিধি অনুযায়ী ধর্মীয় রীতি পালন করেছেন তাকে হাজী বা হাজ্বী বলা হয়। প্রতিজন হজ্ব সম্পন্নকারীকেই হাজী নামে ডাকা হয়, যদিও পারিবারিক সুত্র এটাকে কেউ কেউ পদবী হিসাবেও ব্যবহার করে থাকে

· লায়েক- লায়েক একটি আরবি শব্দ, যার প্রতিশব্দ যোগ্য

· হক- আমার নামের অংশ বলে তা আলাদা করে নিচে দেওয়া আছে বিশদে

 

· আলম- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘বিশ্ব বা পৃথিবী’। নামের শেষে বিশেষণ হিসাবে পদবীতে যুক্ত হয়

· ইরানী- সোজা অর্থে, নিজেকে ইরাণ জাত বোঝাতে এই পদবীর ব্যবহার

· মাদানী- মদিনার মানুষদের মাদানী বলা হয়, যেমন আমরা বাংলার মানুষ বাঙালী। অনেকে যারা মদিনায় পড়াশোনা করেন, তাদের মাঝে মাদানী পদবী ব্যবহারের চল রয়েছে

· মওলানা- আরবিতে ‘মওলা’ শব্দের প্রতিশব্দ ‘অভিভাবক বা প্রভু বা মালিক’। ‘আনা’ মানে আমি, দুটো একত্রে হয় ‘মালিক ও আমি’। মালিক বা প্রভুর অধীনস্থ যেকোনো ব্যাক্তিকেই মাওলানা বলা যেতে পারে। যদিও বর্তমানে ইসলামিক মাদ্রাসা, মক্তব, (বিদ্যালয়), জামিয়া (বিশ্ববিদ্যালয়) এর যারা অধ্যক্ষ বা প্রিন্সিপ্যাল তাদের ‘মাওলানা’ উপাধিতে ডাকা হয়ে থাকে। তাই অনেকে মাওলানা শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘জ্ঞানী’ বলে থাকলেও- কোরান বা হাদিসের কোথাও কোনও পণ্ডিতকে সম্বোধন করতে ‘মাওলানা’ শব্দের ব্যবহার নেই। পারস্যের পন্ডিতদের আমদানি করা এটা একটা আরবি অপভ্রংশ, যা কালক্রমে ভীষণ জনপ্রিয় প্রত্যয় মূলক পদবী হিসাবে প্রচলিত রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইরাণে

· মুফতি- ইসলাম শাস্ত্রের আইনগত সকল বিষয়ে যিনি বিশেষভাবে পারদর্শীও সুপণ্ডিত তাকে মুফতি উপাধিতে ডাকা হয়। যা অনেকের পদবী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কোরানের যে শরিয়তি সংবিধান তার ‘ব্যারিস্টার’ সম ডিগ্রী হল মুফতি

· কাজী- কাজী মানে বিচারক বা জাজ; যিনি কোরানে বর্নিত আল্লার হুকুমকে সমাজে প্রতিষ্টিত করেন খলিফার নির্দেশে। এটাই পরে পদবী হয়ে যায়

· হাফিজ- পবিত্র কোরানের দাঁড়ি, কমা, কোলন, সেমিকোলন, উচ্চারণ অবিকল হুবহু বজায় রেখে ক্রমান্বয়ে ৩৩৮৬০৬ শব্দের তথা ৭৭৯৩৪ টি বাক্যের পুস্তককে যা ১১৪ টি অধ্যয়ে বিভক্ত, অবিকৃতভাবে সম্পুর্ন মুখস্ত করে ফেলেছেন ও যে কোন সময় তা নির্দিষ্ট সুরে পাঠ করতে পারেন- তাকেই হাফিজ উপাধি দান করা করা হয়

· মৌলভী- এটিও একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘অধ্যাপক’

· খোন্দকার- এটি একটি ফার্সি শব্দ, খোন্দ শব্দের প্রতিশব্দ ‘পড়া’ ও কার শব্দের প্রতিশব্দ ‘কারী’ বা যিনি করান। অর্থাৎ শিক্ষক বোঝাতে খোন্দকার শব্দ পদবীতে জুড়ে দেন অনেকে

· দেওয়ান- এটিও একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ খাজনা আদায়কারী। বর্তমানে যারা Income Tax বা GST দপ্তরে চাকুরি করেন, সকলেই দেওয়ান

· নিয়াজী- নিয়াজ শব্দতি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘প্রিয়’। আর যিনি প্রিয়তম তাকে নিয়াজী বলে সম্মানিত করা হয়ে, এক্ষেত্রে যিনি আল্লার প্রিয়তম তিনিই নিয়াজী

· চৌধুরী- এর আক্ষরিক মানে একটা নির্দিষ্ট সীমানার চারিদিকের মালিক। ভূস্বামীদের বোঝাতে এটা উপাধি হিসাবে ব্যবহৃত হত, যা কালক্রমে পরবীতে পরিণত হয়েছে

· তালুকদার- তালুকও ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সম্পত্তি’। যারা তালুকের মালিক তাদের নামের শেষে এই উপাধি জুড়ে দেওয়া হত, যা পদবীতে পর্যবাসিত হয়েছে

· ভুইঞা- ভুঁই এর মালিকদের ভূঁইয়া বলা হত। ভুঁই শব্দটা ফার্সিজাত যার বাংলা প্রতিশব্দ- জমি

· মজুমদার- ফার্সি শব্দ ‘মহজৌম’ থেকে মজুম শব্দের উৎপত্তি। যে সকল ভূস্বামীর অধীনে একাধিক মৌজা থাকত, তাকে মজুমদার উপাধিতে ডাকা হয়

· খাসনবীস- নবাব বা সুলতানের ব্যাক্তিগত সচীবের উপাধি ছিল এই শব্দ

· জমাদার- আরক্ষা বাহিনীর সাথে যুক্ত পদস্থ কর্তাদের ‘জমাদার’ বলে সম্মানিত করা হত

· মণ্ডল- এটি সংস্কৃত অপভ্রংশ থেকে উৎপত্তি হওয়া একটি শব্দ, ভারতীয় উপমহাদেশেই এই ধরনের পদবি দেখা যায়, যার বাংলা প্রতিশব্দ মীমাংসাকারী। মোড়ল মণ্ডলেরই অপভ্রংশ। যদিও মণ্ডল শব্দের আক্ষরিক প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘গোলাকার স্থান বিশিষ্ট নির্দিষ্ট পরিধি’ যুক্ত এলাকা। ভারতীয় উপমহাদেশে সভা সমিতিগুলো গোলাকার ভাবেই বসত, আর সেই সভার সভাপতিত্ব যিনি করতেন তাকেই মূলত ‘মণ্ডল’ নামে ডাকা হয়। বস্তুত মণ্ডল, নন্দী, ভুইঞা বা চৌধুরী ইত্যাদি গুলো এলাকা ভেদে সবই প্রতিশব্দ

 

· মাতব্বর- মণ্ডলের অনুরূপ

· মল্লিক- আরবি শব্দ ‘মালিক’ থেকে ‘মল্লিক’ শব্দের উৎপত্তি। ইসলামিক শাসনাকালে যে সকল ব্যাক্তিরা পুঁথি, দলিল, দস্তাবেজ ইত্যাদির দারুণ ভাবে নকল করতে পারতেন তাদের মল্লিক উপাধি দেওয়া হত। ফার্সি শব্দে ‘মলিক’ হল জোতদারদের উপাধি বিশেষ

· মুন্সী- এই শব্দটিও ফার্সি, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘সচিব’। ব্রিটিশ ভারতে ভাষাবিদ, লেখক, উচ্চপদস্থ করণিক ও ঠিকাদারদের মুন্সী উপাধি দানের প্রচলন ছিল

· মৃধা- মিরদাহ’ নামক কামানের গোলা বিষয়ে পারদর্শী মানুষদের মৃধা পদবী দান করা হত নবাবী আমলে

· বিশ্বাস- নবাবের আস্থাভাজন কর্মচারিদের এই উপাধি দান করা হত

· কানুনগো- নবাবী আমলের ভূসম্পত্তি বিষয়ে বিশারদ ব্যাক্তিকে এই উপাধি দান করা হত

· লস্কর- সৈন্যদলে বা জাহাজে চাকুরিকরা কর্মচারীদের লস্কর নামে ডাকা হত

· বাছার বা বাশার- সর্বশ্রেষ্ট মানব’ অর্থে নবী (সাঃ)কে বোঝাতে ‘বাশার’ শব্দ ব্যবহৃত হয়, যা বাঙালীর অপভ্রংশ হিসাবে ‘বাছার’ পদবীতে রুপান্তরিত হয়েছে

· সরকার- এটি একটি ফার্সি ভাষা, রাজকার্য পরিচালনার সাথে যুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরকার উপাধিতে ডাকা হত, সেই থেকেই পদবীর চল

· সরদার বা সর্দার- সর’ একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ হুকুম। এই সর শব্দের সাথে কার, দার, জমিন, পঞ্চ ইত্যাদি হরেক প্রত্যয়মূলক শব্দ যুক্ত হয়ে আলাদা আলাদা বিশেষন যুক্ত শব্দ গঠিত হয়েছে। সরদার শব্দটিও হচ্ছে যিনি হুকুম প্রদান করেন এমন ব্যাক্তি। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি

· হাওলাদার- হাওলা’ শব্দটি ফার্সি যার প্রতিশব্দ জমি, দার শব্দের প্রতিশব্দ মালিক। জমিদারের একটা প্রতিশব্দ হাওলাদার

· শিকদার- আরবি শব্দ ‘শিক’ শব্দের প্রতিশব্দ খন্ড বা বিভাগ। একটি রাজত্ব বা জমিদারীর একটা অংশের ইজারাদারের উপাধি ছিল শিকদার

· ওয়াদেদ্দার- নবাবী আমলে যারা কর আদায়ে অসমর্থ ব্যাক্তির সম্পত্তি নিলাম করত

· দস্তিদার- নবাবী আমলে যারা দলিল, দস্তাবেজ, চিঠিপত্রের দেখভাল ও সংরক্ষণ করত

· কয়াল- নবাবী আমলে যারা দাঁড়ি পাল্লা নিয়ে মূলত ভুষিমালের ব্যবসা করত

· পোদ্দার- নবাবী আমলে যারা সোনা রুপার ব্যবসা করত

· নিয়োগী- নবাবী আমলে রাষ্ট্রকার্যে যে ব্যাক্তি নিয়োগ সংক্রান্ত কার্যের সাথে যুক্ত থাকতেন তাদের নিয়োগী নামে ডাকা হত

· চোঙাদার- বিভিন্ন সরকারী ফরমান, যারা গ্রামে গ্রামে চোঙা বা মাইক ফুঁকে জানান দিত

· জানা- নবাবদের জমিজমা যে সকল চাষারা দেখাশনা করত

· মহলানবিশ- নবাবী আমলে যারা সরকারী ফরমান লিখত

· পাটোয়ারি- নবাবী আমলে যারা জমি জাইগা কেনাবেচার দালালি করত তাদের পাটোয়ারি নামে ডাকা হত

· মাঝি- নৌ পরিচালনা ও মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যাক্তিদের মাঝি নামে ডাকা হত

· জোলা- তাঁতী পেশার মানুষদের এই নামে ডাকা হয়

· ঢালী- যুদ্ধক্ষেত্রে যে ব্যাক্তিরা ঢাল শস্ত্রে সজ্জিত থাকতেন তাদের ঢালী উপাধিতে ভুষিত করা হত

· মুস্তাফী- আরবি শব্দ মুস্তাফা শব্দের প্রতিশব্দ ‘প্রিয়’, নবাবের প্রিয় পাত্রদের মুস্তাফী উপাধি দান দেওয়া হত

· সানা- এটি একটি আরবি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘উচ্চতম মর্যাদাসম্পন্ন’। নবাব বা সুলতানের রাজসভার প্রিয়পাত্রদের এই উপাধি দান করা হত

· মিস্ত্রী- লাতিন শব্দ ‘maestro’ শব্দের প্রতিশব্দ কারিগর, যা মূলত সংগীতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও, গ্রীক ও রোমান শিল্পীরা যখন মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন স্থাপত্যকলার জন্য এসেছিল, পার্শিয়ান উচ্চারণে তারা ‘মিস্ত্রী’ হয়ে গিয়েছিল মঙ্গোল পূর্ববর্তী সময়ে। সেই থেকেই শিল্পীদের মিস্ত্রী উপাধিতে ভূষিত করার চল রয়েছে। প্রসঙ্গত আমাদের পুর্বপুরুষের পদবীও মিস্ত্রীই ছিল

এছাড়া বহু নাম এমন হয়, যেখানে আলাদা আলাদা শব্দ জুড়ে একজন ব্যাক্তিকে চিহ্নিত করা হয়, যেমন- ওয়াসিম আক্রম, ওয়াসিম জাফর, ইরফান হাবিব, প্রমুখ। বিশেষ করে শিয়া’রা তাদের নামের সাথে আলী (রাঃ) বা তাঁর পুত্রদ্বয় হাসান (রাঃ) ও হোসেন (রাঃ) এর নাম মধ্যনাম তথা middle name হিসাবে জুড়ে দেন। যেহেতু ভারতে ইসলামটা এসেছে পারস্য হয়ে, তাই ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামে পারস্য সংস্কৃতির ছাপ সবচেয়ে বেশি, মূল আরবি সংস্কৃতির চেয়ে

 

এবারে আসি খানেদের ইতিহাসে

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে জনপ্রিয় ধারণা হল চেঙ্গিস খাং হল একজন মুসলমান, ইতিহাস বিষয়ে মুর্খতা ও অজ্ঞতা যে পর্যায়ে পৌঁছালে এমন ভুল হওয়া সম্ভব; বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজের বিপুল অংশ সেখানেই পৌঁছেছে। চেঙ্গিস খাং এর জন্ম- চীনের ঠিক উপরের একটা দেশ মঙ্গোলিয়াতে, যেখানে আজকের এই ২০২০ সালেও মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ৩%। চেঙ্গিস খাং ছিল ‘টেং-রি’ দেবতার উপাসক, তার বর্বরতা যাদের উপরে নেমে এসেছিল তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান ও খ্রিস্টান। বস্তুত ইহুদী ও মুসলমানেদের প্রকৃত মানুষ বলেই মানতনা চেঙ্গিস খাং। তার মতে এই দুই ধর্মগোষ্ঠীর লোকেরা হচ্ছে জন্মগত ‘দাস’, অতএব দাসেদের দিয়ে যা খুশি করানো যায় এমন মতই পোষণ করতেন। এমনকি মঙ্গোলদের যে ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সামগ্রী, তা মুসলমানেদের জন্য নিষিদ্ধ করেছিলেন চেঙ্গিস, কারন দাসেরা প্রভুদের খাবার খাওয়ার মত সম্মানের অধিকারী নয়

চীনাদের অন্যান্য নাম যেমন তুং, পিং, লিং, সাং, মুং ইত্যাদির মত চেঙ্গিস তথা জিংগিস খাং ও হচ্ছে বিশুদ্ধ ‘মেড ইন চায়না’ প্রডাক্ট (আসলে মঙ্গোলীয়া)। চেঙ্গিস খাং এর শত শত পুত্র থাকলে, স্বীকৃত জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম ছিল ‘যোচী খাং’, তিনিও ওই টেংরি ধর্মের অনুসারী ছিলেন, কিন্তু চেঙ্গিস খাং এর নাতি ‘বির কাই খাং’ এক মুসলমান যাযাবর দলের চরমা সুন্দরী স্ত্রীকে জবরদস্তি তুলে এনে বিয়ে করেন বুখারা প্রদেশে। পরবর্তিতে এই রমণীর প্রভাবেই ‘বির কাই খাং’ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ও আজারবাইজানে থিতু হয়। এভাবেই মিশরের তৎকালীন মামলুক শাসকদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে ইসলামিক সংস্কৃতি সৌহার্দের বিনিময়ে, ও বিপুল সংখ্যক মঙ্গোল সেনা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়। মঙ্গোলদের দল তিনটি আড়াআড়ি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়; বির কাই খাং এর দল, চেঙ্গিসের অন্য ছেলের দরুন নাতি ছাগতাই খাং এর দল ও চেঙ্গিসের আরেক ছেলের পক্ষের নাতি হলাগু খাং এর দল। টেং-রি ধর্মের অনুসারী হলাগু খাং তৎকালীন ইসলামিক শিল্প সংস্কৃতির পীঠস্থান বাগদাদের উপরে হামলা চালিয়ে গোটা শহরকে ধুলিস্যাত করে দিয়েছিল

এর জন্য মুসলমান হয়ে যাওয়া ‘বির কাই খাং’, হলাগুকে নিজের মঙ্গোল সেনাদল থেকে বহিষ্কার করে দেশে ফিরত পাঠায়, সাথে তার আরেক সহযোগী কিটবুক খাং কেও। কিন্তু দেশে ফিরে কুবলাই খাং কে হাত করে বির কাই খাং এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় ও পরে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করে হলাগু। প্রথম দিকে ‘বির কাই খাং’ মোঙ্গলের তলোয়ারে আরেকটা মোঙ্গলের রক্ত ঝড়ুক এটা চাননি, কিন্তু হলাগু ‘বির কাই’ এর ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষোভে অন্ধ হয়ে আক্রমনের তিব্রতা ক্রমশ বাড়ালে ‘বির কাই খাং’ এর ভাগ্নে ‘নোগাই’ হলাগুকে হত্যা করে

দীর্ঘদিন এই খাং বংশ রাজত্ব করেছিল মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ন অঞ্চলে, এবং এরা ইসলাম ধর্মাবলম্বী হয়ে যাওয়ার দরুন তুর্কি, আফগানী ও ইরানি মেয়েদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। রাজক্ষমতার সাথে যুক্ত এই পদবী কালক্রমে তাতার, তুর্কি, আফগান, ইরানী ও পামিরীয় স্তেপ অঞ্চলের যাযাবরদের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে আভিজাত্যের নিদর্শন হিসাবে, যা আজকের দিনের সালমান খান, শাহরুখ খানের মধ্যমে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে

আজকের চীনেও ঐতিহ্যবাহী চীনা ভাষায় ‘কান’ (Kan) অতি পরিচিত একটি পদবী, যা মন্দারিনে উচ্চারণ করে ‘Gan’ক্যান্তনেসি, হোক্কান, মিন্নান ও কুয়েনঝ্যাং নামক চীনা ভাষা গুলিতে ওই চেঙ্গিস খাং এর ‘খাং’ পদবীকে ‘জিয়ান’ বলে উচ্চারণ করা হয়, যা ডোরেমন নামক কার্টুন চরিত্রে নোবিতা, সোনিওর সাথেই সমান জনপ্রিয় চরিত্র। জাপানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এই খাং ‘কান-জি’ উচ্চারণে রুপান্তরিত হয়েছে কালক্রমে। যেমন ওলন্দাজ, সাইবেরীয় ও ডায়েসল্যান্ডে তা ‘কান’ (Kann বা Kan) নাম নিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছে

 

তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদীরা যখন খাং পদবীর মালিক হল সাম্মানিকতা স্বার্থে, তাদের হিব্রু ভাষায় সেই খাং উচ্চারণ বদলে গেল ‘কোহেন’ এ। গোজোসিয়ন যুগে যে চীনা দলটি আরো পুর্ব অভিমুখে যাত্রা করেছিল তাদের নাম ছিল ‘হাঞ্জা’, এরা ওই খাংকেই অপভ্রংশ করে ‘কোরেং’ উচ্চারনে ডাকত, যা থেকে আজকের কোরিয়া নামের উৎপত্তি বলে ধারনা করেন একদল ইতিহাসবিদ

প্রসঙ্গত ইসলামের শুরুর যে ইতিহাস ও কোরান হাদিসের যে রচনা কাল সেখানে কোনো খান পদবীধারী ব্যাক্তির উল্লেখ নেই, এখান থেকেও প্রমাণিত হয় যে আজকের খান কোনো ইসলামিক – আরবি সংস্কৃতি নয়, বরং তা বর্বর মঙ্গোল নেতা চেঙ্গিস খাং এর আভিজাত্যের পরিচায়ক। যার পরবর্তী বংশধরেরা ইসলামের শত্রু থেকে ইসলামে সম্পৃক্ত হয়েছিল

এই হল খান পদবীর শিকড়ের সন্ধান

ভারতীয় যে মুঘল সাম্রাজ্য, তা সরাসরি মঙ্গোল চেঙ্গিস খাং ও তৈমুর লং এর বংশ থেকে উদ্ভূত। মঙ্গোল শব্দের ফার্সি অপভ্রংশ হল মুঘল। ভারতীয় রাজপুতেরা নিজেদেরকে সগৌরবে সূর্য্যবংশী, চন্দ্রবংশী, অগ্নিবংশী, যুগবংশী হিসাবে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করলেও ইতিহাস হচ্ছে ‘হুন’ জাতি তৎকালীন শতদ্রু নদী অঞ্চলে আক্রমণ শানালে বহু সংখ্যক পুরুষকে হত্যা করে ও নারীদের গর্ভবতী বানিয়ে দেয় সৈনিকেরা, যা প্রায় প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই করত। গুর্জর নারী ও হুন সেনাদের সংমিশ্রণে নতুন যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই রাজপুত

আমার নামের প্রথমাংশ অর্থাৎ ‘তন্ময়’ শব্দটি একটি বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘মনোনিবেশ, মগ্ন বা একাগ্রচিত্ত’; প্রক্ষান্তরে বলা যেতে পারে ‘যা বস্তুনিষ্ঠ নয়, বরং আত্মিক দশা’। পদবী ‘হক’ আবার একটা ফার্সি শব্দ, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘ ন্যায্য দাবী, সত্য, বা যথার্থ’। আকিকা’র সময় আর একটা নাম রাখা হয়েছিল, যা কালক্রমে হারিয়ে যায় নথিতে না থাকার কারনে- সেটা ছিল সেখ জিয়াউল হক। সেখ বা শাইখ হল একটা আরবি শব্দ, যা বিভিন্ন গোত্রপতিদের আভিজাত্য ও ক্ষমতার নিদর্শন স্বরূপ ‘উপাধি’ বিশেষ; যা খ্রিস্টান, ইহুদী বা পৌত্তলিক (মুর্তি পূজারী) সহ যে কেউ প্রভাবশালী ব্যাক্তি হলেই তাকে শাইখ নামে ডাকা হয় প্রাচীন আরবে, যে চল আজও বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে ‘সেখ বা শাইখ’ ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পরিচয়জ্ঞাপক পদবীতে রুপান্তরিত হয়েছে। এবারে ‘জিয়াউল’, এর মানে ‘জ্যোতি’। আরবিতে জিয়া বা দিয়া, দুটো শব্দের প্রতিশব্দই আলো

আমাদের বংশের আদি পদবী হচ্ছে মিস্ত্রী, বিভিন্ন দস্তাবেজ ঘেঁটে লিখিত তথ্যে যা পাওয়া যায় সেই অনুযায়ী আমার উর্ধ্বতন পুর্বপুরুষের নামগুলো হচ্ছে-

  •  সেখ মোহাম্মদ সামসুল হক (আমার পিতা)
  •  সেখ ফজলুল হক
  •  সেখ নাকিবুদ্দিন হক মিস্ত্রী
  •  সেখ বাবুলাল মিস্ত্রী
  •  সেখ আমিন মিস্ত্রী
  •  সেখ হানিফ মিস্ত্রী
  •  সেখ আলি হোসেন মিস্ত্রী
  •  সেখ ইফতিকার মিস্ত্রী

ইফিতিকার মিস্ত্রীর পূর্বের কোনো পুরুষের লিখিত ইতিহাস নেই। ইতিহাসের পথে পদবীর অন্বেষণ যাত্রা এ দফায় এটুকুই


বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমান ~ ১



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ নারকীয় ধ্বংস যজ্ঞ পর্ব

প্রথম কিস্তি

আমাদের দেশের সবচেয়ে বিচক্ষণ ব্যক্তি বোঝাতে চালু উপমাটা হলো- ‘চাণক্য’; যার কূটনীতি দিয়ে ২৩৪ বছরের একটা সাম্রাজ্য মেয়াদী হয়েছিল, অথচ যে কূটনীতি দিয়ে প্রায় হাজার বছরের ইসলামিক শাসনের ইতিহাস, তাদের নাকি কোনো জ্ঞানীগুণী, বিচক্ষণ ব্যক্তিই ছিল না; সকলেই হিংস্র আর বর্বর ছিল। এ লজ্জা মুসলমানেদের নিজেদের একান্ত লজ্জা। মনুবাদীরা ২০০০ বছরের পুরাতন মনীষীকে আদর্শ হিসাবে খাড়া করতে পারে, তার গৌরবের ছটায় সকলে উদ্ভাসিত হয়। ইহুদীরা, খ্রিস্টানেরা হাজার বছরের গৌরবে গৌরাবান্বিত, আর মুসলমান সামান্য ২০০ বছর পিছনের অতীতকে সোজা কবরে চালান করে দিয়ে মুসলমানত্ব বজায় রেখেছে- লুঙ্গি, দাড়ি, সুরমা, আতর, বিরিয়ানি আর ‘বছর বিয়ানি’ খানকতক বিবি দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে। না এগুলো করার মাঝে দোষ কিছু নেই, কিন্তু অতীতকে না জানার প্রচেষ্টা, নিজেকে শিক্ষিত হওয়ার বাসনা থেকে দূরে রাখা ও প্রজন্মকে শিক্ষিত করার দায়বোধ না থাকা- শাস্তিযোগ্য অপরাধ; আর এই শাস্তিটাই ভারতের মুসলমানেরা ভোগ করছে সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা দ্বারা।

বাংলাদেশের দিকে নজর দিলে তো সেখানে অবস্থা আরও ভয়াবহ, তারা যে গত শতকের মধ্যভাগ পর্যন্তও ভারতেরই অংশ ছিল সেটাকে প্রায় ভুলিয়ে দিতে পেরেছে তাদের নব প্রজন্মকে। তারা যে একটা মহান ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সভ্যতার অংশ ছিল সেটা প্রাণপণে মুছে ফেলে বাঁচতে চাইছে, ইংরেজদের ভাগ করে দেওয়া পরিচয় বুকে আঁকড়ে, এদের ইসলামী পরিচয়ের সেই জোর নেই যা দিয়ে আরববিশ্বে ‘সহি মুসলমান’ হিসাবে স্বীকৃতি পাবে, অগত্যা গরুখোর ভারতবিদ্বেষী সারশূন্য জাতি হিসাবে বেড়ে উঠছে- ‘ইমাম মাহদির’ প্রতীক্ষাতে। এদেশে সঙ্ঘ পরিবার যেটা করেছে, বাংলাদেশেও উগ্র মৌলবাদী সংগঠনগুলো সেটাই করেছে, অতীত থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে; আর শিকড়হীন গাছ সামান্য ঝড়েই যেমন পড়ে যায়, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। এখন দেখতে সব ‘ওক্কে মামা’ লাগলেও তাদেরও দুর্দিন ঘনিয়ে আসবে, আর দুর্দিনের জন্য যে অন্য জাতি লাগে না, সেটা বাংলাদেশিদের চেয়ে ভাল আর কে বোঝে! পাকিস্তানিরাও মুসলমানই ছিল, যারা আম বাংলাদেশিদের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করত। ভারতের সেনাবাহিনীর সাথ না পেলে যে আজও পাকিস্তানিদের গোলামি করতে হতো সেটা তারা ভুলে গেছে। তাদের নেতারা ভারতকে শত্রু হিসাবে খাড়া করে দিয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে; আত্মবিস্মৃত জাতি হিসাবে এদেরও পতন অনিবার্য, না হলে ইতিহাসের মৌলিক সূত্রই বদলে যাবে।

পাকিস্তানের বিষয়ে প্রায় কিছুই জানি না, তাই তারা ঠিক কতটা নিজেদের অতীতকে ভুলেছে সে আলোচনা করার সুযোগ নেই। তাহলে দেখা গেল, ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার জন্য মনুবাদের প্রয়োজন নেই, ইসলামিক জামাতি মৌলবাদের দল হোক বা খ্রিস্টিও বা জায়নবাদীদের দল- ক্ষমতার চক্করে ইতিহাসকে হয় এরা ভুলিয়ে দেয় বা নতুবা বিকৃত করে; খোজা প্রজন্ম বাধ্য হয়ে পশ্চিমা ন্যাংটা সংস্কৃতির মাঝে নিজের আইডল খুঁজে ফেরে। চলুন আবার প্রবন্ধের বিষয়ে ফিরি-

সুমেরীয়, হুরিয়ান, ব্যাবিলনীয়, অসিরিয়ান, আক্কিডিয়ান, হিট্টিয়ান, মেদিয়ান, কার্থাগিনিয়ান, পার্থিয়ান ইত্যাদি সাম্রাজ্যের সমসাময়িক কোনো ভারতীয় সাম্রাজ্যের স্পষ্ট ঐতিহাসিক দলিল সম্বলিত উল্লেখ নেই ইতিহাসে। পারস্য সাম্রাজ্যের ইলামাইট সংস্কৃতি ও তৎপরবর্তী ফেনিসিয়া, আখমেনিড, সাসানিড প্রমুখ সাম্রাজ্যের সমসাময়িক কাল থেকে তৎকালীন ভারতের সামাজিক ইতিহাস নিয়ে দু’কলম লেখার মতো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। যদিও মধ্য এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকার মিশরীয় সাম্রাজ্য তো খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছরেরও বেশি পুরাতন, যার পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও রাজনৈতিক লিপিবদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। সেটা মিশরের আদিকালের থেনিস মেমফিস থেকে শুরু করে, পিরামিড কালের ‘খুফু, খাফ্রে, মেনকুরে’ ফ্যারাও হয়ে ‘সাক্কারার ডিজেসার’ হোক বা গিজার ‘গ্রেট স্ফিংস’– এদের ইতিহাস মোটামুটিভাবে অক্ষত প্রায়। এর পরবর্তীতে আমেনহোতেপ, রামোসিস, সিয়ামুন, ওসোরকোন হয়ে খ্রিস্টের জন্মের মাত্র কয়েক'শ বছর আগের নেকানতাবোর ইতিহাস পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ আছে।

...ক্রমশ

বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ ৩



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব


তৃতীয় কিস্তি

ভারতের ইতিহাস অতি সুপ্রাচীন। ধ্রুপদী ভারতীয় যে ইতিহাস তার সূত্রপাতের আগে প্লেস্তোসিন ও মেসোলিথিক যুগের তেমন বিশেষ ইতিহাস পাওয়া যায় না, তবে সেগুলো যে ছিল এই ভূখণ্ডে তার প্রমাণ রয়েছে কিছু ক্ষেত্রে। পরবর্তীতে প্যালিওলিথিক যুগেরও সামান্য কিছু ধ্বংসাবশেষ ওই যুগ সম্বন্ধে সামান্য ভাসা ভাসা ধারণার বেশি কিছু দিতে পারেনি। ১৯২৯ সালে ‘জারিস-মিডৌর’ মাটি খুঁড়ে মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার নিওলিথিক যুগের ভারতীয় সভ্যতা সম্বন্ধে অকাট্য প্রমাণ দাখিল করে; কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রেই সমাজব্যবস্থা সম্বন্ধে কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি, যার উপরে ভিত্তি করে তৎকালীন সামাজিক ইতিহাস রচনা করা যেতে পারে।

এর পরের ইতিহাসটা ব্রোঞ্জ যুগের, ‘ঘগগর হারকা’ নদী উপত্যকা অঞ্চলের সিন্ধু সভ্যতার। হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো, গানেরিওয়ালা, রুপার, ধোলাবীরা, লোথাল, কালিবঙ্গান, রাখিগড়ি ইত্যাদি স্থানে আবিষ্কৃত হওয়া হরেক ধ্বংসস্থান থেকেও ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতার প্রাচীনত্বতা বিষয়ে বলিষ্ঠ প্রমাণ রেখেছে, কিন্তু এখানেও সামাজিক গঠন কাঠামোর কোনো অকাট্য ইতিহাস নেই, যার কোনো লিখিত রূপ করা যেতে পারে।

লিখিত ইতিহাস যদি কোথাও থেকে শুরু হয়ে থাকে তাহলে সে সকলই বৈদোত্তর যুগের ইতিহাস। ‘অপৌরুষেয়’ ধারণার ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে এদেশে এসে পৌঁছায় আর্য জাতিরা, এর পরবর্তী যে সমাজব্যবস্থা সেখান থেকে সমাজের খুঁটিনাটি বিষয়ক ইতিহাস পাওয়া যায়, যাকে মোটামুটিভাবে বৃহদর্থে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলা যেতে পারে। ভাষাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান এবং জিনতত্ত্ব থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত সংশ্লেষণের মাধ্যমে অনুমান করা হয়, আর্যদের অনেকগুলো জাতি ভারতের দিকে এসেছিল এবং তাদের মাঝে বেশ কিছু প্রভেদও ছিল।

‘হিট্টিয়ান ও লুইয়ান’ ভাষাভাষী যে দুইটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান যাযাবর জাতি এসে পৌঁছেছিল, তারা ছিল শিকারি ও যোদ্ধাদের দল। দানিয়ুব উপত্যকার প্রোটো সেল্টিক ও বাল্টো স্লাভিক জাতি, এই দুয়ের প্রথম অংশ উত্তর-পশ্চিম অভিমুখে যাত্রা করেছিল, অপরটি পূর্বপানে যাত্রা শুরু করে আনাতোলিয় অনার্য সমাজে এসে পৌঁছায় ও মেরেধরে তাদের থেকে চাষের জমি ছিনিয়ে নিয়েছিল; এরাই ‘আন্দ্রনোভা সংস্কৃতির’ উদ্ভব করেছিল। এরই সাময়িককালে প্রোটো-ইতালীয় একটা গোষ্ঠী ‘ইয়াসন্যা’ (বর্তমানের পারস্য) অঞ্চলে এসে ঘাঁটি গেঁড়ে তারা আরও উত্তর-পুর্ব ‘ওসুন’ (বর্তমানের চীন) অভিমুখে যাত্রা করে। এর কয়েক শতাব্দী পর উক্ত ‘ইয়াসন্যা’ অঞ্চলের পার্থেয়ান ও মেদিয়ান’ গোষ্ঠীগুলি আরও পূর্বে আফগানিস্তান অভিমূখে যাত্রা শুরু করে। এই যে যাত্রাগুলো কোনোটাই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, সবটাই রক্তের পিচ্ছিল পথ ধরে এগিয়েছিল।

এই সময়কার শুরুর দিকের জাতিগুলোর মধ্যে ব্যাক্টেরিয়ান-মার্জিয়ানা নামের এক মিশ্র জাতির উদ্ভব ঘটেছিল, যা বর্তমানে আফগানিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত। বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ‘ডেভিড অ্যান্টনি’ তার পুস্তকে দাবি করেছেন যে- ইন্দো-আর্য জাতিগুলির প্রবর্তন হয়েছিল ‘সিনতাশতা সংস্কৃতির জাতিগোষ্ঠী’ থেকে- যা ‘বাক্টরিয়ান-মার্জিয়ানা’ সংস্কৃতির একটা অভিশ্রুত রূপ; এরাই পরবর্তীতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং মায়ানমারের আদিবাসী মানুষদের মাঝে অভিযোজিত হয়েছিল। এই সমস্ত অভিবাসনগুলি আনুমানিক ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের সমসাময়িক ঘটনাপঞ্জি, যেগুলো সম্ভব হয়েছিল একমাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে, কারণ সেই সময়েই চাকা যুক্ত ঘোড়ায় টানা রথের আবিষ্কার হয়েছিল। অর্থাৎ বিনা যুদ্ধে আর্যরাও এদেশের মাটিতে তাদের সভ্যতা স্থাপনা করেনি, তারাও স্থানীয় অধিবাসী ও তাদের সংস্কৃতি হত্যা করেছিল নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে।

এর পরবর্তীতে লৌহ যুগের সূচনা হয়, যা মূলত সিন্ধু অববাহিকা কেন্দ্রিক হলেও গাঙ্গেয় অববাহিকার বর্তমান বিহার অঞ্চল ও দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গনা ও কর্ণাটকের হলুর অঞ্চলেও এর নিদর্শন পাওয়া যায়। গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলে নগরায়নের ইতিহাসও এই সময়েই শুরু হয়েছিল। চারণভূমি ছেড়ে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপনের দিকে এই সময়েই ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল, কারণ লৌহ মূলত ধারালো ও টেকসই অস্ত্র তৈরির কাজেই ব্যবহৃত হতো।

কৌসম্বী (এলাহাবাদ), চিরান্দ, মালওয়া, মহিষাদল, পান্ডু রাজারা, বনাসিয়ান, কায়া, বেনারসের দক্ষিণে চান্দৌলি জেলার মলহার অঞ্চল, মহারাষ্ট্রের জোর্হয়ে সহ তৎকালীন ভারতে বহু নিদর্শন পাওয়া যায় হরেক ঢিবিতে। এই সময়কার শ্রেষ্ঠ নিদর্শগুলোর মধ্যে হাড় এবং হাতির দাঁতের উপরে কারুকার্য সম্বলিত হরেক ধরনের চুড়ি, চিরুনি এবং চুলের পিন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য, যেগুলো লোহার তৈরি অস্ত্র দিয়ে খোদাই করা হয়েছিল। টেরাকোটার মূর্তিও এই সময়ের এক অনন্য নিদর্শন; ষাঁড়, পাখি, ম্যামথের মতো কিছু প্রাণী রূপ পাওয়া যায়।

কাস্তে, কাটারি, কুড়ুল, লাঙলের ফলার মতো কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সহ, লৌহ নির্মিত অসাধারণ সব যুদ্ধাস্ত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে; যেমন বর্শার ফলা, তীরের ফলা, সকেটেড রিং, ছোট ছুরি এবং টাঙির মতো দেখতে যদিও খুবই অনুন্নত মানের। এর সাথে পাওয়া গেছে কাঠ, পোড়ামাটি ও হাড় দ্বারা নির্মিত ধর্মীয় জপমালা, অর্থাৎ সে যুগের সমাজেও কোনো না কোনো ধর্ম ব্যবস্থা ছিল। সুতরাং সে যুগেও যে ধর্মই থাকুক, ধার্মিক সমাজের সেনারা বা হয়ত সকলেই বাঁচার ও খাদ্যের প্রয়োজনে বা অন্য যেকোনো প্রয়োজনে যুদ্ধ বিগ্রহ করত এগুলো তারই প্রমাণ দর্শায়।

সুতরাং, ইসলামের বহু আগেও যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল; কোনও জাতিই লাঠির ডগায় তুলো জড়ানো মধু দিয়ে অন্য জাতির মুখে আলতো ভালবাসাবাসি করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেনি।

দেখা হবে পরের পর্বে।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ ২



প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব

দ্বিতীয় কিস্তি

ইতিহাসের আহমেদ শাহ্ আবদালি হোক বা নাদির শাহ্, প্রতিটি মুসলমান শাসকের ভারত আক্রমণের দায়ের বেশ কিছুটা অংশ আজকের মুসলমান ছেলেপুলেদের কমবেশি বইতে হয়, যদিও ঠিকঠাক ইতিহাস না পড়ার দরুন অধিকাংশ ছেলেপুলে জানেই না এনারা কারা। কিন্তু ক্ষমতাসীন, সংখ্যাগুরু জনগণ বা রাষ্ট্র যখন প্রশ্ন তুলেছে তখন হয়ত বা ‘আমরাই’ দায়ী এর জন্য- এমনটা মেনে নিয়ে আমরা মুসলমানেরা চুপ থেকে যাই। একজনও মনুবাদীকে দেখবেন না কোনো শিক্ষিত মুসলমানকে এরা যত্রতত্র পেটাচ্ছে তথা ‘মব লিঞ্চিং’ এর শিকার করতে পেরেছে। শিক্ষিতদের জন্য আইনের নামের প্রহসন আছে, যেখানে লড়াইয়ের জন্য অল্প হলেও ‘সময় ও সুযোগ’ পাওয়া যায়। মব লিঞ্চিং এর জন্য এদের লক্ষ্য অশিক্ষিত গরীব মুসলমান বা দলিত।

তাই এই মব লিঞ্চিং বা অপবাদের যতটা দায় তাদের, তার চেয়ে আমাদের দায় কম কিছু নয়, কারণ এদের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার মতো যথেষ্ট জ্ঞান আমরাই আমাদের উত্তর প্রজন্মকে দিতে পারিনি। আমরা এই মনুবাদীদের নকল করতে গিয়ে নিজস্ব সত্ত্বাকেই হারিয়ে বসেছি; আর আত্মবিস্মৃত জাতির জন্য লাঞ্ছনাই তো একমাত্র পুরস্কার। ইসলাম কোনো ধর্মকে অপমান করার শিক্ষা দেয় না, যারা এটা করে তারা যে ধর্মেরই হোক সেটা ওই ব্যক্তি বা তাদের গোষ্ঠীর বিকৃত ব্যাখ্যা, যা নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য অপব্যাখ্যা করেছে। মনুবাদীরা আবার মধ্যযুগের অন্ধকারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সমাজকে, সূর্য সিদ্ধান্তের নামে জ্যোতিষ আর জ্যামিতিকে মিশিয়ে দেওয়া হোক বা গণেশের মুণ্ডুর প্লাস্টিক সার্জারির তত্ত্ব- আমাদের শেখানো হচ্ছে এটাই আসলে আধুনিকতা, যেমন পশ্চিমারা ‘উলঙ্গ সভ্যতাকে’ আধুনিকতা হিসাবে জাহির করে।

এরা কেউ যেটা স্বীকার করে না যে, ভারতের দীর্ঘ ৮০০ বছরের ইসলামিক শাসনামলে যদি অমুসলিমদের উপরে অত্যাচারই করত তাহলে আজও কেন অমুসলিমরা ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮৬%? এই তথ্য শুধালেই আপনাকে প্রথমেই দেশদ্রোহী বলে দেগে দেবে; তারপরেও যদি আপনি বাগে না আসেন- আপনার জন্য থাকবে UAPA এর মতো আইন, একবার গারদে ভরে দিলে তো ভারতীয় আইন ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা সহ জাস্টিস রঞ্জন গগৈ এর মতোন দালালদের খপ্পরে পরে জীবন শেষ হয়ে যাবে, নতুবা জাস্টিস লোয়া।

বর্তমানের ‘হিন্দুত্ববাদী’ শাসকেরা তথ্য ও যুক্তির ধার ধারে না, যেমন তালিবান বা আইসিস জঙ্গি গোষ্ঠীরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেনা, আল্লাতন্ত্রের বদলে এরা মোল্লাতন্ত্র কায়েম করে ক্ষমতা ভোগ করে। আসলে স্থান কাল পাত্র ভেদে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো ধর্মের মোড়কে ভেক বদলায়, এদের উদ্দেশ্য ও বিধেয় একটাই- ‘রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা দখল’; আর তার জন্য একটা শত্রু খাড়া করতে’ই হয়। হিটলার ইহুদীদের শত্রু সাব্যস্ত করেছিল দেশপ্রেমের প্রতিরুপ হিসাবে, এদেশীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মুসলমানেদের সেই স্থানে নিয়ে গেছে।

আপনাকে সুচারুভাবে শেখানো হয়েছে মুসলমানেরাই একমাত্র হিংস্র খুনি লুঠেরা জাতি, এরাই ডজন ডজন বাচ্চা দেয়। এরা যেটা বলেনা- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রণম্য স্বামী বিবেকানন্দ, এনারাও প্রায় ডজন খানেক ভাইবোন ছিলেন; কিন্তু ওই- যে যা করে করুক, দোষ কেবল মুসলমানের।

এই দোষীদের তালিকাতে আরেকটা নামও এদের হিটলিষ্টে, সেটা হলো কমিউনিস্টরা। আচ্ছা, একটা কথা আমি বুঝিনা যে, পশ্চিমা মিডিয়া সহ আমাদের সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন রাজনৈতিক মুখ, যেমন বিজেপি, তৃনমূল, শিবসেনা, আকালি, বিজেডি প্রমুখেরা বলে কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্র নেই, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নেই; সেখানে ডিক্টেটরশিপ চলে ইত্যাদি ইত্যাদি। মোদ্দা কথা কমিউনিস্টদের পোঁদে গু, কারণ তারা বর্বর ও ম্লেচ্ছ গোষ্ঠী। এরই সাথে সাথে তারা প্রতিদিন বিভিন্ন মাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ করে যে, কমিউনিস্ট শাসিত দেশের মানুষ ঠিক কতটা অত্যাচারিত, কতটা লাঞ্ছিত; কোথায় কোথায় তারা গণ বিদ্রোহের আঁচ পাচ্ছে, সে দেশের ক্ষমতাসীন নেতারা কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি বুঝে পাইনা, এরা কোত্থেকে তাদেরই ভাষাতে ‘অগণতান্ত্রিক কমিউনিস্ট’ শাসিত দেশ গুলোর খবর যোগাড় করে, কীভাবে? তারা বিদেশী হয়ে যখন ‘গোপন’ খবর আনতে পারছে তাহলে সেখানে সাধারণ মানুষদেরও ‘গণতন্ত্র বা স্বাধীনতা আছে’; নতুবা তারা প্রতিদিনিই গালগল্প বানিয়ে কেচ্ছাকাহিনি প্রকাশ করে ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’ নামের বেশ্যাবৃত্তির পিছনে। দুয়ের যেটাই সত্য হোক, তারা যে প্রকাশ্য মিথ্যাচার করে এ বিষয়ে- তা নিয়ে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের অন্তত কোনও সন্দেহ থাকা উচিত না।

আচ্ছা বলুন তো, স্বৈরাচারী কিম-জং-উন একটাই ‘পোষ্ট’ তাদের দেশে, এটা ঘোষিত। আমাদের রাজ্যেও তো ‘মান্নিয়া’ বাদে সবই ল্যাম্পপোস্ট- তারজন্য কি মান্নিয়াকে কমরেড হতে হয়েছে? মান্নিয়া ছাড়া একজনের নাম বলুন যার শিরদাঁড়া আছে, যিনি পুরুষ! দিব্বি হিজাব পরিধান করে দুর্গা কার্নিভালে চলে যেতে পারেন ভেকধারী হয়ে। আসলে সমস্যাটা তো ব্যক্তি কেন্দ্রিক, পুঁজিবাদী-মৌলবাদী বিশ্ব এদেরকে একটা ‘কমন’ ছাঁচে ফেলে দিয়ে নিজেদের স্বার্থে চরিতার্থ করে- যার নাম কখনও ইসলামোফোবিয়া কখনও কমিউনিজমফোবিয়া। পুরুষত্বহীনেদের বীরত্বই বিভাজনে।

অনেক ভণিতা হলো, মূলত যুক্তি ও তথ্য দিতেই এই প্রবন্ধের অবতারণা, নিজের বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে আপনিই বিচার করবেন, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা অপপ্রচার। এরপর আমরা একে একে পর পর ভারতবর্ষের বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও তৎকালীন সময়ের যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব। এতে করে বুঝতে সুবিধা হবে এদেশের মাটিতে ইসলাম ও কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ আসার আগে ঠিক কতটা ‘মৌনী’ জাতি সকল বসবাস করত। চলুন মূল প্রবন্ধে যাওয়া যাক-

... ক্রমশ

সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ প্রাক কথন


প্রাচীন ভারতে যুদ্ধ ইতিহাস ও মুসলমানঃ আত্মবিস্মৃত পর্ব


প্রাক কথন
মুসলমান মানেই খুনে হিংস্র বর্বর জাতি, এটাই বর্তমানে ‘মনুবাদী-হিন্দুত্ববাদী’নাগপুরীয় দেশপ্রেমের মৌলিক স্তম্ভ। ‘মুসলমানেরাই আসলে এই ভারতবর্ষের যাবতীয় দুর্দশার জন্য দায়ী’, এই ইতিহাসই মোটামুটিভাবে পড়ানো শুরু হয়েছে সমাজের সর্বত্র। এর সাথে তো আছেই- বিভিন্ন গণমাধ্যম জুড়ে লাগাতার “মুসলমান=জঙ্গী”ও “মুসলমান=অশিক্ষিত বর্বর”এই দুই ইষ্ট মন্ত্রকে পুঁজি করে বানানো অসংখ্য নাটক, সিনেমা, উপন্যাস, গল্প, টিভি সিরিয়াল সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হরেক প্রচারণা।
এর দৌলতে খোদ মুসলমান ঘরের সন্তানদের অনেকে সারাক্ষণ অপরাধবোধ ও হীনমন্যতায় ভোগে। একটু লিবারাল কিন্তু পড়াশোনা বিমুখ ‘আধুনিক’ মুসলমান পরিবার নিজের ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে কোনও আইডল খুঁজে পায় না, অথচ গোটা পৃথিবীজুড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কমবেশি ১২০০ বছর ছেড়েই দিন, আমাদের ভারতবর্ষকে ৮০০ বছর শাসন করেছিল মুসলমান শাসকেরা, যাদের বদৌলতে আমরা আজকে মুসলমান। আসলে মুসলমানদের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইংরেজদের ২০০ বছরের শাসনের নামে লুন্ঠনের ইতিহাস আমাদের পাঠ্য, আমরা তাদের সম্বন্ধে পড়ছি, জানছি; কিন্তু যারা ৮০০ বছর ধরে হাজারে হাজারে সুলতান, নবাব দিয়ে গেল তাদের নাকি সবটাই কাপুরুষতার ইতিহাস। তাহলে মহাপুরুষ আর বীর কারা?
আমাদের শেখানো হয়েছে তৎকালীন বর্গী বা ডাকাত দলের সর্দার শিবাজী ভোশলের আজকের প্রজন্ম হচ্ছে বীর, যারা মুসলমান সুলতান-নবাবদের অধীনস্থ করদ রাজা বা জমিদার ছিল, তাদের প্রজন্মেরাই আসল বীর। ৮০০ বছরের নবাবী-সুলতানী আমলে তাদেরই গোমস্তা, কর্মচারীদের বংশধরেরাই আসলে বীর। সুতরাং, তাদের থেকেই বীরের আইডল খুঁজে নিতে হয়। মুসলমানেরা এদেশ থেকে লুন্ঠন করে নিয়ে যায়নি, তারা এখানেই এদেশের নাগরিক হয়ে মৃত্যু বরণ করছে। লুন্ঠন তো করেছে ইংরেজ, ফরাসিরা; যে ধারা আজও বহাল সুইস ব্যাঙ্কে টাকা পাঠানোর নামে, এটাও তো লুন্ঠনই- দেশে সম্পদের পাচার। অথচ আমাদের আইডল খুঁজতে একমাত্র এনারাই বিকল্প।
হ্যাঁ, আজকের ভারতীয় সংখ্যাগুরু সমাজে কি ‘আইডল’ হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব নেই! নিশ্চয়ই আছে, বহু বরেণ্য স্মরণীয় ব্যক্তিরা আছেন; কিন্তু তার সাথে মুসলমানেরা ভারতে ইসলামিক শাসনামলের জ্ঞানীগুণীদের বিষয়ে জানবে না? শুধুই শিখবে মুসলমানেরা বর্বর? নিজেকে সম্মান করার অর্থ তো অন্যকে অসম্মান করা নয়, আজকের মহান ব্যাক্তিরাও আমাদের আদর্শ হোক, সাথে সাথে আমরা আমাদের অতীতকেও জানি, এটাই তো সংস্কৃতির অঙ্গ হওয়া উচিৎ ছিল। বর্বরতা দিয়ে ৬ বছরের মোদী সরকার ল্যাজে গোবরে, আর মুসলমানেরা ৮০০ বছর রয়ে গেল শুধুই তরোয়ালের জোরে- এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হয় না; কিন্তু এটাই আমাদের ইতিহাসের নামে গেলানো হচ্ছে পরিকল্পিত ভাবে। এটাই তো একটা জাতির কাছে সবচেয়ে বড় প্রহসন যারা আপন কৃষ্টির গৌরবময় অতীত জানে না, তারা তো দাসত্বই করবে।
আজকে অধিকাংশ ‘প্রগতিশীল’ মুসলমান, ইসলামী আদব কায়দা, চালচলন, বন্ধুবৃত্ত, খাওয়াদাওয়া সহ নিজের নামধাম থেকেও, পারলে মুসলমানত্বকে এক্কেবারে ধুয়ে পুঁছে ‘খাঁটি’ হিন্দুত্ববাদীদের ‘মতোন’ ‘আদর্শ’ করে তুলতে চায় নিজেদের। কারণ এদের জানানো হয়েছিল তোমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) একজন নারী লোলুপ বদলোক ছিলেন, নামধারী মুসলিম পরিবারগুলো এটাকেই ধ্রুব সত্য হিসাবে মেনেও নেয়। এছাড়া ‘জিহাদি’ মুসলমান মানেই মৃত্যু পরবর্তী ‘৭২ হুর প্রাপ্তির লোভনীয় গল্প’বাজারে দারুণ কাটতি; ‘মনুবাদীরা’ এদের জানায়নি যে, মাত্র ৪০-৫০ বছর আগেও এই মনুবাদীদের পূর্বপুরুষেরা কুল রক্ষার দোহাই দিয়ে বুড়ো বয়স পর্যন্ত শত শত কচি কচি মেয়েদের বিয়ের নামে প্রহসন করে নিজেদের বিকৃত যৌনতাড়না পূর্ণ করত। মানব জন্মেই তো তারা ৭২ বা তারও বেশি ‘হুর প্রাপ্তি’ করে নিয়েছে, এরপর স্বর্গে গিয়ে তাদের যৌনাঙ্গ দিয়ে বীর্য বের হতো, নাকি ‘The End’ লেখা স্লিপ! শুধু কি তাই! আরেকটু পিছিয়ে গেলে, ওই কুলীন বুড়োর মৃত্যুর পর ওনার প্রতিটি বিধবাকেও চিতাতেও তোলা হতো এই গত শতাব্দীতেও; যাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাসই এমন বিকৃত ন্যাক্কারজনক, তারা যে আজ ইসলাম, দলিত, কমিউনিস্টদের ইতিহাস বিকৃত করবে তাতে আর আশ্চর্য কোথায়!
বলা হয় সিনেমা, নাটক, টিভি সিরিয়াল নাকি সমাজের প্রতিচ্ছবি। সেখানে কী বাংলা, কী হিন্দি সিরিয়াল- সর্বক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি TRP পাওয়া ধারাবাহিক গুলো হচ্ছে- এক জন বিবাহিত পুরুষের একাধিক নারী সম্পর্ক, যার কিছু বৈধ বাকিগুলো অবৈধ। দেশের ১৪% তো মাত্র মুসলিম, বাকি ৮৬ শতাংশের ঠিক কত শতাংশের পরস্ত্রী বা একাধিক নারীতে তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে এই ধরনের সিরিয়াল গুলো দিনের পর দিন জনপ্রিয় হয়ে রয়ে যেতে পারে!
আসলে এটাই তো সমাজের প্রতিচ্ছবি, মুসলমানেরা সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে বিয়ে নামের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলে সে ম্লেচ্ছ বর্বর, বাকিরা ‘স্টেপনি’ হিসাবে মধু খেয়ে নিয়ে ও প্রয়োজন ফুরালে ছেড়ে দিলেই সে আধুনিক, সভ্য হয়ে যায়। মুসলমানেদের ইনস্ট্যান্ট তিনতালাক এদেশে সাজা যোগ্য অপরাধ, আর মোদীজীর মতো মানুষেরা তার অভাগিনী স্ত্রী যশোদা বেনকে ছেড়ে দিলে তা আইনের আওয়াতেই আসেনা, এটাই তো মনুবাদীদের হিপোক্রেসি। গুড়ের স্বাদ সকলেই পেতে চায়, মুসলমান দেখিয়ে ও বলে খায় বলে সে দোষী, বাকিরা প্রকাশ্য প্রতারণা করে বলে সে সৎ- এটা কোনো ন্যায়দন্ড ভাই? যদিও হিপোক্রেটদের কাছে ন্যায়ের আশা রাখেই বা কে?
...ক্রমশ

শনিবার, ২৭ জুন, ২০২০

ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যাবাদী রাষ্ট্রনেতা

 


মিথ্যেন্দ্র ধোঁকাদাস ফেকু

‘তিনি’ গালওয়ান উপত্যকা ও দেশের ভূখণ্ডে অবৈধ চীনা অগ্রাসন সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে চলেছেন অনর্গল, এতে আমরা আশ্চর্যান্বিত নই; কারণ এটাই তার পরম্পরা, ঐতিহ্য। উনি যাদের আদর্শ তারা এই মিথ্যাটিকেই অলঙ্কার বলে মনে করেন।

• তিনি তার শৈশবের গল্পগুলি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার শৈশবের কুমির সম্পর্কে মিথ্যা রটনা ছড়িয়েছেন।
• তিনি ভাদনগর রেল স্টেশনে চা বিক্রি সম্পর্কে ডাহা মিথ্যা কথা বলেছেন
• তিনি তার পড়াশুনা ও ডিগ্রী সম্পর্কে নিখাদ মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার বিবাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার স্ত্রী ‘যশোদা বেন’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিলেন।
• তিনি তার ৫৬ ইঞ্চি বুকের মাপ নিয়ে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার ‘ই-ইমেল ও ডিজিটাল ক্যামেরা’ ব্যবহার সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিমি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন, গুজরাটে চীনা ব্যবসায় সমর্থন করার বিষয়ে তিনি মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি ‘প্রতি একাউন্টে ১৫ লক্ষ পৌঁছে যাবে’ নামের মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি ‘পুলওয়ামা’ জঙ্গি হামলা নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি ‘আচ্ছে দিন’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছিলেন।
• তিনি ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ সম্বন্ধে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি পেট্রোলিয়াম তেলের দাম সম্পর্কে বলেছেন।
• তিনি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি নতুন চাকরির ‘সৃজন’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি তার ব্যর্থ অর্থনীতি ও তার ফলস্বরূপ মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি কালো টাকা সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি বুলেট ট্রেন সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি নোটবন্দী সম্পর্কে ভুরিভুরি মিথ্যা বলেছিলেন।
• তিনি ইতিহাস বিকৃত করে নিয়মিত মিথ্যা বলেন।
• তিনি তার সব অক্ষমতা দুর্বলতা ঢাকতে নেহেরুর উপর দোষ চাপাতে মিথ্যা বলেন।
• তিনি ‘গাটার গ্যাস’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি বিদেশী ‘অভিবাসীদের’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি লাল আঁখ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি CAA-NRC সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের করোনা-সংকট সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি PM Care সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি ‘প্রধানমন্ত্রী তহবিল’ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন।
• তিনি করোনাকালের আর্থিক ‘প্যাকেজ’ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি করোনার অজুহাতে বিশ্ব থেকে বিপুল ঋণের বিষয়ে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি দেশের সেনা অপহরণ নিয়ে মিথ্যা বলেছেন।
• তিনি এমন একটা প্রাণী- যার গোটাটাই রাশি রাশি মিথ্যাচার।

যেকোনো দাঙ্গা, মুসলমানের উপরে মব লিঞ্চিং, দলিত হত্যা, লেখক হত্যা, সঙ্ঘ পরিবারের শাখা সংগঠনগুলোর জঙ্গীপনা, নেপাল-ভুটান সমস্যা সহ, বহু সংবেদনশীল বিষয়ে মুখে ছিপি এঁটে তামাশা দেখেছেন, মুখ ফসকে টুঁ শব্দটুকু করেননি।

তার হিম্মৎ বা মুরোদ হয়নি, প্রধানমন্ত্রীত্বকালে একটা সাংবাদিক সম্মেলন করার; কারণ এগুলো করতে গেলে পুরুষত্ত্ব লাগে, তিনি ময়ূরপুচ্ছধারী কাক। আদতে তিনি হলেন উভলিঙ্গ কিন্নর, সে বিষয়েও মিথ্যাচার করেছেন। যে দেশীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের (চামচা নয়) সামনে আসতে ভয় পায়, সে শত্রুদের সামনে কীভাবে লড়বে? কীভাবে বীর সেনারা তার মতো ক্লীব রাষ্ট্রপ্রধানকে সামনে রেখে শত্রু সংহারে যাবে?

‘তিনি মিথ্যা কথা বলেননি’ এমন কিছু আছে কি? দেশজ মিডিয়া হাউজ ‘গোদি মিডিয়া’কে অর্থের দ্বারা খরিদ করে তাদের দিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েই তো আর রাজনৈতিক উত্থান।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফেকু, ধোঁকাবাজ, ও ভীতু ‘সেন্ডিপড’ সদৃশ্য প্রাণী।

এত মিথ্যাচারের পরেও মোদী কেন জিতল, কারণ ইহুদী জায়নবাদীদের দ্বারা ১০০% নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়ার প্রোপাগান্ডায় ‘মুসলমান মানেই জঙ্গি’ এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে গোটা বিশ্বের জনমানসে; ভারতও যার ব্যতিক্রম নয়।

ভারতেও এমন কিছু সুবিধাবাজ, ধান্দাবাজ, ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যক্তিবর্গ আছে যারা সমাজের বুকে বিভেদ সৃষ্টি ও জিইয়ে রাখার মাধম্যে নিজেদের আখের গুছিয়ে রাখতে চায়। কিছু অশিক্ষিত বিকৃতমনস্ক ‘মানুষের’ অন্তরে বাস করা হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণাকে, ‘ইসলামবিরোধী দেশভক্তি’র সমার্থক করে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে মোদীর মেকানিজম। যে পদ্ধতিতে ব্রেন ওয়াস করে ইসলামী জঙ্গি সংগঠনেরা মানববোমা বানায়, এদের ভক্ত তৈরির পদ্ধতিও হুবহু নকল।

জাতীয় কংগ্রেসের ব্যর্থতা, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, আর RSS এর পরিকল্পিত বিভাজনমূলক এজেন্ডার ফাঁদে পড়ে গেছে প্রায় ৩০% মূর্খ জনগণ; যারা মনে করেছিল ১৪% মুসলমানই বাকি অমুসলিম ৮৬% এর যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশার জন্য দায়ী। এই ৩০%ই, সাম্প্রদায়িক উত্তেজক কথাবার্তা বলা RSS এর মুখ- মোদীকে নিজেদের ত্রাতা হিসাবে আঁকড়ে ধরেছিল।

RSS ও মোদীর সহযোগিতা করার জন্য মমতা, মায়াবতী, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, নবীন পট্টনায়ক, প্রকাশ আম্বেদকর, আসাউদ্দিন ওয়াইসির মতো ছদ্মবেশী দালালদের দিয়ে দলিত ও মুসলমানদের মাঝে মেরুকরণ করে, বিজেপি বিরোধী ভোটকে শতভাগে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এর সাথে গোটা ভারতের প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সরাসরি মদত দেওয়ার ঐতিহ্য অতি সুপ্রাচীন, তারাও বিজেপি বিরোধী বিপুল অংশের জনগণকে নিয়মিত বিভ্রান্ত করে বহু দ্বন্দ্বে খণ্ড খণ্ড করে দিতে সক্ষম হয়েছে, ফলস্বরূপ বিজেপির পক্ষে ওই ৩০-৩৫% ভোট একবাক্সে জমা হতেই এই দেশদ্রোহী শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনায় চলে এসেছে।

আজ ফলাফল চোখের সামনে, সেই মানুষগুলো যারা ১৪% মুসলমানদের ভয়ে মোদীকে ভোট দিয়েছিল তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অদৃষ্টের পরিহাসে, দারিদ্রতা, বেকারত্ব, অনাহার, যন্ত্রণাক্লিষ্ট যহ নানান দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে- কারণ তাদেরই ধাপ্পা দিয়ে ‘মিথ্যুক’ নিজে ও তার সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীদের ভোগ ও সম্পদ আহরণের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে।

আজ আর নতুন করে হিন্দু-মুসলমান, মন্দির-মসজিদ, গরু-শুয়োর খাবে না বা খাচ্ছে না। নোটবন্দী, জিএসটির পর অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে কাজ খোয়ানো কোটি কোটি ‘ভক্ত সম্প্রদায়ের’ পেটে এখন রুটির খিদে; মুসলমান তাড়ানোর গল্প ভুলে এখন অনাহারক্লিষ্ট সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চলছে। আজ ভক্ত সম্প্রদায়ের তুলনাতে কমিউনিস্ট বা আম মুসলমানেদের অবস্থা তুলনামূলক ভাবে ভাল জায়গাতে রয়েছে, কারণ বিজেপি ও সঙ্ঘপরিবার এই মুসলমান ও কমিউনিস্টদের উপরে নিয়মিত অন্যায় অত্যাচার করতে করতে তাদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাঁচার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে, শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে একত্র হয়ে সদ্ভাব রেখে সকলকে নিয়ে বাঁচতে হয়। কমিউনিটি বন্ডিং দৃঢ় হয়েছে এদের মাঝে, যা আগের থেকে অনেক বেশি।

আজকে চীন, নেপাল, ভুটনা তো বাহানা মাত্র- আসলে এ হলো ওই ৩০% মানুষের বোকামির দন্ড, তাদের অন্তরে চাষ করা ঘৃণার ফসল কেটে যারা লাভ নেওয়া নিয়ে গেছে, এখন ধুধুল চুষছে ওই ৩০-৩৫% ভক্ত, যারা মূলত বিজেপির ভোটার। মহার্ঘ পেট্রোলিয়াম কি শুধু মুসলমান আর কমিউনিস্টদের কিনতে হচ্ছে? নাকি দুর্মুল্য বাজারে অগ্নিমূল্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি শুধু মাত্র মুসলমানদের জন্য! দেশপ্রেমিক বিজেপিদের জন্য কি কোনো আলাদা কাউন্টার আছে? আছে শুধুই ভাঁওতা, যে ভাঁওতাকে তারা অলঙ্কার করে মোদীর মতো ব্লাফমাস্টারকে গদিতে এসেছিল, মাস্টার যথারীতি তার মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

মুসলমানেরা বা কমিউনিস্টরা আর আশ্চর্য হয় না, মুসলমান বিদ্বেষী ৩০% এর দল সময়ের মারে ‘আশ্চর্য’ হতে ভুলে গেছে। বাকিরা তো ক্লীব নপুংশক, না ঘরকা না ঘাটকা।

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...