ধর্মীয় শোভাযাত্রা এখন দাঙ্গা বাঁধানোর মূল অস্ত্র, নাগপুরের হিন্দুত্ব আধিপত্যবাদীরা ভারতের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করছে দিয়েছে; যার মেরামতিতে কয়েকটা দশক লাগবে এদের সম্পূর্ণ নির্মূলকরনের পরেও।
RSS এর কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোকে- নূন্যতম ১০ মিনিট হলেও স্থানীয় কোনো মসজিদের সামনে এসে ডিজে বাজিয়ে উদ্দাম নাচনকোঁদন, বাজি ফাটানো, তীব্র ঘৃণাসূচক স্লোগান দিতেই হবে। এর উপরেই তাদের অস্তিত্ব টিকে আছে; যেখানে মুসলমান আর মসজিদ অপসন নেই, সেখানে এদেরকে আদিবাদী ও ব্রাহ্মণ ব্যতিত অন্যান্য ‘ছোট জাতের’ হিন্দুদের উপরে আক্রমণ করতে হবে। এসবের পেছনে রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভের অঙ্ক ছাড়া কিচ্ছুটি নেই, নুন্যতম সামাজিক কিম্বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য খোঁজা অর্থহীন সময় নষ্ট। একটা সময় অবধি এই ধরনের ঘটনাগুলো মূলত রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী জাতীয় হাতেগোনা অনুষ্ঠানের দিনেই সীমাবদ্ধ ছিলো, আজ ১২ বছর ধরে মহাদানবের শাসনের পর- যে কোনো উঠতি হিন্দুত্ববাদী নেতা, যার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রবল, কিম্বা যে নেতার সদ্য ডিমোশন হয়েছে, তাদেরকে লাইমলাইটে আসতে গেলে একটাই সহজ পথ; মসজিদের সামনে গিয়ে তান্ডব করো কিম্বা কোনো গরীব মুসলমানকে প্রকাশ্যে হেনস্থা করো। এই পদ্ধতিতে, বিজেপির আদর্শগত অভিভাবক ‘সঙ্ঘ পরিবারের’ নেক নজরে এলেই, তাকে সরাসরি সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপদে নিয়োগ দিয়ে পুরষ্কিত করা হচ্ছে প্রতিটা ক্ষেত্রে।
মুসোলিনির ফ্যাসিস্টদের প্রতি মোহগ্রস্ত কিছু গোঁড়া ও সুবিধাবাদী বেইমানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত RSS হলো হিন্দু আধিপত্যবাদের মোড়কে নিকৃষ্ট উগ্র জাতীয়তাবাদীর জনক, যারা রাজনীতি করে ধর্মের বর্ম বানিয়ে। ইহুদী জায়োনিজম ছাড়া আজকের পৃথিবীতে RSS-এর মতো এমন ইতর প্রতিরূপ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ভারতীয় হিন্দু ধর্মতত্ত্বের উৎসের দিকে তাকালে দেখবেন- এটা সেই অর্থে শ্রেণিবদ্ধ ও কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত কোনো ধর্ম ব্যবস্থা নয়, বিবিধতাই এর মূল পরিচয়বাহক। কিন্তু ব্রাহ্মন্যবাদী যাজক সম্প্রদায় RSS এর রূপে এসে; এই বহুত্ববাদী ধর্মতত্ত্বকেই রাষ্ট্রপরিচালনার একটি প্রকল্পে রূপান্তরিত করেছে। হিন্দুধর্মের কোনো প্রধান মন্দির নেই, যেমন ক্যাথলিকদের ভ্যাটিকান বা মুসলমানদের মক্কা-মদিনা আছে। হিন্দুধর্মে পোপের মত কোনো একক ধর্মগুরু নেই যার একক বাণীই ধর্মের শেষ কথা। RSS ঠিক এই সুযোগোটাকেই লুফে নিয়েছে, নিজেদেরকে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক নিয়ামক বানানোর প্রচেষ্টাতে লেগে রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য ‘হিন্দু-রাষ্ট্র’ স্থাপনের মাধ্যমে ধর্মীয় সুড়সুড়ি তাদের প্রধান অস্ত্র। এখন হিন্দুরাষ্ট্র বানাবার প্রথম ধাপ কি? মুসলমান ও তাদের ধর্মীয় উপাসনাস্থল মসজিদে আক্রমণ। এখান থেকে অশান্তির মূল শুরু।
মসজিদের সামনে নেচে জাতিগতভাবে হিন্দু ধর্মের কোন উন্নতি আজ অবধি হয়েছে? মানে বিজেপির নেতাদের ছাড়া আম হিন্দুর কোনো লাভ হয়েছে? উস্কানিমূলক আচরণের মাধ্যমেই ‘সঙ্ঘ সংশ্লিষ্ট’ গোষ্ঠীগুলো ঘৃণার বারুদ ভরা শব্দে শাওয়ার হয়ে গোটা দেশজুড়ে তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য বা ক্ষমতা প্রদর্শন করে চলেছে। মূলত কোনো বড় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরনের জন্য ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করে এরা, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়। যারা মনের মাঝে ইসলামোফোবিয়া পালন করে, সেই ভোটব্যাংক শক্তিশালী হয় এই বিভিষীকা দেখে। উস্কানি ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি এদের অন্যতম উদ্দেশ্য, যাতে অপর পক্ষকে উত্তেজিত করে কোনো হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে যায়। তখন সেটাকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়। এর মাধ্যমে মুসলমান সম্প্রদায়ের মনে ভয় বা নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করা যায় সহজে, যাতে তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তৃতীয় শ্রেনীর নাগরিক হয়ে যায়।
আর এই সবকিছুকে নির্মান করা হয় জাতীয়তাবাদের গাঁজা খাইয়ে। ‘জয় শ্রীরাম’ যেমন বিজেপির রাজনৈতিক স্লোগান, ‘ভারত মাতা কি জয়’ও তাদের রাজনৈতিক স্লোগানের অংশ বর্তমানে। কট্টরপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবধারা থেকে সর্বসমক্ষে অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের সামনে নিজেদের ধর্মীয় শক্তির প্রকাশ ঘটানো এখন প্রতিটা বিজেপি সরকারের বীরত্বের প্রতীক। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার যে কাঠামো ছিলো, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সম্প্রীতি ছিলো, তা এই বারো বছরে শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হয়নি, অনেকটা তলিয়ে গেছে। ঘৃণার বিষ সমাজের কয়েকটা প্রজন্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে- চাইলেই যা রাতারাতি উদ্ধার করা যাবেনা।
কয়েকটা উদাহরণ দেখুন, এই সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর; উত্তর প্রদেশর মিরাট শহরের ঐতিহাসিক শাহী জামা মসজিদ নাকি সম্রাট অশোকের আমলের একটি মঠ ধ্বংস করে নির্মাণ করা হয়েছিল। একজন নাগপুরী জঙ্গি রামকুমার শর্মার অভিযোগের ভিত্তিতে মসজিদটিতে তালা লাগিয়ে দিতে বলেছিলো নিম্ন আদালত, স্থানীয় প্রশাসন যথারীতি বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যের শতবর্ষ প্রাচীন ব্রিটিশ আমলের শাহারানপুর মসজিদে বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে, একই জমিতে একই সময়ে নির্মিত মন্দিরটি অক্ষত রয়েছে। ওদিকে মোরাদাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্থানীয় মুস্তাফা মসজিদের তত্ত্বাবধায়কে ভবনের নকশা চেয়ে একটি নোটিশ জারি করেছে। এটাকেও যেকোনো দিন ভেঙে দেবে, তার আগে একটু আইনি আইনি খেলার নকশা না করলে কেমন যেন মজা আসেনা। অথচ একই মালিকের দান করা জমিতে এই মোরাদাবাদ জামা মসজিদের ঠিক পাশেই থাকা জৈন মন্দির নিয়ে না হিন্দুত্বের রক্ষাকর্তা না প্রশাসন- কারো কোনো সমস্যা নেই।
মহারাষ্ট্রের অচলপুরে কানওয়ার যাত্রার সময় স্থানীয় একটি মসজিদের সামনে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান সম্বলিত যাত্রাপালাটি প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ নভনীত রানা এবং বিজেপি বিধায়ক প্রবীণ তায়েদের উপস্থিতিতে চলেছে। বেশ কয়েকঘন্টা ধরে মসজিদ অবরুদ্ধ রেখে, সেখানে হনুমান চালিসা পাঠ করা হয়। সবচেয়ে মজা হলো পুলিশ ও প্রশাসন এই নির্দিষ্ট গেরুয়া জঙ্গিদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়, যাতে তারা সুশৃঙ্খল ভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। আগামীতে যখন ইতিহাস লেখা হবে, স্টেট স্পনসর্ড টেরোরিজম কাকে বলে, এই গুলো প্রতিটার উল্লেখ থাকবে আগামীর গবেষকদের জন্য।
গবেষনা প্রসঙ্গে বলি, Routes of Wrath: Weaponizing Religious Processions নামের একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিলো- ‘সিটিজেন অ্যান্ড লইয়ার্স ইনিশিয়েটিভ’ দের দ্বারা। Weaponizing Religious Processions: Communal Violence During Ram Navami and Hanuman Jayanti (April 2022) শীর্ষক এই রিপোর্টে বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে RSS ও নানান শাখাগুলো পরিকল্পিত দাঙ্গা বাঁধায়, দাঙ্গার নেপথ্যভূমি কী থাকে, পুলিশ-প্রশাসনই-বা কী ভূমিকা নেয়, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি আর মিডিয়াই-বা কী ভূমিকা পালন করে। পারলে রিপোর্টটি অবশ্যই পড়ে দেখবেন।
মন্দির নয়, মসজিদই হচ্ছে RSS এবং তার হিন্দুত্ববাদী শাখা সংগঠনগুলির মূল উপাসনালয়, মুসলমান বিরোধিতার এক ভয়ঙ্কর শাণিত অস্ত্র। এরা মন্দিরে সাধন ভজন করুক বা না করুক, মসজিদের সামনে এসে নাচতেই হবে, নাহলেই ‘হিন্দু খতরেমে হ্যাঁয়’। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ফায়দার লক্ষ্যে মুসলমানদের আক্রমণ আর থকথকে ঘৃণা মেশানো বিষাক্ত স্লোগান একে অপরের পরিপূরক, যে শোভাযাত্রার রঙ গেরুয়া। যে রং আবহমানকাল ধরে ভারতীয় সন্ন্যাসীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার প্রতীক, যে রং ভারতের জাতীয় পতাকার অঙ্গ- সেই গেরুয়া আজ ঘৃণা, বিদ্বেষ, ভয়, ধ্বংস, দাঙ্গা, হত্যা, বুলডোজারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। চেতনাহীন উন্মত্ত কিছু যুবক-যুবতী, তাদের উন্মাদ-তাণ্ডব নাচ, হাতে হাতে নাচে যুগপৎ ধারালো অস্ত্রশস্ত্র, লাঠিসোটা, আগ্নেয়াস্ত্র- আর জারিকেন ভরা সহজদাহ্য জ্বালানি।
RSS স্বীকৃত একদল জঙ্গি গেরুয়া রংটাকে অবলম্বন করে সমস্ত তাণ্ডব গুলো চালাচ্ছে। গৌতম বুদ্ধের চীবর, শংকরাচার্য, স্বামী বিবেকানন্দ সহ রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রম- সকলে গেরুয়া রং ব্যবহার করে এই রংকে শান্তির প্রতীক হিসাবে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছেন। ব্যক্তিগত সংসার, সম্পদ, ভোগ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের জীবন ত্যাগ করে তবে নিজেকে প্রকৃত গেরুয়া রঙে রাঙানো যায়। RSS এর দূর্বৃত্তের দল নিজেদের নিকৃষ্ট উদ্দেশ্য ও ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে- হিন্দুত্বের অস্তিত্ব ও চলমান আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়ে গিরগিটির মতো গেরুয়া রঙে নিজেদের ছাপিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে।
রং বিভাজনের যে নিকৃষ্ট খেলা, যেটার সফল পরীক্ষা তৃণমূল কংগ্রেসের মাধ্যমে বাঙলাতে করিয়েছিল RSS, সেটা আজ বাঙালির মননে ঢুকে গেছে। একটা রাজনৈতিক দলের পতাকা তৈরি হয়েছে কংগ্রেসের পতাকাকে চুরি করে, যেখানে নীল সাদা রঙের কোন অস্তিত্বই নেই, অথচ তৃণমূল নামক দলটির অস্তিত্ব টিকে আছে নীল সাদা রঙের মধ্যে। এই নিকৃষ্ট সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সমাজের নিচের দিকে একশ্রেনীর লুম্পেন তৈরি করেছে বলে ভুল হবে, বাঙালি সমাজের মাথা থেকে পা অবধি বায়োলজিক্যাল ফর্মটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। পৃথিবীর যে কোন দেশে রেড কার্পেট বিছানোর মাধ্যমে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়। এটাই সভ্যতার গতিপথের অভিমুখ, মানুষ যেমন উল্টোদিকে হাঁটতে পারে না, সিগন্যালের আলো লাল, হলুদ আর সবুজের বাইরে অন্য কিছু ব্যবহার করতে পারেনা- তেমনই রেড কার্পেটও একটা একক। অথচ একদল অজ গেরুয়া রঙের কার্পেট বিছিয়ে পুরনো নীল সাদা মূর্খ ঐতিহ্যের উত্তরসূরী হতে চাইছে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা সুপরিকল্পিত।
রামনবমী তো রামের জন্মোৎসব পালন, কোথায় সেই ধার্মিক আদি দেবতা সূর্যকে জলদান? কোথায় অধর্মের বিনাশ আর শুভশক্তির জয় আকাঙ্ক্ষায় উপবাস, বৈদিক মন্ত্র, রাম কাহিনি পাঠ! কোথায় রামভজন! নাগপুরের হিন্দুত্বে পরিভাষায় তা এখন শুধুই মসজিদ কেন্দ্রিক, যার মূল মন্ত্র হচ্ছে মুসলমান বিদ্বেষ ও তীব্র ঘৃণাসূচক গালিগালাজ। এই ধর্মোন্মাদদের চরম অধর্ম আর অশুভ পরধর্ম বিদ্বেষ দেখে, জানিনা কতজন প্রকৃত ধর্মপ্রাণ হিন্দু শিউরে উঠছেন, কিন্তু এটাই আজকের ভারতীয় মুসলমানদের রোজনামচা।
অথচ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উচিৎ ছিল সংবিধান মানা। সংবিধানের মৌলিক অধিকার রক্ষা, নাগরিকের কর্তব্য পালন, আইনসভার সদর্থক প্রতিক্রিয়া, সমঅধিকারে সংখ্যালঘুর বাঁচার শর্ত, নিজ ধর্ম পালনের অধিকার- এগুলোই তো সংবিধান। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যখন ধর্মীয় সন্ত্রাসকে হাতিয়ার বানায়- তার বর্তমান রাষ্ট্রচালককে ক্ষমতায় চির অমর করে রাখতে, তখন আইন অন্ধ হয়ে যায়, প্রশাসন সন্ত্রাসীদের সুরক্ষা দেয়। তবে না দেশ জুড়ে এই ঘৃণার শোভাযাত্রার অনুমতি পায়, এবং আইন ধৃতরাষ্ট্র সেজে থাকে। দেশের আলপথ থেকে রাজপথ, ঝুপড়ি-বস্তি, মহল্লার পর মহল্লা সর্বত্র এই ঘৃণার ছত্রাক পৌঁছে দিয়েছে RSS, তার বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এমন হরেক কিসিমের হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি শাখা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে। এ যদি রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ না হয়, তবে সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞা কী কেউ বোঝাবেন?
প্রতিটা দাঙ্গার নিখুঁত তথ্য উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরন গচ্ছিত রয়েছে প্রশাসন ও আদালতের কাছে। তার পরেও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি পুলিশ-প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল বা সরকারের মদতে একের পর এক সংখ্যালঘুর উপরে অত্যাচার ও দাঙ্গা সংঘটিত করে চলেছে- দেশের সর্বোচ্চ আদালত অবধি নিশ্চুপ, এর চেয়ে বড় তামাশা আর কি হতে পারে! বিগত ১৫ বছরে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও উত্তরাখণ্ডে, এই নাগপুরী আদর্শের গুন্ডাদের হাতে আক্রান্তদের শেষ সম্বলটুকুও ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন-পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুলডোজার নামিয়ে প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে। উপরে উল্লেখিত রিপোর্টটির সম্পাদক, সিনিয়র অ্যাডভোকেট চন্দর উদয় সিং প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন- কীভাবে বিগত ৭৮ বছরে স্বাধীন ভারতে ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে দাঙ্গা বাঁধানোর অস্ত্র হিসাবে বারবার ব্যবহার করেছে RSS এর হিন্দুত্ববাদী জঙ্গীরা।
ঔপনিবেশিক সময়ে ১৮৬০ সালে প্রথম ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি চালু হয়। তার ১৮৮ ধারায় বলা হয়েছে, প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া নির্দিষ্ট রাস্তা ছাড়া ধর্মীয় শোভাযাত্রা, মিছিল করলে, এবং তার জন্য যদি দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয় তবে, যারা জেনেবুঝে ওই রাস্তায় মিছিল করেছে তা্রা ঐ ধারা মোতাবেক অপরাধী। ১৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, দাঙ্গা ঘটানোর জন্য প্ররোচনা দেওয়া হলে ৬ মাস জেল এবং সেই প্ররোচনার ফলে দাঙ্গা ঘটলে এক বছরের কারাদণ্ড হবে। প্রতিটা দাঙ্গার ক্ষেত্রেই সংবেদনশীল অঞ্চল দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়া এবং প্ররোচনা বা উস্কানি দেওয়ার ব্যাপারটা মুখ্য ছিল। পুলিশ-প্রশাসনের দুর্বলচিত্ততা, হিন্দুত্ববাদীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও গোপন বোঝাপড়াই মূলত এই হানাহানির পিছনে কাজ করে। আইন-আদালত উপেক্ষা করে দাঙ্গাহাঙ্গামার প্রত্যুত্তরে পুলিশ-প্রশাসনের শিখণ্ডীর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী দোষী।
একটা সময় সরকার ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা দাঙ্গা ঘটলে তীব্র দুঃখ ব্যক্ত করতেন, দাঙ্গার কারণ নির্ধারণ করতে তদন্ত কমিশন বসানো হত এবং দাঙ্গার শিকার ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হত। বিজেপির আমলে সরকার অস্বীকার করার সহজ পন্থা নিয়েছে, এবং নানান হাস্যকর ‘আপাত অজুহাতের’ দায় দেখিয়ে লজ্জার আবরনটুকুও ঝেড়ে ফেলেছে। এখানেই থেমে না থেকে, অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে দাঙ্গাকারীদের রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে MLA/MP বা মন্ত্রী বানিয়ে। তদন্ত কমিশনের বদলে বুলডোজার পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট মুসলমান মহল্লার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, জীবন-জীবিকা, ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এক্ষেত্রে আদালত অব্ধি বিচার যাওয়ার আগেই, স্থানীয় প্রশাসন ও বিজেপির নেতৃত্বই- বিচারক ও জুরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যায়, পুলিশ এখানে বুলডোজার বাহিনীর সর্দার হয়ে ফাঁসুড়ের ভূমিকা পালন করে দক্ষতার সাথে। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উচ্ছেদ, ধ্বংসাত্মক কাজকে ধামাচাপা দেওয়া, লন্ডভন্ড অবস্থা সাফসুতরো করার জন্য- স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পুর কর্তৃপক্ষকে দিয়ে, নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে পুলিশ এগুলোকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করায়।
আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের বাইরে আর যার অবদান সবচেয়ে বেশী এই মসজিদ সংস্কৃতিতে, তা হলো Archaeological Survey of India নামক সংস্থার। বিজ্ঞান ও পুরাতাত্ত্বিক প্রমানের চেয়ে, Religious outcomes আর public sentiment বেশি গুরুত্বপূর্ণ এদের কাছে; কারন এগুলোই রাষ্ট্রীয়ভাবে হিন্দুত্বের মিথ মেকিং টুল হিসাবে কাজ করে। ASI অফিসিয়ালি লিখিত বিবৃতি দেয়না শুরুতে, স্ট্রাটেজিক লিক, সিলেক্টিভ ডিসক্লোজার দিয়েই ব্রেকিং নিউজ চালিয়ে জনমত বানিয়ে টিভি মিডিয়া বিশেষজ্ঞর দল সমাজে ছড়িয়ে দেয়। এটাই হিন্দুত্ব আর্কিওলজি, যারা অতীতকে আবিষ্কার করেনা, অতীতকে প্রোডিউস করে। ফলত, ASI বর্তমানে আর্কিওলজিকাল সংস্থা থেকে আইডিওলজিক্যাল সংস্থায় রুপান্তরিত হয়ে গেছে, যার মূল কাজ মসজিদের নিচে দেবদেবীর মূর্তি খোঁজা; অথচ ভারত একসময় সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধদের দেশ ছিল, তাদের মনাস্ট্রি আর মঠ গুলোকে কারা ভেঙেছে বা দখল করেছে? মিডিয়ার তৈরি এই হিন্দুত্বের হাওয়া বেলুনের গ্যাস ততক্ষণ, যতক্ষন বর্তমান ফর্মে মিডিয়া এগজিস্ট করবে, মিডিয়ার ঘটি উল্টালেই এই নাগপুরী হিন্দুত্বের বেলুন ফেঁসে যাবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই উগ্রবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, সেখানেও রোজ চরম সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে হয়েছে মুসলমান ও দলিতেরা। কখনও কখনও লোহার রড, ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে। এরা প্রশিক্ষিত দুষ্কৃতির মত মুখোশে ঢেকে আসে, যারা প্রত্যেকে অখিল ভারতীয় বিদ্যা পরিষদ (এবিভিপি) এর সদস্য; যারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) যুব শাখা। বিজেপির নয় কিন্তু, সরাসরি RSS এর যুবশাখা। বাংলার বামেরা আজও এই তফাৎ টিকে আত্মস্থ করতে পারেনি। বাংলার কথা উঠাতে বলি, খোদ কোলকাতার বুকে কাশিপুরের জ্যোতিনগরের একটি মুসলিম-প্রধান কলোনি, যেখানে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের বাস, সেখানে গত ২৯শে জুলাই থেকে বিজেপি সরকার পানীয় জল বন্ধ করে রেখেছে। এদের অনুশোচনা, লজ্জা, সহানুভূতি কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে।
সন্ত্রাসীদের মুখ আর মুখোশ সবসময়েই আলাদা হয়, তাই RSS নিজে কোনো নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ না নিয়ে, বিজেপির মুখোশে এই কাজটা করে। গত এক শতাব্দী ধরে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র (প্রয়োজন ফুরানো বা বেঁকে বসা নিজেদের নেতাকেও), সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় উস্কানি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপেরর মাধ্যমেই এরা আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। কিন্তু চুরি, দুর্নীতি, হিংসা, সাম্প্রদায়িক হানাহানির সাথে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি, বেকরত্বের জ্বালা ধর্মের নেশা কাটিয়ে দিয়েছে অনেকটাই- যারা কয়েক বছর আগেও RSS এরই সমর্থক ছিল। গরু শুয়োর, মন্দির মসজিদ আর পাকিস্তানের বাইরে তারা তিনটে লাইন বলতে পারবেনা, বড় অংশের জনগন বুঝেছে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির বাইরে এই অশিক্ষিত জীবাণুগুলোর আর দেওয়ার কিছুই নেই। সামনেই, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় পরাজয়ের মুখে, ফলত নতুন করে মসজিদের সামনে এই নাচ, গান, উস্কানি দিয়ে- দাঙ্গা লাগাবার ষড়যন্ত্র করছে।
এদের তৈরি জম্বিরা আজকে মনিপুরীকে শিক্ষককেও ছাড়ছেনা। ২ দিন আগে রাস্তায় বাড়ির সামনের শব্দদূষনের প্রতিবাদ করায় একজন ঐ মনিপুরী সঙ্গীত শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করে দিয়েছে। আইনের শাসন উবে গিয়ে এই সন্ত্রাসই এখন সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অত্যাচার সংস্কৃতির কথা আসলে, পশ্চিমবাংলায় গত বিধানসভা ভোটের সময় বাঙালী নিগ্রহ একটা পপুলার কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। লেখক ললিত ভাচানির ‘দ্য মেন ইন দ্য ট্রি’ (২০০২) বইতে উনি বিপুল তথ্য সহ লিখেছেন, কীভাবে RSS- আম হিন্দুদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ সৃষ্টির লক্ষ্যে মুসলিমদের ছদ্মবেশ ধারণ করে হিন্দুদের উপরে আক্রমণ অত্যাচার করেছে। বিগত ১০০ বছর ধরে RSS এর এটাই চরিত্র, আগে এটি করা হতো সংবাদপত্র, পোস্টার ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে, এখন হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি।
১৪৭ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে, শুধু মসজিদই কি অবৈধ? মন্দির বা গির্জা নয়? প্রতিটা রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবৈধ মন্দির রয়েছে, যেমন অবৈধ মাজারও রয়েছে। আইন কি শুধু মসজিদ আর মাজারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? নিম্ন আদালত গুলোও আজকাল ভারতীয় সংবিধানের চেয়ে নাগপুরী আদর্শের ভিত্তিতেই অধিকাংশ রায়দান করছে। যেখানে চার্চও রক্ষা পাচ্ছেনা, সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের পিমপ্রি-চিঞ্চওয়াড় এর ‘জিসাস ইজ লর্ড’ নামের চার্চকে দুপুরে বেআইনি আখ্যা দিয়ে মধ্যরাতেই ভেঙে ফেলা হয়, অথচ পরদিন যতক্ষণে আদালতের স্থগিতাদেশ নোটিশ আসে, ততক্ষণে ভবনটি ময়দান হয়ে গেছে। উড়িষ্যা, ছত্রিশগড়, মহারাষ্ট্র কোথায় খ্রীষ্টানদের উপরে হামলা হচ্ছেনা? RSS কে অনুকরন করতে গিয়ে, RSS এর ঘৃণার আদর্শে দীক্ষিত কোনো এক নিকৃষ্ট মোল্লা ভিড় রাস্তাতে নামাজ শুরু করে দিচ্ছে।
আইন সবার জন্য এক হোক, রাস্তায় নামাজ পরা মুসলমানটিকে যেমন আইনের আওতাতে নিয়ে সাজা দেওয়া হোক, মসজিদের সামনে উন্মাদ নাচ করা জঙ্গীগুলোকেও আইনের আওতাতে নিয়ে আসা হোক। সময় কিন্তু সর্বদা নিজের অনুকুলে থাকেনা, নদীর এক পাড় ভাঙে, অন্য পাড় গড়ে। আজ RSS শক্তিশালী, অত্যাচার করে নিচ্ছে- কাল যখন সুখের দিন ফুরাবে সময়ের পরিক্রমায়, সংগঠনটা অদৌ টিকবে তো? এতোদিন নানান ছদ্মবেশ ধরে এর তার আঁচলে লুকিয়ে টিকে ছিল, ১২ বছরের শাসনামলে সব পর্দা ছিঁড়ে গেছে কিন্তু। আপনাদের তৈরি করা ইয়েস ম্যানগুলোই কিন্তু আইন আদালত প্রশাসনের শীর্ষে আছে, কাল নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে- এরা তাদেরকেও খুশি করতে আপনাদের উপরে বুলডোজার আর মিথ্যা মামলার খড়্গ চাপিয়ে দেবে। কতটা দেওয়াল লিখন পড়োতে পারছেন জানিনা, কিন্তু সেই দিন খুব দূরে নেই এটুকু বলতে পারি।
আপনারা আর কতটুকু ক্ষমতাবান হয়েছেন! মধ্যযুগে ইউরোপের চার্চ আর তাদের ইনকুইজিশন আপনাদের এই ধর্মের ভেক আর জাতীয়তাবাদী তামাশার চেয়ে কয়েক লক্ষ গুণ বেশী শক্তিশালী ছিলো, আজ তারা কোথায়? আপনাদের কাপুরুষ বজরং দলের চেয়ে নাইট টেম্পলারেরা আলোকবর্ষ এগিয়ে ছিলো ধর্মের রক্ষার্ত্রে আর বীরত্বে; সেই তাদের আজ কোনো অস্তিত্ব আছে ইউরোপের জনজীবনে? খ্রীষ্টান ধর্ম টিকে আছে, চার্চের শাসন কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে; হিন্দুত্ব বেঁচে থাকবে আপনারা তলিয়ে যাবেন ইতিহাসের আস্তাকূড়ে। আর সে দিন অতি সন্নিকটে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন