রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

অকপট চড়ুইভাতি ২০২১



সম্পূর্ণ সিডিউল

শেষ কয়েক বছরের পরম্পরা মেনে করোনাকাল-২০২০ সালে অকপট চড়ুইভাতির আয়োজন করতে পারেনি টিম ‘অকপট’। ২০২১ এর শুরুর লগ্নে যখন প্রায় সকল কিছু আবার ছন্দে ফিরেছে, অকপটও সেই তালে পা মিলিয়ে কিছুটা মুক্তির স্বাদ পেতে মরিয়া।

অকপট চড়ুইভাতি মানে- শুধুই তো আর খাওয়াদাওয়া নয়, বরং এটা বাৎসরিক পারিবারিক মিলনোৎসব। অকপটুরা নিজ নিজ পরিবারের সাথে ৩টে দিন একসাথে থেকে, ভ্রমণ করে নিজেদের হৃদয়ের উষ্ণতা ভাগ করে নেয় এমন একটা সম্মিলনীতে। এটাকে যেমন শুধুই পিকনিক বলা যায়না তেমনই একে শুকনো ভ্রমন ও বলা চলেনা, এ আসলে অকপট চড়ুইভতি, এখানে ভ্রমণ ও চড়ুইভাতির সম্মিলনী ঘটে অন্তরের টানে।

এ বছর আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে আগামী ২৯শে জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২১। ঠেক- গিধনি।

গিধনি, এটি হল পশ্চিবঙ্গের অন্তিম রেলস্টেশন। মাইলের পর মাইল খাঁ খাঁ ঢাড় জমির ওপর দিয়ে হুমহাম শব্দে তীর ধনুক নিয়ে এখান দিয়েই শিকারে যেত আদিবাসীরা, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। বাজার দোকান সবই এই শেষ কয়েক দশকের দান, একটা সময় ড্যাঞ্চি বাবুদের চেঞ্জে আসার নিশ্চিন্ত আস্তানা ছিল এই গিধনি। লাল মোটা ধানের ভাত আর স্থানীয় বুনো কপির তরকারি দিয়ে হাউহাউ করে গোগ্রাসে গিলতো- পাথুরে হজমি জল পেটে পড়তেই। সপ্তাহান্তের হাট থেকে আনা মাছ কিংবা বনমুরগি দিয়ে স্বল্প মশলার আমিষান্ন- সে এক পরম সুখের দিন ছিল।

সেই গিধনি আজ জমজমাট মফঃস্বল। বেশ বড় বাজার, টোটো গাড়ির ভিড়ের সন্ধ্যা যেন জনঅরণ্য। কিন্তু লোকালয় ছেড়ে দু’পা এগিয়ে গেলেই শ্যামল গ্রাম, উঁচুনিচু মাঠ, তেপান্তরের সীমা অবধি ছড়িয়ে থাকা পাথুরে জমির বুকে সারি সারি তাল আর খেজুরের সারি; আরো দূরে মহুয়া, শাল, পিয়াল, সোনাঝুরি, শিরিষ, ইউক্যালিপটাসের সবুজের সমারোহ- আর নাম না জানা ছোট্ট নদীর তিরতিরিয়ে বয়ে যাওয়া- হাজার বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই রয়েছে- হয়ত অবিকল। মস্ত দীঘি ভরা শালুক ফুলেল জলে স্নানরত ছেলেপুলের দল।

রওনা- ২৯শে জানুয়ারি, শুক্রবার, ২০২১। সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা হওয়া “12813 - স্টিল এক্সপ্রেসে” চড়ে বসবে অকপট পরিবার- যারা উত্তরবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও কলিকাতা সংলগ্ন অঞ্চল থেকে আসবেন। রাত্রি ৭টা ৫৫ মিনিট নাগাদ ট্রেনটি আমাদের নামিয়ে দেবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে, সেখানে ‘অকপটের টিম বাস’ অকপটুদের রিসিভ করে ‘গিধনি’র নৈশ আবাসের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাবে। সেদিন রাত্রে দুটো মরশুমি সব্জির তরকারির সাথে মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল দিয়ে দুটি ভাত খেয়ে গল্পগাছা করতে করতে ঘুমের দেশের পাড়ি দেওয়া হবে ক্লান্ত শরীরে।

সকল পুরুষদের জন্য এক বা একাধিক স্থানের বন্দোবস্ত থাকবে, যেখানে পর্যাপ্ত টয়লেট ফেসিলিটির সাথে, পরিচ্ছন্ন বালিশ, বিছানা, বিছানার চাদর, কম্বল, তোষক ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণ মজুত থাকবে শীত নিবারণের প্রয়োজনে। মহিলা ও শিশুদের রাত্রিনিবাসের স্থানটি এলাকার অন্যতম সুরক্ষিত স্থানে করা হয়েছে, যেখানে উপরোক্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র, বিছানা কম্বল ও পর্যাপ্ত বাথরুম থাকবে।

৩০শে জানুয়ারি, শনিবার, ২০২১। এটি আমাদের ভ্রমণ দিবস। সকালে প্রাত্যহিক কর্ম সম্পাদন করে প্রস্তুত হওয়া মাত্রই, জলখাবারের ব্যবস্থা থাকবে। যেখানে, পুরী-সব্জি, ইডলি-সাম্বর, ধোসা-বড়া-সাম্বর ইত্যাদি বিকল্প ধরনের প্রাতঃরাশের ঢালাও ব্যবস্থাপনা থাকবে।

এরপর আমাদের টিমবাস বেড়িয়ে পড়বে বাংলার জঙ্গলরানী জামবনী ব্লকের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিরতির করে বয়ে চলা ড়ুলং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহারাজা গোপীনাথ সিংহের তৈরি- ঐতিহাসিক ‘চুয়াড় বিদ্রোহের’ সাক্ষী বহন করে চলা ‘চিল্কিগড় রাজবাড়ী’ প্রাঙ্গণ। বৃহৎ তোরণ দ্বার পেরিয়ে গবুজ ঘাসের গালিচা বেছানো পথে উন্মুক্ত প্রান্তরের বামদিকে সুপ্রাচীন অশ্বত্থ গাছ আপনাকে সেই ১৭৬৯ সালের গল্প শোনাবে ফিসফিসিয়ে। অদূরে মন্দির, পরিত্যাক্ত কর্মীআবাস, আউটহাউসকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদের মূল অংশ। অপুর্ব সুন্দর মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষণ থিতু হয়েই আমরা রওনা দেব অদূরের কনকদুর্গা মন্দিরের উদ্দেশ্যে।

মালভূমির উপর দিয়ে বয়ে চলা নামটির মত জলতরঙ্গ খেলিয়ে বয়ে চলা নদী ডুলং। কিছুটা জঙ্গলে ঢাকা কংক্রিটের পথ পেরিয়ে যেতে হবে মন্দিরে, এই জঙ্গলটির নাম ভূষণ। সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৩৩ ধরনের বিরল উদ্ভিদের দেখা মেলে এই জঙ্গলে, যার অনেকগুলিই ভেষজ হিসাবে দুষ্প্রাপ্য। নিম, বাবলা, বাঁদরলাঠি, অর্জুন, শিরীষ, গুলঞ্চ, পিপুল, সঞ্জীবনী সহ কতধরনের অজানা বনানীর যে সমাহার রয়েছে তার গণনা করা ভীষণ কঠিন। হরেক ফুল, প্রজাপতি, বাঁদর আর পাখীর ডাকের আলোআঁধারি পরিবেশটাই যেন শতাব্দী প্রাচীন মন্দির চত্বরটিকে একটা আশ্রমের মেজাজ দিয়েছে। কিছুটা এবড়োখেবড়ো পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হবে মিষ্টি ডুলং নদীর পাড়ঘেষা কনকদুর্গা মন্দির চত্বরের জঙ্গলটিতে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চল ভ্রমণ শেষে আমরা রওনা দেব গদরাশোল গ্রামের উদ্দেশ্যে, এটি আদিম উপজাতি লোধা ও শবরদের গ্রাম, দেখে নিতে পারব আমাদের আদিম ভারতের জনজাতির নিজস্ব সংস্কৃতি।

ততক্ষণে বেলা অনেকটাই হয়ে গেছে, কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি। গদরাশোল হাটচালাতে আমাদের মধ্যাহ্নভজন পৌঁছে যাবে অন্য গাড়িতে, ‘ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন’। ভরপেট খেয়ে দেয়ে আমরা বাসে বিশ্রাম করতে করতে রওনা দেব ২৭ কিমি দক্ষিণে সুবর্নরেখা নদীর তীরবর্তী গোপীবল্লভপুর ইকোপার্কের উদ্দেশ্যে। প্রসঙ্গত, এই ভ্রমণে পার্কের এন্ট্রি ফি, বা কেউ যদি কোনো রাইড (নৌকা বা প্যাডেল বোট) নিতে চায় সেক্ষেত্রে খরচা অতিরিক্ত ও ব্যাক্তিগত।

চোখজোড়ানো মনভোলানো উদ্যানটি ঘুরে ফিরে দেখে নিয়ে রওনা দেব ‘ঝিল্লি পাখিরালয়’ এর উদ্দেশ্যে। ঘন প্রাকৃতিক জঙ্গলের মাঝে এক অপূর্ব মনোরম সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ঝিল্লি পাখিরালয়, যা মূলত পরিযায়ী পাখীদের নিশ্চিন্ত শীতকালীন আবাসস্থল। উড়ে বেড়ানো বান্টিকের ঝাঁকের সাথে দেখা মিলবে চাঁদি ঠোঁট, বালি হাঁস, নিরল পরিনা, নীলকণ্ঠী ফিদ্দা, চুনী কন্ঠী, শিলাফিদ্দা, ছোট সারস, ছোটন ভোমরা, ভরত পাখী কিম্বা হরেক ক্যামফ্লেজে আপনাকে টুকি দেওয়া মুনিয়ার ঝাঁক। এই পাখিরা এখানে খাদ্য আহরন করে, বাসা বাঁধে এবং ছানা ফুটিয়ে বড় করে; অতঃপর শীতকাল কাটিয়ে বসন্তে আবার উত্তরে উড়ান দেয়। পর্যটকদের জন্য ঝিলের একপাড়ে বেশ সাজানো গোছানো ছোট্ট পার্ক মতন করা রয়েছে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা পাড়ি দেব আমাদের রাত্রিযাপনের স্থান গিধনির উদ্দেশ্যে, কিন্তু তার আগে আমরা একবার ঢুঁ মেরে নেব ‘হাতিবাড়ি অরণ্যের’ মাঝে।

গ্রামছাড়া রাঙামাটির পথ পেরিয়ে প্রাকৃতিক শাল-পিয়ালের অরণ্যের মাঝখান দিয়ে, পটে আঁকা ছবির মত শান্ত স্নিগ্ধ বয়ে চলা সুবর্ণরেখা নদীর সাথে লুকোচুরি খেলার স্থানটির নামই হলো 'হাতিবাড়ি অরণ্য'। লাল বালির পাড় বেয়ে নেমে শান্ত স্থির সুবর্ণরেখার বুকে, অস্তগামী সুর্যকে সাক্ষী করে পানসীতে খানিকটা ভেসে বেড়াবার সুখের মত নৈসর্গিক সুখ কমই আছে বাংলার ভূমিতে। অবশেষে সুর্য যখন গাছপালার মাঝে অস্ত যাবে- আমাদের বাসও রওনা দেবে তখন।

সন্ধ্যায় ফিরে হাতমুখ ধুয়েই গরম কফির সাথে বেগুনী বা বিউলি ডালের বড়া দিয়ে নৈশভোজের ফিতে কাটা হবে। মহুলের জঙ্গল থেকে যখন হিম পড়ার আওয়াজ আসবে টিপিটুপটাপ করে, দূর হতে রেলগাড়ির হুইসেল ছাড়া কেবল মাত্র রাতচড়া পাখী আর ঝিঁঝিঁ পোকাদের কলতান শোনা যাবে তখনই আমাদের ‘ক্যাম্পফায়ার’ শুরু হবে। স্তূপীকৃত শুকনো কাঠের আগুনের ‘ওম’ নিতে নিতে, ‘ইয়েল’ এর নেতৃত্বে শুরু হওয়া আড্ডা, গান, খুনশুটির ছলে নিজেদের মাঝের বন্ধনকে মজবুত করে নেওয়ার পালা। সাথে থাকবে ঢালাও চিকেন পকোড়া আর উষ্ণ কফি। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে আগামীকালের জন্য প্রাণকে সতেজ রাখার তরে ক্যাম্পফায়ারের মত নির্মল চিত্তবিনোদনের কোনো বিকল্প নেই।

রাত্রি একটু গভীর হলে ডাইনিং হল থেকে ডাক আসবে পাচকের, জামবাটি ভরে উঠবে দিশি মুরগি কিম্বা হাঁসের মাংসের ঝোলে। আপনি যদি চালের আটার রুটি বিলাসী হন, তাহলে তো কথাই নেই, এদিন সেই ব্যবস্থাই থাকবে, আর নিতান্তই যদি ভেতো বাঙালী হন তাহলে গরম ভাত আর যাচ্ছে কোথায়, হাতে বেলা আটার রুটির সাথে সেও থাকবেই পাতে- যদি আপনি তা একান্তই বলে রাখেন আগে ভাগে। এর পর আর কী, ঘুমের দেশে পাড়ি দেওয়া…

৩১শে জানুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এই দিনটি আমাদের বাৎসরিক চড়ুইভাতির দিন। যদি কোনো বন্ধু কেবলমাত্র এই দিনেই অংশগ্রহন করে চলে যেতে চান, তেমনটাও করতে পারেন।

এদিনও সকালটাও শুরু হবে গত দিনের মতই চা/কফি বিস্কুট দিয়ে। তার পরেই আমরা তৈরি হয়ে রওনা দেব গিধনি থেকে ৩২ কিমি দূরে বেলপাহাড়ি ব্লকের জঙ্গলঘেরা ‘আমলাশোল’ গ্রামে। হ্যাঁ, ২০০৪ সালের সেই আমলাশোল, যে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল। এখানেই রয়েছে ‘খাড়ারানী সরোবর’, এবড়োখেবড়ো মেঠো আলপথ বেয়ে, এর বাড়ির উঠোন- তার বাড়ির গোয়ালের ছাঁচতলা দিয়ে পৌঁছাতে হবে এই সরবরের তীরে। তারপর?

আর কী, পরিস্কার ঝকঝকে মেঘমুক্ত আকাশ, সবুজ জঙ্গলময় টিলায় ঘেরা নীল জলের বিশাল জলাধার, যা মূলত বৃষ্টির জলে পুষ্ট। স্বচ্ছ, টলটলে সরোবরে একটি বাঁধ রয়েছে, বাঁধের লকগেট খুলে জল সরবরাহ হয় আশেপাশের গ্রামগুলিতে। বাঁধের উপরের সরু কংক্রিটের রাস্তার ওপারে যতদূর চোখ যায় শুধুই জঙ্গলে ঢাকা। নীলাকাশের নীচে সবুজ অনুচ্চ পাহাড়ে ঘেরা টলটলে কালো জলের বিশাল জলাধারের দৃশ্য এক কথায় অতুলনীয়।

দৃশ্য সুখের অপ্রার্থিব সুখ পুরোটা ঠিকমতো আত্মস্ত করার আগেই হালুইকর হাজির করবে গরম ফুলকো রাধাবল্লভি আর চানা মশালা, সাথে থাকবে ডিমসিদ্ধ আর সন্দেশের টুকরো। দ্রিমিদ্রিমি মাদলের তালের মত বয়ে চলা বাতাসের খেলে বেড়ানো- খঞ্জনা, শামুকখোল, দেশী বক, শ্যামসুন্দর, পানকৌড়ি, বেনে বৌ, মাছরাঙা বা কিম্ভূত ভাবে উড়তে থাকা সায়োলোরের খেলা দেখতে দেখতে বুঝে উঠার আগেই বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাবে যদি না কেউ ডেকে দেয় আপনাকে। এখানে কিছু পাখী নাচে, কিছু পাখী গায়, কেউ শান্ত তো কেউ চঞ্চল, কেউ ওৎ পেতে থাকে আবার কেউ স্বশব্দে নিজের উপস্থিতি জানান দেবে চড়কি কেটে।

জলখাবার খেতে খেতে, সরোবর, প্রকৃতি আর পাখীদের যুগলবন্দী দেখতে দেখতেই রওনা দেব ২ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট একটা টিলা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে- ‘গাদ্রাসিনি হিল’। যারা ট্রেকিং এর শখ রাখেন, তাদের জন্য এ যেন সব পেয়েছির দেশ। সোজা হয়ে আকাশ ছুঁতে চাওয়া লম্বা লম্বা পিয়াল-মহুলের গুঁড়ির ফাঁকে পাথুরে পথের উপরে বিছিয়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোকে মচমচ শব্দে মাড়িয়ে যাওয়া সে এক অকৃত্রিম সুখানুভুতি রয়েছে। যদি পাহাড়ের উপরে পৌঁছে যান, তাহলে তো গোটা বেলপাহাড়ি অঞ্চলটাকে দেখে নিতে পারবেন ‘ঈগলের চোখের’ মতন, নিচে নিবিড় অরণ্য, তার অপরে আপনি আর মাথার উপরে শুধুই নীল আকাশ, কেউ কোত্থাও নেই। অদূরেই রয়েছে একটি প্রাকৃতিক আদিম গুহা, চাইলে যে কেউ সেটা চাক্ষুষ করতেই পারেন, সময়ে কুলালে।

পাহাড় থেকে নেমে এসেই আমাদের গন্তব্য অদূরেই ঝাড়খন্ড লাগোয়া ‘ঢাঙিকুসুম’ গ্রাম। গ্রামটির মানুষজনের মূল জীবিকাই হল পাথরের বাসনপত্র তৈরি করা। শহুরে বা সমতলের মানুষের কাছে বেশ খানিকটা কঠিন তথা ‘মিনি’ দুর্গম চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় ‘হদহদি’ ঝর্নার সামনে। ঘন কালোছায়া বিশিষ্ট এই অরণ্যের মাঝেই ‘ছুঁচোর ডনবৈঠক’ শুরু হয়ে যাবে সকলের পেটে, অনভ্যস্ত পায়ে এতোটা হাঁটাহাঁটি করলে পেট বেচারার আর দোষ কিসের! এর মাঝে যদি পেট সাথ দেয় তাহলে ডুংরি ঝর্নাটাও একবার চোখের দেখা দেখে নেওয়া যেতেই পারে।

আবার খাড়ারানী সরোবরের তীরে যতক্ষণে ফিরে আসব, ততক্ষণে খাসির মাংসের সুগন্ধ জিভের স্বাদকোরক গুলোকে জাগ্রত করে ‘নিশির ডাকের’ মত পাতের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। সাদা ভাত, লেবু লবণ, ঝুড়ি আলুভাজা, নবরত্ন সব্জি, সোনা মুগের ডাল, আলুপোস্ত, খাসির মাংস কষা, চাটনি, পাঁপড় আর গুড়ের রসগোল্লা সহযোগে চেটেপুটে খাবারই তো দিন এটা।

গল্পগুজব করতে করতে এবার সরোবরকে টাটা বলার পালা, ফেরার পরে একবার ঢুঁ মেরে নেওয়া ‘ঘাগরা’ জলপ্রপাত। নামে জলপ্রপাত হলেও আসলে এটা একটা জলাবর্ত, হাজার হাজার বছর ধরে ছোটনাগপুরের কঠিন আগ্নেয় শিলাপাথরের উপর দিয়ে ‘তারাফেনি’ উপনদী তার পথ তৈরি করে নিয়েছে গভীরভাবে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুপাড়ে ঘিরে থাকা জঙ্গল, ঝরে পড়া পাতা, কাঠবেড়ালীর ছুটোছুটি, পাখিদের ডাকের মাঝে লুকিয়ে থাকা রহস্যময়ী ঘাগরা, যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে নদীর শিল্পকলা মাখা সৌন্দর্যের প্রতিমুর্তি।

নিস্তব্ধ চুপচাপ সুন্দর গ্রামে রাঙা মাটির পথ, সরষের ক্ষেত, আলপনা আঁকা লালমাটির ঘর, পরিশ্রমী জীবনযাযাত্রী বনবাসী, জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে আনা কাঠুরের দল, বিনোদনের জন্য মোড়গ লড়াই, নেশার জন্য হাঁড়িয়া,মহুয়া বা তাড়ীর রস, উঠোনে ধানের ছোট্ট গোলা সমৃদ্ধ অসম্ভব সুন্দর গ্রাম্যপরিবেশের এই জঙ্গলেই টেনিদা খ্যাত “চার মূর্তি” সিনেমার শুটিং হয়েছিল। গাদ্রাসিনি, খাড়ারাণী সরোবর, ঢাঙিকুসুম, ঘাঘরাকে কেন্দ্র করেই শেঠ ঢুন্ডুরাম সহ স্বামী ঘুটঘুটানন্দের দাড়ি উপড়ে ছিল টেনিদা সমেত প্যালা, হাবুল আর ক্যাবলার চারমুর্তি।

সুতরাং, খাঁড়ার মত নাক থাকুক বা নাইবা থাকুক, গড়ের মাঠে গোরা পেটানো শরীরও না থাকলে চলবে- কিন্তু গলা ছেড়ে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” গাইতে হলে যে আসতে হবে অকপটের এই যাত্রায়, তবে না প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠতে পারবেন “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

সন্ধ্যায় গিধনি ফিরে, চা জলখাবারের সাথে শুধুই মজলিশি আড্ডা। রাত্রে নৈশভোজে গরম ভাতের সাথে মটরসুটি দিয়ে মুগের ডাল, আলু ফুলকপি রসা, পাবদা মাছের ঝাল আর চাটনি দিয়ে উদরপুর্তি করার বন্দোবস্ত থাকবে। যারা মাছে আসক্ত নন, তাদের জন্য রইবে ‘কবিরাজি চিকেন কষা’। জ্যোৎস্নার আলোয় মোহময়তাকে পূর্নতা দেয় বুনো ফুলের সুগন্ধ, ততক্ষণ আড্ডা চলতেই থাকবে- যতক্ষননা, জ্যোৎস্নালোকে ধুয়ে যাওয়া আলোকিত জঙ্গলময় উপত্যকা বেয়ে ঘুমপরীরা ভর করবে চোখের পাতায় পাতায়।

১লা ফেব্রুয়ারি, রবিবার, ২০২১। এদিনটা একটু সকাল সকালই শুরু হবে। গত দুদিনের মতই চা বিস্কুট রুমে খেলেও, প্রাতঃরাশ সারা হবে বাসের মধ্যে- রুটি, কলা, ডিম সিদ্ধ আর সন্দেশ সহযোগে। ভাগ্যক্রমে যদি পথে লুচি আলুর দম পাওয়া যায় সেটাতেও কোনও মানা নেই।

সকালের নরম রোদে দেখে নেওয়া হবে ঝাড়গ্রামের ঐতিহ্যশালী রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ। বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত ভাস্কর্য ও শিল্পকলায় নির্মিত ৩০ একর জুড়ে সুবিন্যস্ত সুবিশাল এই রাজপ্রাসাদ পশ্চিমবাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার মান সিংহের আমলে, ‘রাজপুত চৌহান’ রাজা সর্বেশ্বর সিংহের ব্যবস্থাপনায় এই স্থাপত্য ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় মাল আদিবাসী রাজাদের পরাজিত করেছিলেন বলে এই প্রাসাদের শাসকরা “মল্লদেব” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। চুয়ার বিদ্রোহের পর ১৭৯৯ সালে প্রাসাদটি ব্রিটিশ কর্তৃত্বধর জমিদারী এস্টেটে পরিণত হয়েছিল। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে স্থানীয় মিউজিয়াম ও ডিয়ার পার্কে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বেলা ১১ টার মধ্যে মাছেভাতে/মাংসভাতে মধ্যাহ্নভোজন সাঙ্গ করা হবে ঝাড়গ্রামেরই কোনো বাঙালী ভোজনালয়ে।

এর পর আমাদের অরণ্যসুন্দরীকে বিদায় জানাবার পালা। শালের জঙ্গলের ভিতর লাল মাটির রাস্তা বেয়ে আমাদের বাস এগিয়ে চলবে খড়্গপুর রেলস্টেশনের উদ্দেশ্যে। পড়ে থাকবে সবুজে ঘেরা বনাঞ্চল, শান্তপুস্করিনি, কুলুকুলু ঝর্ণা, পিচঢালা সরু রাস্তার দুপাশের জঙ্গলের মাঝে রয়ে যাওয়া শান্ত গ্রামীণ পরিবেশ। ছোট্ট নদীগুলো তেমনই বইতে থাকবে যেমন ভাবে বয়ে চলেছে লক্ষ বছরের অভ্যাসে। স্কুল ফেরত দলবাঁধা বাচ্চার ফিরে যাবে তাদের নির্মল গ্রাম্য জীবনে। জানালার বাইরে ক্রমশই ফিকে হয়ে আসবে সবুজের সমারোহ, ফিরে আসবে নগরজীবনের দৈনন্দিনতার দোকানপাট ও বাস স্ট্যান্ড। রয়ে যাবে ঝাড়গ্রাম, জঙ্গলমহল, অরণ্যসুন্দরী- আমাদেরই মত অন্য কারোর প্রতীক্ষায়।
এই খড়গপুরেই আমাদের অকপট চড়ুইভাতি ২০২১ এর যাত্রার পরিসমাপ্তি দুপুর ২টোর মধ্যে, এখান থেকে যে যার নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেবে, বাসে ট্রেনে বা নিজ বাহনে।

গোটা এই ভ্রমণের জন্য আমাদের প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক অকপটুর জন্য খরচা রাখা হয়েছে মাথা পিছু ২০০০/- টাকা (দুই হাজার মাত্র)। ২৯শে জানুয়ারি ২০২১ সন্ধ্যায় ঝাড়গ্রাম হতে রিসিভ করা থেকে- ১লা ফেব্রুয়ারী ২০২১ খড়্গপুরে ড্রপ করে দেওয়া অবধি (থাকা, খাওয়া ও পিকনিক) সমস্ত খরচা সহ ( পার্কের এন্ট্রি ফি অ রাইড খরচা বাদে)। ৫ বছরের নীচের সকল বাচ্চাদের খরচা বিনামূল্যে, ১০ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের খরচা মাথাপিছু ১০০০/- টাকা।

যারা শুধুমাত্র চড়ুইভাতিতে অর্থাৎ ৩১/০১/২০২১ তারিখ রবিবার উপস্থিত থাকতে চান, তারা সরাসরি বেলপাহাড়ি বাজার অবধি চলে আসতে পারেন, সেখানে আমাদের গাড়ি আপনাকে খাড়ারাণী সরোবর অবধি নিয়ে আসবে। এই দিনের জন্য খরচা ধরা হয়েছে মাথাপিছু ৫০০ টাকা মাত্র। ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের জন্য ৩০০ টাকা, ৫ বছর বয়সের নীচে সম্পূর্ন বিনামূল্যে। সেই রাত্রিতে থেকে গেলে তার জন্য অতিরিক্ত ২০০/- টাকা মাথাপিছু বেশি গুনতে হবে।

যারা এই অকপট ভ্রমণ তথা চড়ুইভাতিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, তারা ২০ই জানুয়ারির মধ্যে অফেরৎযোগ্য ৫০০/- টাকা করে জমা করুন। কেন অফেরৎযোগ্য? কারন- হালুইকর, বাসভাড়া, একমডেশন সকল কিছুই আগে থেকে কনফার্ম করতে হবে পরিচালকদের, শেষ মুহুর্তে বাতিল করলে খাবার খরচা টুকুর বাইরে সকলকিছুরই পেমেন্ট করতেই হবে পরিচালকদের। যেহেতু অকপট চড়ুইভাতি কোনও ব্যবসায়িক স্বার্থে করা নয়, বরং সবচেয়ে কম খরচে উৎকৃষ্ট গুণমান দিতে অকপট দায়বদ্ধ কারন অকপটুদের নিজেদের পরিবার গুলোই থাকবে এখানে; সেহেতু কে অন্যের শেষ মুহুর্তের বাতিলের দায়ভার বহন করবে! তাই এই অফেরৎযোগ্য অগ্রিমের ব্যবস্থা।

২৬শে জানুয়ারি ২০২১ এর মধ্যে সম্পূর্ণ চাঁদা জমা করতে হবে আমাদের নির্দিষ্ট একাউন্টে, অন্যথায় সকল ব্যবস্থাপনা করা সম্ভবপর হবেনা। যারা শুধু চড়ুইভাতি বা বনভোজনের নির্দিষ্ট দিনেই আসবেন, তাকেও ২৬ তারিখের মধ্যেই ৫০০/- টাকা জমা করতে হবে। যারা হাওড়া থেকে ‘স্টিল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে যাবেন টিম অকপটের সাথে দল বেঁধে, তাদের টিকিট আমরা স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে কাটিয়ে দেব, আপনি স্টেশনে পৌঁছে সেই স্বেচ্ছাসেবকের কাছে রিজার্ভেশন বাবদ প্রদেয় অর্থ নগদে মিটিয়ে দেবেন।

টাকা পাঠাবার ঠিকানাঃ
KINGSHUK HALDER
S B I, BEHALA BRANCH
A/C NO. 11170337153
IFSC SBIN0001522
MICR 700002115
UPI: hkingshuk-1@oksbi

তাহলে, আর কী! গেলে দেখা হবে হাওড়া ঝাড়গ্রামে। একসাথে গাওয়া যাবে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ, স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো…” কিম্বা প্রাণ খুলে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠব “ডি-লা গ্রান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক”।

স্বাগতম।




বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২১

তোলামুলের ঘরভাঙার খেলা



অন্যের ঘর ভাঙলে খুব মজা আর নিজের ঘর ভাঙলে খুব জ্বালা।

৯ বছর ধরে কংগ্রেস-CPM এর ঘর ভাঙিয়ে নিজের ঘর সাজিয়েছিল, সেই জারজগুলো উন্নয়নের জোয়ারের ক্রিম ছিল- বেইমান বা বিশ্বাসঘাতক নয়। আজ যখন গোটা দলটাই মিছিল করে রোজই ঘর ভেঙে কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে- তখন তারা বেইমান বিশ্বাসঘাতক হয়ে যাচ্ছে আশ্চর্য ভাবে। সেই মুকুল একুল ওকুল দুকুল নিয়ে গেছে সেই একই ছকে, মান্নীয়ার আকুল অনুপ্রেরণায়। সঙ্ঘী ধানীপোনা কালীঘাটের পালন পুকুরে বড় হয়ে এখন ডিম পারতে নাগপুরের মোহনাতে জমেছে।
ভেঁপু কুমার ফরেন বৌ নিয়ে ফেরার হওয়ার ঠিক আগের দশায় জুতোর ফিতে বাঁধছে- দেওয়াল লিখন পড়ে ফেলেছে- অগ্নিকণ্যার আগুনে তেজে বাংলাতে ধোঁয়া আর ছাই ছাড়া অবশিষ্ট কিছু নেই।
আসলে উন্নয়নের জোয়ারে ড্রেনের গু গুলোকে ক্রিমের প্যাকেটে ভরে সততার সাথে পাব্লিককে মাখিয়েছিল চপশ্রী। স্বীকৃত চোর গুলোর সাথে প্রতিটি নিস্প্রভ বিন্দুকে চারিপাশে সাজিয়ে একমাত্র স্পটলাইট নিজের উপরে রেখেছিল সারদাবালা। এখন সেই শালী(বৈ)রাই নুলো দেখাচ্ছে - রা কাটা জীবের সাথে। হেঁদু হলে পথ আছে, সাভারকর বোঝার এই জো ধরা লগনে "সিপিএম আমলই ভালো ছিল" বলে রাগমোচনের একটা সুযোগ পাচ্ছে।
কিন্তু, তৃণমোল্লা গুলোর আত্মলিঙ্গম পশ্চাদপূরম দশা- জাতে RSS কিন্তু ভরঙে সোনাগাছির সতীদের মত ঘোমটার পবিত্রতা। উটপাখির মত চটিতে মুখ গুঁজে- পরনের লুঙ্গি দিয়ে সেই ঘোমটা বানিয়েছে। ওদিকে নিকারাগুয়ায় তখন হাম্বানটোটা দোলা খাচ্ছে ৭% ৭% তসবি গুনে।
মার্চ শেষ হতে হতে উন্নয়ন সাইনবোর্ড, তৃণমোল্লা দুধেল গাইগুলো কসাইখানায় চলে গেলে তাদের 'মাদার' সাবান বিজেপি নিশ্চই গোহত্যার বিষয়ে বাঁধা দেবেনা। তাছাড়া ডিটেনশন ক্যাম্প গুলোতেও তো কিছু ভিড় চাই, তৃণমোল্লা সেকু নেড়ে গুলোর চেয়ে ভাল প্রার্থী আর কারা?

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০

 


বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ‘হিন্দুত্ব’ তত্ত্বের উপর গড়ে উঠেছে আজকের RSS-বিজেপির জঙ্গি সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার রাজনীতি। গোহত্যা, জাতিভেদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে ‘সাভারকারের মতাদর্শ’ থেকে বর্তমান মৌলবাদী হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকশক্তি আজ অনেকটাই সরে এসেছে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ব আসলে একদিকে সাভারকার আর অন্যদিকে হেডগেওয়ার আর গোলওয়াকারের ধর্মভাবনার এক খিচুড়ি তত্ত্ব।
প্রকৃত হিন্দু কে? এই প্রশ্নের উত্তরে বর্তমান ভারতবর্ষে বেশিরভাগ হিন্দু এই ধারণা পোষণ করেন যে হিন্দু হবার আবশ্যিক শর্ত হলো গোমাতাকে নিজের মাতার স্থান দেওয়া এবং গো-পূজন করা। ১৯২৩ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকারই ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা করে। যে গ্রন্থটি হিন্দুত্বের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয় সেই ‘হিন্দুত্ব’ নামক বইয়ের রচয়িতা সাভারকার, সেই বিজ্ঞাননিষ্ঠ নিবন্ধ সংকলন- “গোপালান হেভে, গোপুজান নাভেহে” শিরোনামে বারবার বলেছেন, “গরু যদি কারো মাতা হয়ে থাকে তবে তা বলদের”।
সাভারকরই লিখে গেছে- “মানুষের গো-পূজনের কোন কারণ নেই, কারণ মানুষ তারই পূজা করে যে তার থেকে শ্রেয়তর এবং যার মধ্যে সুপারহিউম্যান কোয়ালিটি রয়েছে এবং গরুর মত মনুষ্যেতর প্রাণী কখনোই মানুষের আরাধ্য হতে পারেনা”। বিজ্ঞান বিষয়ক অন্য একটি প্রবন্ধে সাভারকার লিখেছিলেনঃ “ভারতের মতো দেশে গরুকে মাতৃজ্ঞানে বিশ্বাস করা স্বাভাবিক। মানুষ গরুর কাছ থেকে দুধ এবং অনেক কিছু পান যা আমাদের প্রয়োজন। অনেক পরিবারের জন্য গাভী পরিবারের অংশ হয়ে যায়। সুতরাং এটি আমাদের জন্য দরকারী। আমাদের কৃতজ্ঞতাই গরুকে ঈশ্বরপ্রতিম করেছে। তবে যদি আপনি মানুষকে গরুর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন তবে মানুষ কেবল তার কার্যকারিতাই বলতে পারে। গরু এমন একটি প্রাণী, যার বুদ্ধি সবচেয়ে বোকা লোকের চেয়েও কম। আমরা যদি গরুকে ঈশ্বর হিসাবে বিবেচনা করি তবে তা মানুষের জন্য অপমান হবে। নিতান্ত অশিক্ষিত মূর্খ ছাড়া গরুকে কেউ মা বলতে পারে- এটা আমার বিশ্বাস হয়না”।
সাভারকার গরুর পূজা না করে বরং গরুর যত্নের জন্য অনুরোধ করতেন। তিনি গোমূত্র ও গোবর খাওয়ার বিরুদ্ধেও তার বিরোধিতা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি গোমাংস ভক্ষণ আসক্ত ছিলেন এ বিষয়ে তেমন জোরালো প্রমাণ না থাকলেও, তিনি যে গো-ভক্ষণ বিরোধী ছিলেন না তার অসংখ্য উক্তি রয়েছে। তার লেখায় রয়েছে- “গরু একপাশে খায় এবং অন্যদিকে তার নিজস্ব প্রস্রাব এবং গোবর থাকে। লেজটা মুড়িয়ে সে নোংরা করে নিজের সমস্ত শরীর। এমন একটি প্রাণী যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বোঝে না, কীভাবে সে ঈশ্বর হিসাবে বিবেচিত হতে পারে”?
আজকের ভক্তরা গরুর প্রস্রাব এবং গোবরকে পবিত্র বিবেচনা করে, যেখানে নিচু জাতের হিন্দু আম্বেদকারের মতো মানুষের ছায়াকেও অপবিত্র বলে মনে করা হয়। এটাই সাভারকরের কৃতিত্ব, তিনি নিজে যা ভেবেছেন বা করেছেন- RSS তার সবগুলোকে নেয়নি মুসললাম বিরোধিতা ছাড়া, RSS এর পরবর্তী প্রজন্ম সাভারকরের নামে ভারতীয় হিন্দু সমাজকে দূষিত করেছে গোবর খাইয়ে। সাভারকরের যুক্তি ছিল- “গরুকে খাদ্য হিসেবেও পরিবেশন করবেন কি করবেননা সেটা আপনা রুচি। লড়াইয়ের সময় বা দুর্ভিক্ষের দিনগুলিতে কিম্বা দারিদ্রতার কারনে গোপালন যখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তখন গোহত্যা করার ভুড়িভুড়ি প্রমাণ আছে শাস্ত্রে”। সাভারকরের কোনো বইতে কোথাও লেখা নেই- গোহত্যা করা যাবেনা, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে গোহত্যা করতে হবে তার বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে।
হিন্দুত্ববাদী দর্শনের জন্য পরিচিত সাভারকারের বিখ্যাত উক্তি আছে- “আমাদের গরুর যত্ন করা উচিত, পূজা করা নয়। গোমূত্র সেবন এবং গোবর ভক্ষণকে ঘৃণা করুন, প্রাচীন ভারতে পাপীদের শাস্তি বিধানের জন্যই গোবর ভক্ষণ করানো হতো”। আজকের ভক্তপিতারা এই লাইনকে বেমালুম উড়িয়ে দিয়ে সব ভক্তের পেটে ও মগজে গোবর ভরে দিয়েছে, নতুবা গোহত্যার দায়ে কীভাবে মুসলমানেদের নির্বিচার হত্য, তাদের সম্পত্তি লুঠপাঠ সহ সকল ধরনের অত্যাচার করানো যাবে!
আগেই বলা হয়েছে গরু ছিল সাভারকারের কাছে ব্যবহার্য জন্তু, এবং তার পুজো তিনি অর্থহীন মনে করতেন। সুপারহিউম্যান কোয়ালিটির মানুষ গরুকে পূজা করতে পারে এই ধরনের হাস্যকর প্রক্রিয়া তার মতে বুদ্ধিহত্যা করে থাকে। তার এই অত্যুগ্র অবস্থানের জন্যই সাভারকার দীর্ঘকাল হিন্দুত্ববাদীদের কাছে প্রত্যাখ্যাত ছিল।
দ্বিতীয়ত যে কারণে সাভারকার সাধারণভাবে প্রত্যাখ্যাত ছিল তা হলো আন্দামান সেলুলার জেলে থাকাকালীন সময়ে তার একের পর এক ক্লিমেন্সি পিটিশান বা ক্ষমাভিক্ষা পত্র প্রদান। বলা হয়ে থাকে, যে হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের পথে দেশকে পুনর্নির্মাণের ইচ্ছায় চালিত হয়েই সাভারকার বৃটিশ কারাগার থেকে মুক্তি আদায়ের জন্য ক্ষমাভিক্ষা ও শেষ পর্যন্ত মুক্তি আদায় করেছিলেন। সাভারকার অনুভব করেছিলেন যে উত্তর-দক্ষিন পূর্ব-পশ্চিমে হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ নয়, এমনকি তিনি আন্দামানে আর্য সমাজের ধারণাকে ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথে মানুষকে পুনরায় হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত করতে প্রস্তুত ছিলেন।
হিন্দুত্ববাদীরা এই প্রধান পার্থক্যকে বর্ণনা করেন এইভাবে যে, সাভারকার তার হিন্দু পুনরুত্থানের ধারণাকে রাজনৈতিক দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ধর্মীয় কারণে নয়। তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তার মতে এটি ছিল হিন্দু সভ্যতা এবং হিন্দু জীবনযাপন। সাভারকার ভয়ঙ্কর রকমের মুসলিম, খৃষ্টান ও আদিবাসী বিদ্বেষী ছিলেন। কিন্তু সবার আগে তিনি নিজে ছিলেন আদ্যোপান্ত নাস্তিক এবং বর্ণভেদ বিরোধী।
‘স্বঘোষীত’ বীর সাভারকার হিন্দুত্ববাদীদের একমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মুখ, যিনি মার্সাই-এ ব্রিটিশ বন্দিত্ব থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং যার ফলশ্রুতিতে ১০ বছর আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দী জীবন কাটান। বৃটিশের কাছে তিনি একাধিক ক্ষমাভিক্ষা পত্র পাঠান, যাতে তিনি জানিয়েছিলেন যে এরপর থেকে তিনি ব্রিটিশ উচ্ছেদ নয়, স্বাধীনতা আন্দোলন নয় বরং সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ববাদ নিয়ে তার প্রচার ও প্রসারকল্পে জীবন অতিবাহিত করবেন, যা আরো কয়েক শতক দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের জন্য কার্যকরী হবে।
তৃতীয়ত তিনি ছিলেন হিন্দুধর্মের অন্তর্লীন অস্পৃশ্যতা ও বর্ণভেদ বিরোধী। অস্পৃশ্যতাবিষয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের দেশ ও সমাজের কপালে একটি কলঙ্ক রয়েছে – অস্পৃশ্যতা। কোটি কোটি হিন্দুর ধর্ম এবং রাষ্ট্র এই কলঙ্কে অভিশপ্ত। আমাদের এভাবেই তৈরি করা হয় আর আমাদের শত্রুরা একদলকে অন্যদলের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে, আমাদের মধ্যে বিভাজন এনে সফল হতে থাকে। আমাদের অবশ্যই এই মারাত্মক অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে হবে। এই বর্ণ-অহংকারটি ব্রাহ্মণ থেকে চন্ডাল পর্যন্ত সমস্ত হিন্দু সমাজের হাড় চুষছে, এবং বর্ণ-অহংকারের ঘৃণার কারণে গোটা হিন্দু সমাজ বর্ণ-বিভেদ-আধিপত্যে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে”।
কথিত আছে সাভারকার গরুর মাংস বিশেষভাবে পছন্দ করতেন। গরুর মাংসের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে হিন্দু চরমপন্থীদের অনুভূতি আহত হয় এবং এ তারা ক্ষুব্ধ হয়। তারা গরুর উপাসনা করে কিন্তু গরুর মাংস রফতানিতে নীরব থাকে। এমনকি যখন কেন্দ্রে একটি আপাতদৃষ্টিতে হিন্দুত্ববাদী সরকার রয়েছে, তখনও গরুর মাংস রাজনীতিবিদদের পক্ষে একটি ভোট ব্যাংক এবং স্ব-ঘোষিত ‘গো-রক্ষক’ এবং ঈশ্বরের রক্ষাকারীদের আয়ের উৎস। গরু দীর্ঘকাল ধরে ভারতে হিন্দু ধর্মের প্রতীক এবং তাই পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। হিন্দুদের মধ্যে সাধারণ ধারণা হ’ল ভারতে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে খাদ্যের জন্য গোহত্যার সূচনা হয়েছিল। অথচ হিন্দুশাস্ত্রে এমনকি মনুস্মৃতিও গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে না। চরক সংহিতায় গরুর মাংসকে বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কিন্তু দিনের শেষে সেই সাভারকর কেন আজকের হিন্দুত্ববাদীদের নায়ক?
কারন তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন- মাত্র ১২ বছর বয়সে একটা গ্রামীণ অশান্তির সময় দাদা গণেশের নেতৃত্বে বেশ কিছু সহপাঠী জুটিয়ে গ্রামের মসজিদ ভেঙেছিলেন খেলার ছলে, যার ফলে সেখানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এখানে তার বিখ্যাত লাইন হচ্ছে, “আমরা মসজিদটিকে আমাদের মনের সুখ মেটাতে ভাংচুর করেছিলাম”।
সুতরাং এহেন ব্যাক্তি যে মোদী-অমিতশাহদের গুরু হবে তাতে আর আশ্চর্য কি!
এই কারনেই এতদিন পর একজন, আদ্যোপান্ত নাস্তিক, পরধর্ম বিরোধী এবং একই সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী মানুষের ইতিহাসের পাতা থেকে পুনরুত্থান ঘটিয়েছে RSS-BJP। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ বা নাগপুর ব্র্যাণ্ড হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা সাভারকারকে স্বীকৃতি দিতে মরিয়া- ওই ১২ বছরে মসজিদ ভাঙ্গার গুনগত কারনেই। সাভারকারের নাম গান্ধীহত্যার সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও, গান্ধীর উত্তরাধিকার গুজরাটি শক্তিধর বেনিয়ারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে- কারন সাভারকরই এদের মধ্যে প্রথম মসজিদ ভাঙার কৃতিত্ব অর্জন করতে পেরেছিল- যা বাবরি মসজিদ ভাঙা পরবর্তী বিজেপিকে একটা রোল মডেল দিয়েছিল।

মূল লেখাঃ পার্থ প্রতিম মৈত্র।
সম্পাদনা ও সংযোজনাঃ হককথন

শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

এয়ারপোর্ট অবরোধ হোক

 



বিমানবন্দর অভিমুখী সকল রাজপথগুলোকে অবরোধ করুক কৃষকেরা ও তাদের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা সাধারণ দেশপ্রেমিক আমজনতা। ফলস্বরূপ, যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের সাথে, বিমানের জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ হয়ে গোটা বিমান পরিসেবাই স্তব্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু কখনই যেন রেলপথ অবরোধ নয় লকডাউনোত্তর পরিস্থিতিতে, প্রয়োজনে সড়ক অবরোধ তুলে দেওয়াও যেতে পারে।

পোষ্ট সঙ্গত মনে করলে নির্দ্বিধায় শেয়ার করুন কপিপেষ্ট করে।

বিমানবন্দর অবরোধের কারণ সমূহঃ

১) বিমান গণপরিবহণ ব্যবস্থা নয়। বিমানবন্দর ব্যবহারকারীরা এবং বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করা পণ্য সামগ্রী অনেকটাই দামি ও মূলত সেই পণ্য বিত্তশালী পরিবারের হাতে যাচ্ছে যারা কোনভাবেই কৃষক আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থক নয়৷

২) বিমান তথাকথিত ধনী সম্প্রদায়ের পরিবহণ ব্যবস্থা আমাদের দেশে, সকল বড় বড় সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা, মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক নেতা, বিদেশী পর্যটকেরা বাঁধার সম্মুখে পড়লে সরকারকে বাধ্য হয়ে আপসে আসতে হবে।

৩) লকডাউনে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই ভেঙ্গে পড়েছে, দীর্ঘদিন স্থবির অবস্থায় বসে থাকা সাধারণ মানুষ সদ্য চালু হওয়া রেল যাত্রী পরিষেবা ও পণ্য পরিষেবার যৎসামান্য সুযোগ পেতে শুরু করেছে। ফলে গণ রেল অবরোধ করলে তার দুর্ভোগ সাধারণ খেটেখাওয়া শ্রমজীবি মানুষের সাথে কৃষকদেরও প্রতক্ষ্য এবং পরোক্ষ ক্ষতির কারন হবে।

৪) রেল পরিষেবা বিঘ্নিত হলে প্রতিটি রেলস্টেশনের উপর নির্ভরশীল মানুষের রুজিরোজগার বাধাপ্রাপ্ত হবে, বিশেষ করে রেলবাজার গুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা কাঁচামালের ব্যবসা।

৫) গ্রামীণ ও মফঃস্বলের স্বল্প পুঁজির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, অসুস্থ রোগীরা যারা রেলপথের উপরে নির্ভরশীল, তারা চরমভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এতে করে সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটাবে শাসকদল ও তার চামচা মিডিয়া, আন্দোলনের ওপর গণসমর্থনে বিভেদ সৃষ্টি হবে।

৬) রেল পরিবহন নতুন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, জনবিরোধী কেন্দ্র সরকার সেই ক্ষতির দোহাই দিয়ে বেসরকারিকরণের পক্ষে তোড়জোড় নেওয়া শুরু করে দেবে।

৭) আন্দোলনকারীরা উগ্রতা দেখিয়ে রেলের কোনো ক্ষয়ক্ষতির প্রচেষ্টা চালালে মূলত তাদের রেল পুলিশ GRPF এর মুখোমুখি হতে হবে, GRPF সংশ্লিষ্ট রাজ্য পুলিশ থেকেই ডেপুটেশনে যায়, আপাতদৃষ্টিতে আলাদা আলাদা রাজ্য গুলিকে ইনভলভ করে দেওয়া হবে, যদিও আন্দোলনের সবটাই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। বিমানবন্দরের সুরক্ষা কর্মে CISF একাই নিয়োজিত থাকে যা সম্পূর্ণভাবে সরাসরি কেন্দ্রের অধীনে, এখানে লড়াইটা কৃষক বনাম কেন্দ্রীয় সরকার হয়ে যাবে।

#SupportFarmersProtest
#BlockAirportRoad
#এয়ারপোর্টঅবরোধ

শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ১০

দশম পর্ব

তৃণমূল আজ বিজেপি জুজুর ভয় দেখাচ্ছে ক্ষমতায় থাকতেই, কিন্তু বিজেপি কতটা নিকৃষ্ট তৃণমূলের চেয়ে? পরিসংখ্যান বলছে তৃণমূলের ২১১টা MLA এর মাঝে ৩২ জন মুসলমান, যেখানে জনসংখ্যার জনপ্রতিনিধি হিসাবে ৫৭ জন মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করা উচিত ছিল, সেখানে প্রায় অর্ধেক জনকে সুযোগ দিয়েছে তৃনমূল। অথচ ৪% ব্রাহ্মণ, কিন্তু ৪৭% জনপ্রতিনিধি তারাই। মন্ত্রীসভায় পূর্ণমন্ত্রী ২৮ জন, মুসলমান মাত্র ৩ জন মাত্র, মাত্র ১০%। তাও তাদের একজন রেজ্জাক মোল্লা, মন্ত্রীত্বের টোপেই তাকে দল ভাঙালো হয়েছিল, অন্যজন ফিরহাদ হাকিম যে দক্ষিন কোলকাতা ও তল্পিবাহক কোটায়। প্রসঙ্গত দক্ষিণ কোলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের প্রতিটা বিধায়কই পূর্ন মন্ত্রী। কিন্তু মন্ত্রী সভাতে ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ১২ জন, ৪৩%!


খান চারেককে রাষ্ট্রমন্ত্রীর ললিপপ দিয়ে রেখেছে জেলা কোটায়, ব্যাস। সবচেয়ে প্রহসনের হচ্ছে সংখ্যালঘু মন্ত্রীও খোদ মমতা ব্যানার্জী। তৃণমূল পূজা কার্নিভাল ১টা করেছে, বিজেপি এলে ২০টা করবে। ওয়াকফের ইমামভাতার পিঠে সরকারি করের টাকায় পুরোহিত ভাতা দিয়েছে। পীর নামের মিসকিন গুলোকে কিছু ফকিরি অর্থ দেওয়ার পাশে- ইস্কন, রামকৃষ্ণ মঠ, মতুয়াদের শয়ে শয়ে কোটি টাকা ও জমি বিলিয়েছে। তৃনমূল ক্লাবের নামে টাকা বিলিয়েছে, বিজেপি গরুর নামে টাকা বিলোবে।

জেলখানাগুলোতে রাজনৈতিক বন্দির ৭৩%ই মুসলমান, বিজেপি শাসিত রাজ্যের চেয়েও বেশি। সুতরাং মুসলমান কী হারাবে যা তৃনমূল দিয়ে রেখেছিল? বিজেপি শাসিত রাজ্যে কি মুসলমানেরা হলোকাষ্টে নেই হয়ে গেছে? এখানে তৃণমূল বিপদে আছে মুসলমান নয়, আর হিন্দুও বিপদে নেই- বিজেপির ক্ষমতা লিপ্সা আছে।

এমতাবস্থায় বিজেপির মেরুকরণ রাজনীতির এজেন্ডার দৌলতে মিমকে তারা অর্থ ও অন্যান্য সুরক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিলে মুসলমানেদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে ভাল বই খারাপ কিছু নেই। হায়দ্রাবাদের পুর নির্বাচনই দেখুন, আদ্যোপান্ত সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা সম্বলিত ভাষনের উপরে ভর দিয়ে ভোটপর্ব শেষ হলো। মিডিয়া থেকে জনগণ সকলেই এটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আগামী ৪-৫ মাসে অভ্যস্ত হয়ে যাবে সাম্প্রদায়িক কথাবার্তায়। হায়দ্রাবাদের সামান্য পুর নির্বাচনে বিজেপি তার পূর্ণ শক্তি নামিয়ে দিয়েছিল, অমিত শাহ থেকে জেপি নাড্ডা আদিত্যনাথ থেকে কে ছিলনা যে যায়নি! কিন্তু সেটা তেমন কোনও বড় ঘটনা নয়, ঘটনা হচ্ছে নিজেদের জন্মস্থলেই ১৫০ আসনের মধ্যে মাত্র ৫১টা কেন্দ্রে প্রতিযোগিতা করেছে মিম; কারন সেখানে বিজেপির থেকে কোনও সহযোগিতা পায়নি তারা।

হায়দ্রাবাদ পুরসভার ফলাফল বলছে সেখানে মিম কনটেষ্ট করা ৫১টার মধ্যে ৪৪টা জিতেছে, কিন্তু বিজেপি ৪৮টা আসনে জিতেছে চন্দ্রশেখর রাও এর TRS কে ধরাশায়ী করে। মিম ও কংগ্রেস যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে TRS এর ৪৪টা এবার বিজেপির ঝুলতে চলে গেছে। অঙ্কটা সোজা, এই চন্দ্রশেখর রাও, চন্দ্রবাবু নাইডু, প্রফুল্ল মোহান্ত, সুখবীর সিং বাদল, মেহবুবা মুফতি, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, মমতা ব্যানার্জী, এরা সবকটা সংখ্যালঘু মুসলমান প্রেমীর ভেকধরা RSS এর দালাল, যারা বিজেপির ভূমি তৈরি করেছিল নিজ নিজ রাজ্যে সঙ্ঘের সংগঠন ব্যবহার করে।

কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ভুলেই গেছিল যে RSS এর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম BJP, সুতরাং জো ধরা জমিতে দালালদের কাজ কি, তাই হায়দ্রাবাদ পুরসভায় দালাল TRS কে খেয়ে নিয়েছে সঙ্ঘ, ফুটেছে পদ্ম। কাল তৃণমূলেরও এই দশাই হবে এটাকে আগাম অনুধাবন করে মমতা ব্যানার্জী কিছু তৃণমূলপন্থী মুসলমান ভক্তকে বাজারে ছেড়ে রেখে ‘BJP খারাপ তৃনমূল ভালো’র সাথে ‘মিম সাম্প্রদায়িক’ বলে উদোম চেঁচাচ্ছে। মিম নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক এতে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু তৃণমূল যে ২১ বছর ধরে বিজেপিকে লালন করে গেল কখনও মন্ত্রীসভায় থেকে কখনও RSS এর দালাল হিসাবে, সে কি তাহলে? আসলে পাব্লিক জেনে গেছে ‘বিজেমূল’ জুটি আসলে RSS এর গোয়ালে এক গোঁজেই বাঁধা। মিম অন্তত RSS এর দালাল গুলোর মতো মেকি সেকুলার পোশাক পরে নেই; স্বভাবতই, মিম এরাজ্যে জন্মাবার আগেই তৃণমুলীদের রাত্রের ঘুম হারাম করে রেখেছে TRS এর দশা হবার ভয়।

পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বড় প্রশ্ন, বিজেপি কি পারবে ২০১৯ সালে পাওয়া ৪০% ভোট ধরে রাখতে? ভুলে গেলে চলবেনা বৈষ্ণবনগরের মতো ৭৩% মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি জিতেছিল। কীভাবে জিতেছিল! আসলে মমতা ব্যানার্জী আগুন নিয়ে খেলেছিল, নিজেদের পকেট ভোট বিজেপিতে ট্র্যান্সফার করে ‘সওদা’ করেছিল কোনো ফায়দার। এমন আসনের সংখ্যা নেহাত কম কিছু ছিলনা বাংলায়, যেখানে বিজেপির হয়ে তৃনমূল সরাসরি ভোট করেছিল, তাই বিজেপির চ্যালেঞ্জটাও সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ভক্ত অঙ্ক না কষেই ‘ঘোষ মন্ত্রীসভা’ বানিয়ে ফেলেছে, আসলে তারা তো ভক্ত- নির্বুদ্ধিতা ভক্তের অলঙ্কার; এদেরই কেউ কেউ ভোট পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে পারে।

গণতন্ত্র মানেই বহুমত, কিন্তু মুসলমান ও দলিত সমাজের মতকে কে কবে মান্যতা দিয়েছে! নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যের সিঁড়ি বানিয়েছে এই দুই সম্প্রদায়কে। দলিতেরা পড়ে মার খেলেও তাদের চোখ খুলবেনা, তারা দিনের শেষে সেই মনুবাদকেই সত্য ধরে নিয়তি মেনে নেবে। কিন্তু মুসলমানেরা কেন আজও ভিক্ষা চাইবে? সমস্যা শুধু মুসলমানে নয়, বরং গরীব মুসলমানে। ধনী তবুও নিজেকে কিছুটা সুরক্ষিত করতে পারে অর্থের ক্ষমতায়, গরীবের শুধু উপরওয়ালা ভরষা।

জন্মভূমি ভালবেসে বাপের ভিটেতে রয়ে যাওয়া মুসলমানেরা “আমরা বঞ্চিত, আমরা অত্যাচারিত” এই চিৎকারই করে গেছে গত ৭০ বছর ধরে, কি লাভ হয়েছে? কেন সুফল মেলেনি নিজেদের জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেনি। বরং সহানুভূতি আদায়ের জন্য উচ্চবর্ণের মনুবাদী শাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে নিজেদের শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কখনও নিজেরা জোটবদ্ধ হবার প্রয়োজন বা সাহস করে উঠতে পারেনি, আত্মসমালোচনা করে এই অবস্থা থেকে বেরোনোর রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করেনি। বরঞ্চ সিদ্দিকুল্লার মতো কিছু নেতা(!) সুলভে বিক্রি হয়ে গেছে নিজের বালবাচ্চার স্বার্থ সুরক্ষিত করতে।

মুসলমান ও দলিতদের উপরে আমহারে অত্যাচার করা যেত একটাই কারনে, সেটা হল তারা ছিল অশিক্ষিত ও গরীব। বিভিন্ন বেসরকারী মিশনের কল্যাণে এখন মুসলমান লেখাপড়া শিখছে, জ্ঞান বাড়ছে, বুঝতে শিখছে। মুসলমানদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে। চাইলেই আর মুসলমানকে দলদাস বানিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। অনেক মুসলমানই তাদের সাংবিধানিক অধিকার বুঝে নেওয়ার জন্য আওয়াজ তুলছে। মনুবাদীরা এটাকে জিহাদী সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় ত্রুটি না রাখলেও আসলে এতে লাভ কিছু হবেনা। গেরুয়া সন্ত্রাসের উল্টোপিঠে জিহাদেরই জন্ম হয়, দুটোই গুয়েই এপিঠ ওপিঠ। আরএসএস গোটা সমাজকে আড়াআড়ি বিভাজন করে সাম্প্রদায়িকতার উন্মেষ ঘটিয়েই রেখেছে, সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হবে তাদেরই দেখানো পথে। মিম তো একটা উপলক্ষ্য মাত্র।

গঠনমূলক ভাবনা ছাড়া সমানে সমানে লড়াই দেওয়া যায়না। ধর্মান্ধতাকে সেকুলারিজম দিয়ে রোখার চেষ্টা শেষ ৪০ বছর ধরেই চলছে, সুতরাং তা দিয়ে যে ধর্মীয় উন্মাদদের মোকাবেলা করা যায় না- এই বোধটা আর কবে আসবে! এবারে অন্য পথ অনুসরণ করবেই অত্যাচারিত দলিত-মুসলমান, যে পথে বিজেপি-RSS সমাজের বুকে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তাতে সমাজ আরো বেশি অশান্ত হবে আগামীতে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আবার নতুন মানচিত্র লেখা হতে পারে ৪৭ এর মত।

দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও অখন্ডতা রক্ষার দায় কি শুধুই সংখ্যালঘু মুসলমানদের?

....ক্রমশ

বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৯


নবম পর্ব

সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে RSS ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকলে বিজেপি করে তেমন কিছু পাওয়া চরম কঠিন। সেই নিয়ম মেনে মুকুল রায়ের কপালে একটা রাজ্যসভার পদও জটেনি, তার ছেলে তো রাজনীতিই ছেড়ে দেওয়ার গল্প শুনিয়েছে। দিলীপ ঘোষ আর জগদীশ ধনখোর দুজনই- নিজেরাও জানে তাদের কেন আনা হয়েছিল বিজেপির নের্তৃত্বস্থানীয় পদে। এদের সকলের উদ্দেশ্য একজনই- কবি, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, বাণীশিল্পী, চলচ্চিত্র বিশারদ, সর্প বিশারদ, মাওবাদী বিশারদ, ঘেউঘেউ, ফেউফেউ, ফটাফট ইত্যাদি মাল্টি প্রতিভার অধিকারিণী।


যিনি রোজ নিউজের শিরোনামে থাকতেন অপ্রয়োজনীয় উদ্ভট আলফাল মন্তব্য করে। তাঁর শিরোনামে থাকাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই বিজেপির ওই দুই ভাঁড়ের আগমন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দী তথাগত রায়, দিলীপ-ধনখোরের জুটির ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, নিয়মিত অসভ্য আলপটকা মন্তব্য করে। ‘অপমানদা’, ‘বাঘের বাচ্চা’, ‘সোনা আবিষ্কার’ শব্দ গুলো বললেই আপনি বুঝে যাবেন কার কথা হচ্ছে, এভাবেই রোজ লাগাতার হরেক তামাশা করে মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তাতে মারাত্বক ভাগ বসিয়েছে এনারা ‘সাফল্যের সাথে’। কোনো শিক্ষিত রুচিশীল মানুষের পক্ষেই এই ধরনের আধা উন্মাদ কাজকর্ম শোভনীয় নয়, কিন্তু লড়াই আর ভালোবাসায় সব কিছুই যে শোভন।

লকেট, অগ্নিমিত্রা, বেগুনী বর্ণের রঞ্জিত ‘কারিয়াকর্তা’ সহ বাকি ১৭টা নমুনা থুড়ি সাংসদকে দিয়ে যে বিধানসভা ভোট হবে না- সেটা মোক্ষম জানে RSS; আর জানে বলেই শুভেন্দুদের দরকার তাদের, ভুলে গেলে হবেনা যে RSS/বিজেপি মনিরুলকেও দলে নিয়েছিল ভোটের রাজনীতির তাগিদে। তবে বিজেপি'র মার্কেটিং স্ট্রাটেজির সামনে বাকিরা অনেক পিছিয়ে। ওদের হোমওয়ার্ক RSS সম্বৎসর করে চলে আন্ডার কারেন্ট। সাথে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড বৈধানিক সংস্থা গুলো, বিপুল অর্থ আর লজিস্টিক সাপোর্ট দেয় বড় আর মাঝারী ব্যবসায়িক ঘরানা।

RSS-BJP এটাও জানে ১৮টা আসন যত না বিজেপির পক্ষে ছিল তার চেয়েও আপাদমস্তক (৭০-৩০ ভাগে) চোরেদের দলটিকে হারাবার প্রয়াস ছিল মানুষের। বামেরা নিজেরাই নিজেদের উপরে ভরষা করে উঠতে পারেনি, কংগ্রেস তো রবি ঠাকুরের- ‘তুমি কি কেবলই ছবি…’ কবিতার বস্তুরুপ। এখানেই মিমের শুভ গৃহপ্রবেশ- বঙ্গীয় রাজনীতিতে।

মিমের ভোট মূলত মুসলমানেরা, জেলা ভিত্তিক যদি দেখা যায়, ২০২০ এর নিরিখে সেই হিসাবটা দাঁড়ায় -

মুর্শিদাবাদ জেলা- ৭১%
উত্তর দিনাজপুর জেলা- ৫৪%
মালদহ জেলা- ৫১%
বীরভূম জেলা- ৩৯%
উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলা- ৩৬%
নদিয়া জেলা- ২৯%
কোচবিহার জেলা- ২৮%
হাওড়া জেলা- ২৮%
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা- ২৭%
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা- ২৬%
কোলকাতা জেলা- ২২%
বর্ধমান জেলা- ২১%
হুগলী জেলা- ১৯ %
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা- ১৫%
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা- ১২%
পুরুলিয়া জেলা- ৮%
বাঁকুড়া জেলা- ৮%
দার্জিলিং জেলা- ৬%
জলপাইগুড়ি জেলা- ২%

২৯৪টি আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায়, কমপক্ষে ১১৫টা এমন কেন্দ্র আছে যেগুলো মুসলমান অধ্যুষিত, ১৫টি জেলা জুড়ে। এগুলোকে পাখীর চোখ করে মিম যদি ঝাঁপায়, সেক্ষেত্রে কার কপাল পুড়বে, কে লাভবান হবে! প্রসঙ্গত এখানে বলে রাখা দরকার যে, বিজেপির ভোটার ও মিমের ভোটার সম্পূর্ণ আলাদা, দুটো বিপরীতধর্মী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আড়াআড়ি ভাগ করে দেবে হিন্দু-মুসলমানে। অতএব বেঁচে থাকে জাতীয় কংগ্রেস, তৃনমূল ও বামেরা। কংগ্রেস ও বামেরা গত লোকসভাতেই দেওয়ালে সেঁটে গেছে, তাহলে বাকি রইল কে?

মমতা ব্যানার্জী সাচার কমিশনের রিপোর্ট দেখিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তারপর রাজ্যের মুসলমানেদের অবস্থা আরো খারাপ থেকে খারাপতর হয়েছে দিনকে দিন। কিন্তু এমন কোনও সরকারি পরিসংখ্যানও নেই যে আপনি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন। তা সত্বেও শুধুমাত্র সরকারি চাকরির দিকেই যদি নজর দিন, দেখবেন তৃণমূল জামানায় মুসলমানেরা কতজন চাকরি পেয়েছে! সেভাবে কোনো চাকরিই দেয়নি মমতা সরকার, সুতরাং কেউ না পেলে মুসলমানেরাই বা কোত্থেকে পাবে! মিথ্যা ঢপের বাইরে আর কিছুই দেয়নি, দুধেল গরু বলে অপমান ছাড়া। বলার মতো একটা মুসলমান নেতা পর্যন্ত রাখেনি তাদের দলে, যারা আছে সবই তল্পিবাহক ও কোটার উমেদার, বাকিরা জেলাস্তরে সীমিত।

পাশাপাশি থাকা দুটো মুসলমান ও অমুসলমান গাঁয়ে গিয়ে দেখুন, উন্নয়ন বুঝে যাবেন। আজও ভোটের ময়দানে মরে মুসলমান, মারেও মুসলমান। মুসলমানকে ভোটের স্বার্থে ব্যবহারের ট্রাডিশন প্রতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে তৃনমূল জামানায়। মমতা ব্যানার্জী তার রাজত্বকালে মুসলমানেদের মতো প্রবঞ্চনা আর কারো সাথে করেনি, যেটা অনেকটাই বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। পঞ্চায়েত স্তরে যে সকল মুসলমান নেতারা আছে তারাও ঠুঁটো জগন্নাথ, গোটা রাজ্য প্রশাসন চলছে BDO দের দিয়ে। তৃনমূল দলটা চালাচ্ছে থানার বড়বাবু, মেজবাবুরা, কারন এদেরকে সরাসরি নবান্ন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই বিডিও ও থানার কর্তাবাবুদের মাঝে কতজন মুসলমানকে উচ্চপদে পদে বসিয়েছে মুসলমান দরদী ‘হিজাবে’ সাজা মমতার সরকার?

সীমাহীন তোলাবাজি, তার জন্য এলাকার দখলদারি, প্রচারসর্বস্ব মিথ্যাচার ও অশ্লীল দলবাজি করতে গিয়ে গোটা ‘পঞ্চায়েতী সরকার’ ব্যবস্থা ভেঙে পরেছে নিকৃষ্ট প্রশাসনিক ব্যর্থতায়, আর বাজারি পত্রিকায় এটারই বিজ্ঞাপন দিচ্ছে রোজ ‘মরার আগে হরিনাম’ করার মতো। মমতা ব্যানার্জী জানে সরকারি সুফল তৃনমূলের ক্যাডারগুলোর বাইরে কারো ঘরে পৌঁছায়নি, পিকেকে এনেছিল যাতে শেষ মুহুর্তে কিছুটা শোধরানো যায় তৃনমূলের তস্করসমাজকে, কিন্তু তারা হাতের বাইরে এটা আজ গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে নেত্রী। তাই পাতাজোড়া বাজারি বিজ্ঞাপন দিয়ে মরিয়া চেষ্টা চালাতে হচ্ছে ‘দুয়ারে সরকার’। পঞ্চায়েত ভোট করতে না দিয়ে গায়েরজোরে ‘পুলিস আর গুণ্ডা’ দিয়ে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দখল করেছিল তার উন্নয়ন বাহিনী। স্বভাবতই গোটা পঞ্চায়েত ব্যবস্থাটাই সরকারি প্রকল্পের টাকা চুরির আখারার বাইরে আর কিছুই নয় আজকের দিনে।

মমতা ব্যানার্জী তার জীবনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা পেয়ে গেছে, দুর্নীতিতে ডুবে থাকা বৃদ্ধা বয়সে আর কিই বা আশা করেন তিনি! ভাইপো বিদেশী বউ নিয়ে থাইল্যান্ড চলে যাবে, বাকি নেতারা বিজেপিতে। কিন্তু মুসলমানেরা বিজেপির সাথে লড়বে NRC মাথায় করে, যা মমতা ব্যানার্জীরই আমদানি। এর পরেও মুসলমান সামান্য বেচাল করলেই NIA কে দিয়ে জঙ্গি সন্দেহে জেলে ভরে দেবে, বিনা বিচারে জীবন শেষ। অন্ধ মমতা প্রেমী মুসলমানগুলো যখন বুঝবে মমতার এই ষড়যন্ত্র, দেখবে পায়ের নিচে আর জমি নেই।

.....ক্রমশ

মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৮

 


অষ্টম পর্ব


শ্রমজীবী ক্যান্টিন বা সুলভ মূল্যের সবজি বাজারের মতো মহতি কাজ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা অংশে কিছু প্রচারণা করে নিজেদেরকে আশ্বস্ত করা যায় যে- ‘হ্যাঁ আমরা আছি বাজারে’; কিন্তু ক্ষমতায়নের জন্য ভোটের রাজনীতিতে তা যথেষ্ট নয়। মিছিলের ভিড় জেতার জন্য যথেষ্ট নয়, তাহলে বিহারে তেজস্বী জিতত আর নীতিশ কুমার হারত। শুধুমাত্র সৎ বলে, বৃদ্ধ নেতাদের চেয়ারে রেখে বিপ্লবও হয় না। তাঁরা নমস্য, ওঁনাদের নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে ভাল লাগে, লড়াই এর সেনাপতি হিসাবে তাঁরা যে অচল এটা না বুঝলে ভোটের বাক্সে কোনো সুফল অন্তত পাবে না এই নভেম্বর, ২০২০ এর পরিস্থিতিতে।

লেনিন, স্ত্যালিন, মাও, চে, ফিদেল, হো-চি-মিন প্রমুখ এনারা কেউ বৃদ্ধতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন না। এবারে দেশের দিকে একটু নজর দিন- ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ ৪৮ বছর বয়সে দেশের প্রথম বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। জ্যোতি বসু ৫৩ বছর বয়সে রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যের পুর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন। সূর্যকান্ত মিশ্র ২৮ বছর বয়সে অবিভক্ত মেদনীপুর জেলার সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। অনিল বিশ্বাস ২১ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিল, ৫৪ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদক। বিমান বসু ৩১ বছর বয়সে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। হরেকৃষ্ণ কোনার ২৩ বছর বয়েসে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন, ৫৪ বছর বয়েসে রাজ্যের মন্ত্রী। মহঃ সেলিম ৩৩ বছর বয়সে রাজ্যসভার মেম্বার হয়েছিলেন, সৈফুদ্দিন চৌধুরী ৩২ বছর বয়সে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। ভি এস অচ্যুতানন্দ ১৭ বছর বয়সে পার্টি মেম্বার হয়েছিলেন। আর কত উদাহরণ চাই!

এই তাজা রক্ত ছিল বলে বামেরা দেশে একটা শক্তি হিসাবে উঠে এসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল, এখনকার পার্টি নেতৃত্বে আছে এমন তাজা রক্ত? ভক্ত কমরেডরা বলবেন- সায়নদীপ, ময়ূখ, মীনাক্ষী, সৃজন বা প্রতিকুর কি নেই রাজ্য কমিটিতে! সত্য হলো এরা কেউ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নয় যাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। নতুনদের সুযোগ না দিলে তাদের থেকে কীভাবে আরেকটা অনিল বিশ্বাস, জ্যোতি বসু, সৈফুদ্দিন চৌধুরিরা জন্মাবে! হাস্যকর হলো এই তালিকাতে ফুয়াদ হালিমই নেই, অথচ দেশে বামপন্থী মুসলমান মুখের মধ্যে তিনি সুপরিচিত। তাই আগে ঘরে বিপ্লব করে নের্তৃত্বে বিপুল তাজা রক্ত আনতে হবে বঙ্গ বামেদের, তার পরে না হয় সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্টদের সাথে লড়াই করবে।

কারা বিজেপিতে বা অন্য দলে যাচ্ছে ও কেন যাচ্ছে, সেই খবরের আগাম সন্ধান লাগিয়ে যাবার আগেই বহিষ্কার করার সংগঠনটুকু নেই বামেদের। কোথাও একটা পার্টি অফিস দখল করার সংবাদে আনন্দ থাকুক, প্রত্যয় থাকুক, আত্মবিশ্বাস বাড়ুক, কিন্তু সেটাকে পাবার যোগ্যতা কতটা নিজেদের শক্তিবলে আর কতটা চালচোরেদের গোষ্ঠী কোন্দলের ফলে ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’ সেটুকু বোঝার ক্ষমতা ফিরলে তবে সেই আনন্দের সার্থকতা।

তৃণমূল কংগ্রেস পরিস্থিতি আবার ভিন্ন ধরনের, মমতা ব্যানার্জী নিজেও জানেন না কে আমার দলে আর কে বিজেপিতে গেছে। ভোটের দিন ঘোষণার পর যদি বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর নাম মমতা ব্যানার্জী হয় তাতেও কিছু আশ্চর্যের নয়। গোটা তৃণমূল দলটাই ১০ বছর ধরে লাগামহীন দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। তাদের কুচো, মেজো, বড় সব নেতাগুলো CBI, ED, IT দপ্তরের হাতে বন্দী হওয়ার ভয়ে বিজেপির ঘরে রোজ হাজিরা দিয়ে আসে। কিছুজন আবার লেজেন্ড, যেমন শুভেন্দু, রাজীব ব্যানার্জীরা; ‘ঠিকঠাক দর পেলেই যাইব’ মোডে আছে। অবশিষ্টগুলো আম্বানি আদানির থেকে কামানো বিজেপির টাকার থলির দিকে চেয়ে দিন গুণছে- “মেরা নাম্বার কাব আয়েগা!”

প্রশান্ত কিশোর- চোরেদের মাঝে ‘কম্বলের লোম বাছার’ কাজ ছিল তার। সে ভাবছে আমার ৫০০ কোটির শেষ কিস্তি পাই না পাই, তার আগেরটা পেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতে পারলেই জান বাঁচে, মান হারালেও সেটা অন্যত্র ম্যানেজ করে নেবে আগামীতে। তবে তারাও মিডিয়া সেল তৈরি করেছে, বিজেপিকে টক্কর দেবে। এ দিক থেকেও বামেরা ১০ বছর পিছিয়ে, ভারতবর্ষের অন্যতম ধনী রাজনৈতিক ক্যাডারভিত্তিক দল হয়েও পেশাদার IT Cell নেই। অতি উৎসাহী কিছু বাম সমর্থক নিজেরা ঘরের খেয়ে সমানে বিজেপি আর তৃণমূলের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যায়। ফেসবুক-টুইটারের মতো প্রো-বিজেপি সংস্থার বিরুদ্ধেই এদের লড়তে বাম-কংগ্রেসী সমর্থকদের, নিত্যদিন ব্লক ও ‘প্রোফাইল উড়িয়ে দেওয়া’র মতো এক অসম লড়াই। তবু তারা লড়ছে বলেই সোশ্যাল মিডিয়াতে বামেদের অস্তিত্ব টুকু আছে।

বাম বা কংগ্রেসের IT সেলের নামে যারা আছে এক আধাজন, তারা প্যারালাল ঘোঁট পাকাতে ব্যস্ত। দুদিন কয়েকটা বড় নেতার সাথে ছবি তোলা হলেই নিজেদের কক্সিসে এক্সট্রা লেজের উপস্থিতি টের পেয়ে যায়। ব্যাস, তখন তাদের জ্ঞানের নমুনা, ঔদ্ধত্য ও আঁতলামো দেখলে মনে হবে তারাই প্রশান্ত কিশোর বা অমিত মালব্যের শিক্ষাগুরু। আগেই বলেছি, বামেদের দ্বাপরযুগের নের্তৃত্ব আজও পুষ্পকরথে বিশ্বাসী, সুপারসনিক জেট প্লেনে তাদের কি যায় আসে! চেয়ারে বসে থাকার জন্য কি আর রথ লাগে না জেট প্লেন লাগে! প্রয়াত সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যরা অদৌ জানেন যে IT cell খায় না মাথায় মাখে!

বিজেপি অমিত মালব্য সহ বাকি প্রোপ্যাগান্ডা টিমকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আশার কথা হলো প্রশান্ত কিশোর ফেল মেরেছে বাংলাতে, তার কোনও প্রজেক্টই চলেনি। মালব্যদের গুরুর এই হাল হলে মালব্য-আঁখিদাস কতটা সফল হবে তা যথেষ্ট সন্দেহের।

.....ক্রমশ

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

বিহার নির্বাচনঃ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ৭



সপ্তম পর্ব


দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসী বা বামেদের পক্ষে থাকা জনগণ যারা ২০১৯ সালে তৃণমূলের বিপক্ষে পদ্ম চিহ্নে ভোট দিয়েছিল, তারা কেউ বিজেপির আদর্শে অন্ধ ভক্ত হয়ে যায়নি। এরা শ্রেনীগতভাবে বিজেপির ভোটারই ছিলনা, তৃণমূলের অত্যাচারের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে ‘সিপিএম-কংগ্রেস’ সম্পূর্ন ব্যর্থ হওয়াতে এরা পদ্মে ছাপ পেরেছিল, বাঁচতে। সুতরাং এরা বিজেপি ছাড়া অন্যকে কখনও ভোট দেবে না এটা ভাবা মুর্খামি। যদিও বিজেপির পয়সা খেয়ে সংবাদের চ্যানেলগুলো বিজেপির পক্ষে আপনাকে এই হিসাবই কিন্তু দেখাচ্ছে ও দেখাবে।

কখনও ভেবেছেন- মুসলমান অধ্যুষিত রায়গঞ্জ, মেদনীপুর, মালদা ও বর্ধমান-দুর্গাপুর উত্তর কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছিল কীভাবে? এছাড়া বর্ধমান পুর্ব, কুচবিহার, মালদা দক্ষিণ, জঙ্গিপুর, বসিরহাট, উলুবেড়িয়া, আরামবাগ, যাদবপুর, জয়নগর, তমলুক, ঘাটাল, বোলপুর, বীরভূম কেন্দ্র গুলোতেও বিপুল পরিমাণে মুসলমান ভোটার রয়েছে, এখানে বিজেপির দ্বিতীয় স্থানে থাকাটা আসলে বিজেপির জয় নয়- তৃণমূলের বিরুদ্ধে অনাস্থা। এই সব অঞ্চলের অন্তত ২০% মুসলমান বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল, নতুবা ভোটটা বিজেপিকে দিয়েছিলো কে?

তৃণমূলও বিজেপির ওই চূড়ান্ত হিন্দুত্ববাদী হাওয়াতে ৪৩-৪৪% ভোট ধরে রেখে দিয়েছে মূলত মুসলমান ও সেকুলার ভোটের উপরে ভর করেই, যারা এক সময় বামেদের খাস ছিল। বামেদের আর হারাবার কিছু নেই, এখন সামনে সবটাই প্রাপ্তিযোগ- যদি সদিচ্ছা থাকে। গ্রহণযোগ্য নতুন মুখকে সুযোগ দিলে বামেরা যে জমি ফেরাতে পারবে না এমনটা মোটেও নয়। ওদিকে অধীর চৌধুরীর নের্তৃত্বে কংগ্রেস কিছুটা হলেও সোমেন মিত্র বা প্রদীপ ভট্টাচার্যের আমলের চেয়ে যে চাঙ্গা হবে সেটাও সহজে অনুমেয়, আর যাই হোক অধীর অন্তত বিকিয়ে যাবেনা এই বিশ্বাস মানুষের আছে।

রাজ্যের CPIM তথা রাজ্য বাম নের্তৃত্ব এখনও ২০১১ এর হারের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সিপিএমই মূল দল, বাকিদের অবস্থা ততোধিক খারাপ।
সিপিএমের বুদ্ধদেববাবু আনুষ্ঠানিক ভাবে অবসর ঘোষণা করেছিলেন, বাকিরা ‘না তাড়াইলে যাব না’ মোডে রয়ে গেছেন পদ আঁকড়ে। দলে কিছু যুবকেরা যারা উঠে এসেছে স্বচেষ্টায়, তাদের চেষ্টার খামতি নেই স্বল্প পরিসরে, কিন্তু পার্টির প্রতিটি উচ্চপদে সেই মুখগুলোই রয়ে গেছে যাদের নের্তৃত্বে বামেরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল।

শেষ ১০ বছর যাবৎ এই বৃদ্ধতন্ত্রেরই কঠোর অনুশীলনে ক্রমক্ষয়ে প্রান্তিক শক্তিতে এসে দাঁড়িয়েছে রাজ্য বামশক্তি। এই মুখগুলো যতদিন থাকবে ততদিন বামেদের ভাল হওয়ার জো নেই, এই বোধটা আসতেই হবে বাম সমর্থকদের মাঝে; তাতে যে যা খুশি যুক্তি দিক। খোদ মমতা ব্যানার্জীও চায় এই অথর্বেরাই থাকুক, তাতে তার পক্ষে সুবিধাজনক ক্ষমতায় টিকে থাকা। তথ্য বলছে, বামেদের নের্তৃত্বের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের জন্যই ১০% শক্তির বিজেপিকে রাতারাতি ৪০% তে পৌঁছে দিয়েছিল বামেদের পক্ষে থাকা ১৯% জনগণ, এদের অনুসরণ করেছিল কংগ্রেসের ৮% ভোটার।

বঙ্গ বামেরা আজও নভেম্বর বিপ্লব নিয়েই নভেম্বরের প্রথম দুটো সপ্তাহ ব্যস্ত ছিল। পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে USSR বললে যে শব্দের মানে ৯৯% মানুষ বুঝতেই পারবে ‘কিসের’ কথা বলছে। সেই ‘নেই রাষ্ট্রের’ প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান যিনি পার্টি ক্লাসে নব্য কমরেডদের জন্য মূল্য রাখলেও, উনি আজকের সাম্প্রদায়িক শক্তির শাসানিযুক্ত বাংলা তথা ভারতের জনসমাজে কতটা যুক্তিযুক্ত- সেটা উপলব্ধি করতে শেখেনি। তাই আজও আসমানি পোলাও রেঁধে চলে কমরেডদের অধিকাংশ জন, অতএব লেনিন নামের ঘি ঢালতে কার্পণ্যের প্রশ্নই থাকে না। যোগ্য নের্তৃত্বের অভাবে ভোগা একটা দলে এমন পথভ্রষ্টতা অত্যন্ত সাধারণ বিষয়, আর লাগাতার এমন ‘কৃষ্টির চর্চা’ করার ফলস্বরূপ দিনে দিনে নিজেদের ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে তথাকথিত খেটেখাওয়া মানুষের কাছে।

আজকের বদলে যাওয়া ডিজিটাল পৃথিবীর একটা ক্ষুদ্র গন্ডীর মাঝেই নিজেদের বেঁধে নিয়েছে কমরেডদের ‘অধিকাংশ’ বাহিনী। এই গন্ডীতে নিজেরাই একে অন্যের পিঠ চুলকায়, গা শোঁকাশুঁকি করে, পিঠ চাপড়ে দেয়, যে পৃথিবীতে তারা ভিন্ন আর অন্য কেউ নেই।

এমনিতেই মেইনস্ট্রিম ভারতীয় মিডিয়া বামেদের পক্ষে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা করেনা, যেখানে বামেদের নেতা-কর্মীরা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে পাবে।
বামমনস্ক কেউ বামেদের সমালোচনা করলেই বামাতি আঁতেল গোষ্ঠী (পড়ুন ভক্ত) তাকে সর্বপ্রথমেই ‘স্বল্পজ্ঞানী’, ‘নির্বোধ’, ‘নিরক্ষর’ ও বামাদর্শ থেকে বিচ্যুত মনে করে ও করায়। সমালোচক যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাস রাখে, তাকে এরা সরাসরি বিরোধী শত্রু ভাবে। অতিবাম হলে তাকে শ্রেনিশত্রু বলে দায়িয়ে দেয়। আসলে সেই পিঠ চুলকানোর গল্প; সবাই বলতে চায়, কেউ শুনতে চায়না।

বস্তুত নিজেদের আয়নায় দেখতে এরা ভয় পায়, আসলে ময়দানে লড়াই না করেই তো নেতা হয়ে গেছে ‘কোটা’ সিস্টেমে, আতরের গন্ধ যাবে কীভাবে! কেউ মানুক বা না মানুক তাতে সত্য বা বাস্তব পরিস্থিতি বদলাবে না। বহু বাম সমর্থকের এই প্যারাগ্রাফ পড়ে আমাকে গালি দিতে পারেন, আসলে ভক্ত তো তারাই যারা বাস্তব ও তথ্য না বুঝে শেখানো কাগুজে বুলি আওড়ে যায় অন্ধবিশ্বাসে, আর বামেদের মাঝে কিছু শতাংশ ভক্ত নেই এমনটা দাবী পলিটব্যুরোও করে না।

...ক্রমশ

রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০

হায়দ্রাবাদ, মিম ও বাস্তবতা



হায়দ্রাবাদ পুরসভার ফলাফল বলছে সেখানে মিম কনটেষ্ট করা ৫১টার মধ্যে ৪৪টা জিতেছে, কিন্তু বিজেপি ৪৮টা আসনে জিতেছে চন্দ্রশেখর রাও এর TRS কে ধরাশায়ী করে। মিম ও কংগ্রেস যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে TRS এর ৪৪টা এবার বিজেপির ঝুলতে চলে গেছে।

অঙ্কটা সোজা, এই চন্দ্রশেখর রাও, চন্দ্রবাবু নাইডু, প্রফুল্ল মোহান্ত, সুখবীর সিং বাদল, মেহবুবা মুফতি, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতা, নীতিশ কুমার, মমতা ব্যানার্জী, এরা সবকটা সংখ্যালঘু মুসলমান প্রেমীর ভেকধরা RSS এর দালাল, যারা বিজেপির ভূমি তৈরি করেছিল নিজ নিজ রাজ্যে সঙ্ঘের সংগঠন ব্যবহার করে।

কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে থাকতে ভুলেই গেছিল যে RSS এর নিজস্ব রাজনৈতিক দলের নাম BJP, সুতরাং জো ধরা জমিতে দালালদের কাজ কি, তাই হায়দ্রাবাদ পুরসভায় দালাল TRS কে খেয়ে নিয়েছে সঙ্ঘ, ফুটেছে পদ্ম। কাল তৃণমূলেরও এই দশাই হবে এটাকে আগাম অনুধাবন করে মমতা ব্যানার্জী কিছু তৃণমূলপন্থী মুসলমান ভক্তকে বাজারে ছেড়ে রেখে ‘BJP খারাপ তৃনমূল ভালো’র সাথে ‘মিম সাম্প্রদায়িক’ বলে উদোম চেঁচাচ্ছে।

মিম নিশ্চিত সাম্প্রদায়িক এতে কারো সন্দেহ নেই, কিন্তু তৃণমূল যে ২১ বছর ধরে বিজেপিকে লালন করে গেল কখনও মন্ত্রীসভায় থেকে কখনও RSS এর দালাল হিসাবে, সে কি তাহলে? আসলে পাব্লিক জেনে গেছে ‘বিজেমূল’ জুটি আসলে RSS এর গোয়ালে এক গোঁজেই বাঁধা। মিম অন্তত RSS এর দালাল গুলোর মতো মেকি সেকুলার পোশাক পরে নেই; স্বভাবতই, মিম এরাজ্যে জন্মাবার আগেই তৃণমুলীদের রাত্রের ঘুম হারাম করে রেখেছে TRS এর দশা হবার ভয়

ফেসবুকীয় সিপিএমঃ ফিউজড আইনগাইডেড কামিকাজে ড্রোন

  ফেসবুকের ‘সিপিএম’ নামক এই চুড়ান্ত আঁতেল ও প্রায় সর্বজ্ঞ গোষ্ঠীটার পূর্ণ বোধোদয় বা পূর্ণ বিনাশ না ঘটা অবধি রাজ্যের বাম নেতৃত্বের খুব বেশী ...