মাননীয়া বামনেত্রী দীপ্সিতা ধরের গতকালের একটা
ফেসবুক পোষ্টের প্রেক্ষিতে এই লেখা।
শেষ ২৫ বছরে ওপার বাংলা থেকে যারা এসেছেন- তাদের কতজন রাজনৈতিক
অত্যাচারের শিকার আর কতজন ধর্মীয় অত্যাচারের শিকার হয়ে এসেছে? এর কোনো প্রামান্য তথ্য রয়েছে আপনার কাছে? থাকলে
সরাসরি লিখুক অমুক 'জামাতি' কিম্বা
তমুক 'ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিস্ট' দলের
অত্যাচারের কারনে অমুক অমুক ব্যাক্তি বা অমুক অমুক পরিবার বাংলাদেশ থেকে আপনার
দাবী মত 'বাধ্য হয়ে' পালিয়ে এসেছে। কোন
স্যাম্পেল সার্ভের ভিত্তিতে আপনি ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেললেন, তার কোনো তথ্য উপাত্ত রয়েছে আপনার কাছে? এখানেই
লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের তথাকথিত অত্যাচারিত সংখ্যালঘু জনগণের ভিটে ত্যাগের ইতিহাসের
পাশাপাশি ধান্দাবাজ সংখ্যাঘুঘুদের ‘বাধ্য হয়ে’ কাঁটা তার টপকাবার গল্প।
আমি জানিনা আপনার পরিবার, তথা আপনার পিতৃকুল
বা মাতৃকুলের কেউ ‘বাঙাল’ কিনা, তাই হলে তাঁরা কবে এদেশে
এসেছিলেন আর ঠিক কার অত্যাচারে কি কি খুইয়ে এসেছিলেন! এদেশে আসার আগে সেখানকার আইন
আদালতের কোথায় কোথায় গিয়ে নিজের ভিটেতে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে, অবশেষে ‘বাধ্য হয়েছিলেন’- আশা করি ১ বার এই তথ্যগুলোও দেবেন পাবলিক
ডোমেইনে। ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লাগবেনা, ১ বার দিলেই জাস্টিফাই
করে নেওয়া যাবে আপনি সংখ্যালঘু ছিলেন না সংখ্যাঘুঘু।
SIR শুরু হয়েছে, কেউ বলছে মুসলমান তাড়াবে,
কেউ হিন্দু বিতাড়নের স্বপ্নে বিভোর। আরে বাবা ২০০২ ‘কাটঅফ’ মার্কের
পর যারা অন্য দেশ থেকে এসেছে তারা কেউ হিন্দু নয়, বৌদ্ধ নয়,
মুসলমান নয়, এদের পরিচয় একমাত্র অবৈধ
অনুপ্রবেশকারী। নিশীথ প্রামাণিক, বিজেপির হয়ে প্রাক্তন
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, তাকে কোন মোল্লা দেশ থেকে তাড়িয়ে ছিল?
সে তো পড়তে এসে এদেশে ঘাঁটি গেড়েছিলো, এরপর
রাজনীতির কল্যাণে মন্ত্রীও হয়েছে। সে কোন CAA তে
অ্যাপ্লিকেশন করে দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছিল?
আমার এলাকাতে, মানে পুর্ব বর্ধমান জেলার,
কালনা মহকুমার নবদ্বীপ সংলগ্ন সমুদ্রগড়ে বর্তমান জনসংখ্যার ৯০% এর
বেশী ওপার বাংলার মানুষ, যা ৯০ এর দশকের শুরুতে মোট স্থানীয়
জনসংখ্যার ৩০% বা তারও কম ছিলো। শেষ পঁচিশ বছরে এরা রাষ্ট্র ভারতের বিভিন্ন নাগরিক
সুযোগ সুবিধা ও সুরক্ষা নিতেই এসেছে মূলত। ফ্রি রেশন, ফ্রি
শিক্ষা, ফ্রি স্বাস্থ্য পরিষেবা, সস্তার
পরিবহণ, অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মের নানান সুযোগ, এত বড় রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা, তুলনামূলক সস্তা জীবনযাত্রার সাথে একটা OBC বা SC
সার্টিফিকেট যোগার করে নিতে পারলেই সংরক্ষিত আসনে চাকরির নিশ্চয়তা-
আমার এলাকাতে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী। তথ্য চাইলে অন্তত ১০০টা নাম ও ঠিকানা দিয়ে
দেব, যারা ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২৪ এর মধ্যে এসেছে।
অর্ধেক বাংলাদেশী মানুষ আদম ব্যাপারিদের মাধ্যমে কামলা খটতে যায়
গোটা বিশ্বজুড়ে, এরাই ভারতে এসে ভারতীয় সেজে তারা
পার্মানেন্ট হওয়ার সুযোগ পায় নৃতাত্বিক মিলের কারনে, যা অন্য
দেশে পায়না। এই ধান্দাবাজি করতে গিয়ে আজ আমাদের এলাকার মত, কোচবিহার
থেকে কাকদ্বীপ এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেউ মতুয়া, কেউ
মায়াপুরী বৈষ্ণব, কেউ হোপবোল, কেউ
নমঃশূদ্র, কেউ কামতাপুরি, কেউ জমিয়ত
উলামা, কেউ অনুকুলের শিষ্য হয়ে, ধান্দাবাজির
প্রয়োজন মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি আর আমার এক বন্ধু লাদাখ যাওয়ার পথে ১৭০০০ ফুট
উচ্চতায় চা বিক্রেতা এক বয়স্ক মহিলাকে দেখেছি, যিনি শেষ ২০
বছরের মধ্যে এদেশে অনুপ্রবেশ করেছে, এবং নকল কাগজ বানিয়ে এই
চরম প্রতিকুল অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছেন। গোটা দেশ জুড়ে এমন সংখ্যা কোটি কোটি রয়েছে।
১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা কত ছিলো? ৪ কোটি ২০ লাখ। ১৯৭১ সালে সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত ছিলো?
৭ কোটি। একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জনসংখ্যা কত ছিলো, এমন ভাবে কখনও হিসাব করেছেন? ৪৭ সালে ছিলো আড়াই কোটি
জনসংখ্যা, ৭১ সালে ৪ কোটি ৪২ লাখ। ২০২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের
জনসংখ্যা ১০ কোটির সামান্য বেশী, বাংলাদেশে সাড়ে ১৭ কোটি। ৭০
এর দশক অবধি ভারতের জনসংখ্যা গ্রোথ রেট ছিলো ২.৫% এর মত, যা
নব্বই এর দশকের পর কমে ১.৯% এসে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই গ্রোথ রেট আরো কম।
পুর্ব পাকিস্তানের পপুলেশন গ্রোথ রেট ছিলো ২.৪% মত, বাংলাদেশ
রাষ্ট্র গঠিত হওয়া ইস্তক এরা ৩.৫ এর বেশীতে পৌঁছে দিয়েছে গ্রোথ রেট। এই হিসাবে
বাংলাদেশের জনসংখ্যা হওয়া উচিৎ ছিলো ২৪.৫০ কোটি, তার বদলে ১৭
কোটি হিসাব দেয় তারা। এই সাড়ে সাত কোটি মানুষ গুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে
গেছে কামলা শ্রমিক হয়ে, যারা আর স্বদেশে ফেরেনি। এদের সবচেয়ে
বড় অংশটা ধর্মের দোহায় দিয়ে ‘শরনার্থী’ সেজে পিলপিল করে শেষ ২৫ বছরে আমাদের দেশে
ঢুকে পরেছে, পশ্চিমবাংলা, আসাম,
নর্থ ইষ্ট, সিকিম, ঝাড়খন্ড,
উড়িষ্যা সহ পশ্চিমা রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ‘বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক’
পরিচয়ে কাজও করে। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর এরাই ভুয়ো পরিচয়পত্র বানিয়ে ‘সেটেল’ হয়ে
যাচ্ছে যে যেখানে পারছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার কোনো লুকানো বা বিচ্ছিন্ন
ঘটনা নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের উপরে
অত্যাচার করছে, এটাই সত্য, জাত পরিচয়
যা খুশি হোক। তারপরেও ১ কোটি ৩০ লাখ হিন্দু সেদেশে বসবাস করেন, সে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ গুলোতে হিন্দু শিক্ষকদের আধিক্য
রয়েছে আজও। দেশের জনসংখ্যার ৭.৯৫% হিন্দু হলেও সরকারি চাকরিতে তারা প্রায় ১৪% এর
আশেপাশে রয়েছে। এটা বাংলাদেশের জামাত বা মৌলবাদী গোষ্ঠীকে গ্লোরিফাই করার জন্যও নয়,
না বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অত্যাচারকে লঘু করে দেখাবার প্রয়াস। এটা
আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের সাথে তুল্যমূল্য ফারাক দেখাবার জন্য, যারা কেবল বাংলাদেশে ‘হিন্দু’ অত্যাচারের মড়াকান্না কেঁদে 'পালিয়ে আসা'কে জাস্টিফাই করে।
বিজেপির ভাষায় ‘মমতাজ বেগমের’ সরকারের রাজ্যে দুধেল গাই ২৭%,
সরকারী চাকরিতে এরা মাত্র ৫.৭৩%। গোটা দেশের জনসংখ্যার নিরিখে
মুসলমান ১৪%, সরকারি চাকরিতে এখানে ৫% এরও নিচে, এগুলো সবই সরকারি ডেটা। উচ্চশিক্ষিত রাজ্য কেরালা মডেল- ৩০% মুসলমান
অধ্যুষিত রাজ্যে ১৩.৮% মুসলমান রাজ্য সরকারী চাকরিতে। কেন্দ্রীয় সরকারী চাকরিতে
মুসলিম মালায়লী মাত্র ১.৮% । গুজরাতে আবার উলটপূরাণ, তাদের
জনসংখ্যার মাত্র ৯.৯% মুসলমান, সরকারী চাকরিতে ১৬% এরও বেশী
মুসলমান। উত্তরপ্রদেশে ১৯.৩০% মুসলমান, ২০১২ সালে সরকারী
চাকরিতে এদের উপস্থিতি ছিলো ১২%, যোগীর কৃপায় সেটা এখন ৫%
এরও নিচে। উত্তরপ্রদেশ থেকে কটা সংখ্যালঘু পড়শি দেশে পালিয়ে গেছে ‘বাধ্য হয়ে’।
আসলে পালানটা চয়েস, যেটা রক্তে থাকতে হয়,
সকলে পলায়ন মনোবৃত্তি রাতারাতি জন্ম দিতে পারেনা অধিকাংশ ‘বাংলাদেশী
হিন্দু’ দের মত। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক ও আনপপুলার হলেও- গাজায় গণহত্যা হয়েছে লাগাতার
আড়াই বছর ধরে, নৃশংস নারকীয় সেই অত্যাচার গোটা বিশ্ব সাক্ষী।
কতজন পালিয়েছে দেশ ছেড়ে? ট্রাম্প নিজে তাদের পুনর্বাসনের
প্রস্তাব দিয়েছিলো, তারা ভিটে ছাড়তে চায়নি। ভিয়েতনাম?
আফগানিস্তান? কিউবা? ইয়েমেন?
কারা পালিয়ে গেছে? জঙ্গলমহলের কয়েক হাজার
মানুষ মাওবাদী তথা তৃণমূলের হাতে মারা গেছিল। তারা তো পূর্ব বাংলার সংখ্যাঘুঘুদের
মতো পালিয়ে যায়নি। পলায়ন একটা চয়েস, একমাত্র অপসন নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষেরা পৃথিবীর অত্যাচারিত মানুষদের তালিকায়
মোটামুটি সবার উপরে, কিন্তু নিজের দেশ স্বাধীন করে সেই দেশে
বসবাস করতে গিয়ে কত মানুষের জীবনহানি হয়েছে তার সংখ্যা পাওয়া মুশকিল কিন্তু কেউ
দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ানরা হিটলারের মুখোমুখি
দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিল কেউ পালিয়ে যায়নি। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী
সংঘর্ষ চলছে, আমরা যে পক্ষেরই সমর্থক হই না কেন ইউক্রেনের
লোকেরা কিন্তু পালিয়ে যায়নি। ১৯৬৫-৬৬ সালের ইন্দোনেশীয় গণহত্যা হয়, এরা কেউ পালিয়ে আসেনি নিজের ঘর বাড়ি ছেড়ে। তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ভেঙে
গিয়ে ৭ টি নূতন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে এবং দেশ গঠনের সময় প্রত্যেক ক্ষেত্রে
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ করেছে, কিন্তু কোন দেশের নাগরিক পালিয়ে
যায়নি। আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে পুরু পালিয়ে যায়নি। পালিয়ে যাওয়াটা চয়েস,
একমাত্র বিকল্প নয়।
উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় মাইগ্রেশন করাটাই সভ্যতার
পরিচয়। একে ঠিক বা ভুল নামের দুটো শব্দ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু
যারা এটাকে গ্লোরিফাই করার জন্য ‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি’ আর কাঁটাতারের গল্প
শুনিয়ে রোমান্টিক গল্প ফাঁদে, তারাই আসলে সংখ্যাঘুঘু। রক্ত
দিয়ে কেনা মাটির গল্প কোন হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসে লাগু হয়? ওপারে যদি রক্ত দিয়ে আপনারা ভিটে মাটি রক্ষা করতে পারতেন, তাহলে সেটা না হয় গণ্য হতো, এপারে শরণার্থী হয়ে
এসে কলোনির ভিক্ষার জমিতে আপনাদের বাপ দাদারা জীবন শুরু করেছিল। তারা কোন রক্তটা
ঝরিয়ে ছিলো এপারে মাটিটা পাওয়ার জন্য? ১৯৮৯ সালে প্রথম
বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ শতাংশ অংশে কাঁটাতার লাগানো হয় তৎকালীন ভারত সরকার কর্তৃক,
যার অধিকাংশটাই উত্তর-পূর্ব ভারত লাগোয়া। তাহলে কাঁটাতার পেরিয়ে
আসার গল্পটাই বা কিভাবে আসে আপনাদের পালিয়ে আসার রোমান্টিক গল্পে? ৯০ এর দশকে উন্নত জীবনযাত্রার খোঁজে আপনাদের পূর্বপুরুষ এদেশে এসেছিলি
সংখ্যাঘুঘু হয়ে, শরণার্থীর গল্প ফেঁদে। এটাকে লুকাতে বাকি
গল্পগুলো ফাঁদা।
সত্যজিৎ রায়, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক, রাজেন তরফদারের মত দিকপালের কোনো
সিনেমাতেও সেই অর্থে মোল্লাদের অত্যাচার দেখিয়েছে? সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসুদের লেখনি সময়ের সাথে একক। এনারা
কোথায় লিখেছেন খিয়েছেন যে বাংলাদেশী মোল্লাদের চরম অত্যাচারের শিকার হয়ে তাদের
চরিত্রেরা এদেশে এসেছিলেন। অথচ প্রত্যেকের নাড়ি বা শিকরের টান ছিল ওপাড় বাংলার
প্রতি। আসামে বাঙালী খেদাও একটা রেজিস্টার্ড আন্দোলন। সেখানে বহু বাঙালী বিতাড়িত
হয়েছিলো, এমন কোন আন্দোলন হয়েছিল বাংলাদেশে শেষ ২৫-৩০ বছরে?
সংখ্যাগঘুঘু বাঙালদের সাথে ইজরায়েলী ইহুদিদের হেব্বি মিল, ইহুদীদের সমালোচনা করলেই অ্যান্টি-সেমিটিক বলে দাগিয়ে দেয়। একই ভাবে
সংখ্যাঘুঘুদের সমালোচনা করলেই এ্যান্টি উদবাস্তু, এ্যান্টি
বাঙাল, এমনকি এ্যান্টি হিন্দু বলেও দাগিয়ে দেয়। সমালোচনা
হলেই যে ধুতি খুলে যায়।
শেষ ৫ বছরে শুধু গরু সংক্রান্ত বিষয়ে, RSS কতৃক
মুসলমান অত্যাচারের ঘটনাতে নানান রাজ্যে FIR ও মামলা
রেজিস্টার হয়েছে ৫৩০০ এর বেশী গোটা দেশজুড়ে। বাংলাদেশে এমন কতগুলো হয়েছে শতাংশের
বিচারে? ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল অব্দি হাসিনা ওয়াজেদের
সরকার ছিল, যারা রীতিমতো হিন্দু সমর্থক এবং হিন্দু রক্ষাকারী
হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিত। এদেশের সংখ্যালঘুরা লড়াই করছে আদালতে গিয়ে, কেউ তো দেশ ছেড়ে পালায়নি। ওপাড়ের সংখ্যাঘুঘুরা লড়াই না লড়ে পালিয়ে আসছে
কেন! তারা নেপালেও যেতে পারত, কিম্বা শ্রীলঙ্কাতে! যায়নি,
কারন ওখানে RSS নেই, ‘বাধ্য
হয়েছে’ গল্পে রাজনীতির রুটি সেঁকা যায়না, তাই তাদের সেটেল
করে দেওয়ার চক্রও নেই। ১৯৭১ এর পরে বাংলাদেশের সমস্ত খুনি-ধর্ষক-ক্রিমিনাল আর
রাজাকারেরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এই দেশে আসতে শুরু করে। বাংলাদেশের হিন্দু
অত্যাচারের কাহিনীর আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে এই দেশে বসবাস করতে শুরু করে। যেকোনো
ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিতে বাংলাদেশী বলতে মুসলিমদের এককভাবে এরাই কাঠগড়াতে তুলতো,
যদিও এই সকল ঘটনার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ‘পালিয়ে আসা’
ক্রিমিনাল হিন্দুটার নিজের অত্যাচারের কু-কর্মও ছিলো, যেটাকে
ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে।
শেষ ২০-২৫ বছরে যারা এদেশে এসেছে, সেটা তামিল
হোক, নেপালি, ভুটিয়া বা বাংলাদেশী,
এদের অধিকাংশই রুটিরুজির ধান্দাবাজি আর ভারতীয় রাষ্ট্রীয় নাগরিক
সুযোগ সুবিধার লোভে এসেছে। ১৯৯০ সালের পর ঠিক কত শতাংশ ‘বাংলাদেশী হিন্দু’ বাধ্য
হয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে? কোনো স্বীকৃত তথ্য নেই, না সরকারী না বেসরকারী, কারো কাছেই নেই। নেই,
কারন এই বিষয়ে সার্ভে করলেই উলঙ্গ হয়ে যাবে, প্রতিটা
রাজনৈতিক দলের মাথাতেই ওপাড় বাংলার বাঙালদের একটা বড় অংশ বসে আছে, সেটা তোলামুল, কংগ্রেস, রাম,
বাম, ঘাম প্রত্যেকটি দলের এক অবস্থা। তাঁরা
তথা তাদের পরিবার ঠিক কোন দিন, কোন অত্যাচারের শিকারে এদেশে
পালিয়ে এসেছিলো, তাঁরা নিজেরা ছাড়া কেউ জানেনা। তাই এমন কোনো
সার্ভে কখনও হয়নি, হবেওনা। শুধু ‘আমাগো একখান দ্যাশ আসিলো’
হ্যাজ নামিয়ে আবেগের বর্জ্য ছড়িয়ে নিজেদের পালিয়ে আসাকে গ্লোরিফাই আর জাস্টফাই করে
দেওয়ার মরিয়া প্রয়াস চালায়।
বর্তমান SIR অনুযায়ী যারা ২০০২ সাল অবধি এদেশে
প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ভোটারলিষ্টে নাম তুলিতে পেরেছিলো, তারা তো
ভারতীয় নাগরিকই, এটাই তো পরিষ্কার কাট অফ মার্ক। এর পর যারা
এসেছে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। হিসাব সিম্পল, স্বভাবতই এ
রাজ্যের ৯৯% মুসলমান দুশ্চিন্তামুক্ত। কিন্তু এটাকেই গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে যেকোনো মূল্যে অবৈধভাবে আসা সংখ্যাঘুঘু গুলোকে বৈধতার মান্যতা দেওয়া
যায়। এখানেই শরনার্থী আর অনুপ্রবেশকারীর গনিত গুলিয়ে দিচ্ছে ধর্মের পাঁক দিয়ে। কেন
তারা শরণার্থী- এর কোনো সন্তোষজনক জবাব নেই অধিকাংশ সংখ্যাঘুঘুর কাছে- ‘হিন্দু’
জাত পরিচয় বাদে কোনো যুক্তি নেই।
বামদলগুলো বা এরাজ্যের সিপিএম যত বেশি SIR/NRC বলেছে, শঙ্কিত হিন্দু জনসংখ্যা তত বেশি পরিত্রতা
হিসেবে বিজেপিকে আঁকড়ে ধরেছে, উল্টোদিকে অশিক্ষিত মুসলমান
তত বেশি তৃণমূলকে জড়িয়ে ধরেছে। SIR নিয়ে বাহ্যিকভাবে
সবচেয়ে শঙ্কিত বিজেপি কারণ ভোটার তালিকা পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে সবচেয়ে সমস্যার
মধ্যে যে অংশটি পড়তে চলেছে সেটি মতুয়া ও নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের একটি বড় অংশের লোক আপাতত বিজেপি ভোটার এবং বাকিরা তৃণমূল ভোটার।
নিজেদের শঙ্কা ভয়ঙ্কর ভাবে লুকিয়ে রেখেছে দল তৃণমূল, কারণ
কোথায় তারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিজেরা ক্যালকুলেশন করতে পারছে না। চুরির ভোট
শুকিয়ে গেলে কোথায় কোন ঘটি উল্টে যাবে তার হিসেব আইপ্যাক পর্যন্ত দিতে পারছে না।
ফলশ্রুতিতে আগামী দিনে কাকে গাছে বাঁধা হবে আর কাকে লাইট পোষ্টে- তৃণমূল কোনো
কিছুর হিসাব করতে পারছে না।
SIR জুজুতে বিজেপি কোনভাবেই মুসলমানকে ভয় দেখাতে পারেনি উল্টে
তাদের মতুয়া ভোট ভেঙে চুরমার। নমঃশূদ্র ভোটের অধিকাংশই তৃণমূলের দখলে ছিলো কিন্তু
পশ্চিম বর্ধমান, দুই চব্বিশ পরগণা, নদীয়ার
যা চালচিত্র উঠে এসেছে তাতে তৃণমূলের নমঃশূদ্র ভোট, মতুয়াদের
থেকেও বেশি বিপদে পড়ে গেছে, কারণ মতুয়াদের নিয়ে তবুও তো
চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে; নমঃশুদ্র দের জন্য আলাদাভাবে বলার
মত কেউ নেই। তৃণমূল চারপাশে শুধুমাত্র লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছে, মুসলমানের
বিজেপি ভয় কেটে গেলে আর নিজেদের নমঃশূদ্র ভোট হাতছাড়া হয়ে গেলে- ভাইপো সমেত
গোটা দলের অধিকাংশ নেতা যে জেলে বসে চাক্কি পিসিং পিসিং, সেটা
না বোঝার মত বোকা ওরা নয়। কিন্তু উভয় দলের ভয় স্পঞ্জের মতো শুষে নেওয়ার জন্য
মাঠে নেমে পড়েছে একা কুম্ভ সিপিআইএম। গতকাল আনন্দ টিভিতে সুজন বাবুও, প্রদীপ করের মৃত্যুকে NRC এর সাথে জুড়ে দিয়েছেন।
বাকীটা নিজেরা চেয়ে দেখুন, জবাব পেয়ে যাবেন। এর বেশী বললে
ভক্ত বাম্বাচ্চার দল কামড়ে দিতে আসবে। এমন ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ টাইপের NGO ভলেন্টিয়ার সার্ভিস মার্কা বিরোধী সিপিএম থাকলে, চোর
তৃনমূল আগামী ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকবে, এটা আপনি পাথরের
দেওয়ালে খোদাই করে নিন।
যাই হোক, মাননীয় নেত্রী সমীপেষু, আপনিই পেহেলগাম জঙ্গি হামলার সময় 'ইসলামিক
সন্ত্রাসবাদ' শব্দ লিখেছিলেন, যেটা RSS
থেকে অমিত শাহ, মোদী এমনকি আপনার দল অবধিও
বলেনি, আপনি বলেছিলেন। আজও আপনি 'বাধ্য
হয়েছে' নামে একটা তত্ত্ব এনেছেন, কটা
স্থানে রিসার্চ করে এনেছেন এই তথ্য? বাংলাদেশী অধুষ্যিত কটা
স্যাম্পেল গ্রামে গঞ্জে কতগুলো দিন/রাত কাটিয়েছেন সত্য উদঘাটনে? কতজন স্যাম্পেল ব্যাক্তি ও পরিবারের তথ্য রয়েছে এমন 'বাধ্য হয়েছে' দের? নাকি একটু
ধর্মগন্ধী ফ্লেভার ছড়িয়ে দিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে 'বুদ্ধিজীবি
বাম' কোটাতে নিয়মিত ভেসে থাকতে চাইছেন? পাশাপাশি ‘গুড বামপন্থী’ হিসাবে গোয়ালঘরের অভিষ্ট স্থানে বার্তাও দেওয়া
হচ্ছে। আপনার এই প্রবনতা নতুন কিছু নয়, ধর্ম আর জিরাফে থাকার
এটা চমৎকার ‘ধান্দাবাজি’ অনেক পুরাতন খেলা, অতীতে অনেকেই
খেলে সফল হয়েছেন। আপনাদের মূল সমস্যা হলো, নিজেদের বিশাল
শিক্ষিত আর জ্ঞানী ভাবেন। আপনার ভাষাতে 'এর সাথে সিপিএমের
শূন্য হওয়ার সম্পর্ক নেই' নয়, এটাই
শূন্য হওয়ার মূল কারন।
SIR কে সামনে রেখে যে বা যারা ‘পালিয়ে যাওয়া’ কে জাস্টিফাই করার
চেষ্টা করছে, তারা আসলে সুপ্ত RSS। লিবোরাল, ধর্মনিরেপেক্ষ এবং মুসলমান বিদ্বেষ RSS এর
জিনে আছে; এই সুপ্ত বিদ্বেষ এতদিন যারা মনেপ্রাণে লালিত
পালিত করছিল, আজকে SIR কে সামনে রেখে
বমি করে ফেলেছে। এদের মনের বড় বড় পদ্ম দ্রুত বিকশিত হোক। যাদের সাদাকালো চেনার
ক্ষমতা নেই, যাদের দিন রাতের পার্থক্য করার ক্ষমতা নেই যাদের
ভালো-মন্দ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা নেই, তারা পৃথিবীর যে দেশেই
যে শিবিরেই থাকুক না কেন আদপে তারা সবাই ভক্ত।
পৃথিবীতে কোথাও বামপন্থীদের পালিয়ে আসার ইতিহাস নেই। পালিয়ে আসার
ইতিহাস একমাত্র RSS এর আছে। মুচলেকা দেওয়ার ইতিহাস একমাত্র RSS
এর আছে। এই কারনেই সংখ্যাঘুঘু গুলো সব বিজেপির ভোটার। পাশের রাজ্য
বিহারে ভোট চলছে। যেখানে ভূমি আন্দোলন এর বিরোধিতা এবং উচ্চবর্ণের লোকেদের দ্বারা
গণহত্যা সমার্থক শব্দ। রণবীর সেনা এবং অন্যান্য মৌলবাদী মিলিশিয়া গোষ্ঠী গুলি
নিম্নবর্গীয়দের উপর অসংখ্য গণহত্যা চালিয়েছে। যেমন, বেনিগ্রাম
গণহত্যা, লক্ষ্মীপুর গণহত্যা, এবং
রাউলি গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। এই ঘটনাগুলোতে শত শত নিরপরাধ দলিতকে হত্যা করা
হয়েছিল। বিহারে মাটি কামড়ে আজকেও বামপন্থীরা একজোট হয়ে এ নির্বাচনে লড়াই করছে।
তাই পালিয়ে আসতে ‘বাধ্য হয়েছে’ বলে পালিয়ে আসাকে জাষ্টিফাই করাটা আপনারা-
পলায়নকারী হিসেবে কার উত্তরসূরী?
চালাক বা বুদ্ধিমান হওয়া খুব ভালো, কিন্তু
সেয়ানা সাজা আসলে একধরণের ভন্ডামি ও মূর্খতার পরিচয়। কাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে
আপনি এমন উদ্দেশ্যমূলক পোষ্ট করেন তা আজকে সবটা পরিষ্কার না হলেও, বালিশকুমারের মত অবশ্যই ধরা খেয়ে যাবেন। এই মুহুর্তে আপনাকে জবাব দিতে
হবেনা, জনগণ আপনাদের গুন্তিতে ধরেনা, আলিমুদ্দিনে
আপনি প্রিভিলেজড- জবাবদিহির বালাই সেখানেও নেই। এছাড়া বামেদের যে ‘অন্ধভক্ত
শ্রেনী’ আকাট মূর্খর দল রয়েছে, তারাই আপনাকে ডিফেন্ড করবে
জান লড়িয়ে দিয়ে, আপনার এই মুহুর্তে ভয়ের কিছু নেই। সেই
দিনটার প্রতীক্ষাই রইলাম, যেদিন আপনিও ‘বাধ্য হবেন’ রাজনৈতিক
মাইগ্রেশন করতে। ফেসবুকের পোষ্টে গল্পটা আমিই শেয়ার করব বেঁচে থাকলে।
আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, কেন আমি টার্গেট
হলাম! আপনি নিজেকে 'বাম' নেত্রী বলেই
তাই এই হ্যাজ নামানো, নতুবা শুভেন্দু অধিকারী বা দিলীপ
ঘোষেরা নিয়মিত তাদের ভাষণে বলে- বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা পালিয়ে আসতে বাধ্য
হয়েছে। সুযোগ বুঝে তাদের ভাষা গুলো নিয়মিত আপনার মুখেও উঠে আসে, তাই আজকের পোষ্টটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এতদিন মনের মধ্যে যেটা গজ গজ
করছিল, অনুকুল পরিস্থিতি পেতেই উগড়ে দিয়েছেন। পাঁহেলগাঁও
ঘটনায় আপনার ‘ভাবনার’ ঝলক ইতিমধ্যেই দেশবাসি দেখে ফেলেছে। আপনারা আগামীর বাম
রাজনীতিতে টিকে থাকলে, RSS এর তৃণমূল বা বিজেপিকে আলাদা করে
আর দরকার লাগবে কেন! আপনার ৩৪৭৮৮৬৩৫৮৯৫৩ বার লিখে ফেলা কারনের সাথে আরো ৬০ গুন যোগ
হয়ে যাবে আগামীতে, সাভারকর ওটাই পেনশন পেতেন যে। ঠিকাচে!
মনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট জাতের প্রতি বিতৃষ্ণা রেখে রঞ্জন গগৈ হওয়া যায়, চন্দ্রচূড় হওয়া যায, তসলিমা নাসরিন হওয়া যায, সুব্রামনিয়াম স্বামী বা প্রবীণ তোবাড়িয়া অথবা তথাগত রায় হওয়া যায়। জয় গোস্বামী, শুভাপ্রসন্ন, কবীর সুমন বা অপর্ণা সেনও হওয়া যায়, এমনকি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা তিলোত্তমা মজুমদার, এমনকি গৌতম গম্ভীর পর্যন্ত হওয়া যায়; কিন্তু বামপন্থী হওয়া যায় কি? যদি না একটা মুখোশ পরে থাকে!
আপনার মনের পদ্মফুল বিকশিত হোক।